বাতায়ন/নৃপেন
চক্রবর্তী সংখ্যা/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/২৮ সংখ্যা/১৪ই কার্ত্তিক,
১৪৩২
নৃপেন চক্রবর্তী
সংখ্যা |
ছোটগল্প
শিবরাম দে
বাচ্চার
কান্না
"স্যর এই আমসঞ্চয় রোগ হলে, এই নাভিকমলের চারপাশে এমন উথালপাতাল হয় তখন কোথাও গিয়ে বসতে না পারলে মনে হয় দম বন্ধ হয়ে যাবে। শ্বাসপ্রশ্বাস নিতেও ভয় হয়। এই বুঝি হয়ে গেল! আমার এই কষ্ট তো কেউ বুঝবে না।"
ইন্দ্রজিতের ফোনটা সেই থেকে
বেজেই চলেছে। আর ওই যে পাশের টেবিলে দু’কান চেপে বসে আছেন, উনি স্বপ্না মালাকার। মাথায় নেট-এর টুপি, নাক মুখ মাস্ক দিয়ে ঢাকা। সেই যে করোনা কালে চাপিয়ে ছিলেন, এখন অভ্যাসটা স্বভাবে পরিণত হয়ে গেছে। কিন্তু কান চেপে বসে
আছেন কেন?
কারণটা ওই ফোন। তীক্ষ্ণস্বরে 'বাচ্চার কান্না'
বেজেই
চলেছে। মোবাইলের এই ‘বাচ্চার কান্না’ নিয়ে ইন্দ্রজিতের সঙ্গে বেশ কয়েকবার
ঝামেলাও হয়েছে। কোম্পানির বস অনুজবাবু চেম্বার ছেড়ে বাইরে এসে জানতে চাইলেন,
-ইন্দ্রজিতবাবু কোথায়?
স্বপ্নাদি বৃদ্ধাঙ্গুলীর
ইশারায় টয়লেটের দিকে নির্দেশ করলেন। তখনই যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ নিয়ে
ইন্দ্রজিতবাবুর আবির্ভাব ঘটল।
-কী ব্যাপার, অফিসে আসতে না আসতেই
টয়লেট?
-কী করব স্যার, বনগাঁ লোকালে এসব
করার ব্যবস্থা নেই যে।
-স্টেশন থেকে এতটা পথ হেঁটে এলেন। মাঝে কোথাও দাঁড়িয়ে
কাজটা সেরে আসা যায় না?
সুযোগসন্ধানী স্বপ্নাদি বললেন,
-স্যর উনি দাঁড়ানোর কাজ তো করতে যাননি। বসা কাজ সারতে
গিয়েছিলেন। গরম পড়লেই উনি চেয়ারে কম,
কমোডে
বসেন বেশি।
একথা বলে স্বপ্নাদি মাস্কের
ওপর রুমাল চাপা দিলেন।
-স্বপ্না ম্যাডাম আপনার আবার কী হলো?
-স্যর দেখুন তো হাতটা ঠিকমতো ধুয়েছেন কিনা?
-স্যর টয়লেটে হ্যান্ডওয়াশ নেই যে!
পেটের ভেতর আম বাবাজিদের দাপাদাপি
তারপর আবার এই ছুঁচিবাইয়ের বাতিকগ্রস্ত স্বপ্না ম্যাডাম। এই দু'য়ের আক্রমণে কাহিল ইন্দ্রজিতবাবু কাতর কন্ঠে উত্তর দিলেন।
-আচ্ছা ম্যাডাম
সেই কখন থেকে ‘বাচ্চার কান্না’ হয়েই চলেছে। একটু ধরলে কী
হয়?
বসের কথা শুনে স্বপ্না
ম্যাডামের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন,
-না-না-না, ওটাকে ধরলে আমাকে
আবার স্নান করতে হবে!
-স্যর কী করব? গরম পড়লেই আমার উদরে আমসঞ্চয় রোগের বৃদ্ধি ঘটে।
-আমসঞ্চয় রোগ মানে?
প্যান্টে গোঁজা জামাটা
ফচাং করে টেনে বের করে উপর দিকে তুলে নাভির চারপাশে হাত বুলিয়ে বললেন,
-স্যর এই আমসঞ্চয় রোগ হলে, এই নাভিকমলের চারপাশে এমন উথালপাতাল হয় তখন কোথাও গিয়ে বসতে না পারলে মনে
হয় দম বন্ধ হয়ে যাবে। শ্বাসপ্রশ্বাস নিতেও ভয় হয়। এই বুঝি হয়ে গেল! আমার এই
কষ্ট তো কেউ বুঝবে না।
অনুজবাবু নিজের চেম্বারে চলে
যেতে মাথার উপরের পাখার সুইচটা অন করে চেয়ারে বসলেন ইন্দ্রজিত। ফোনের স্ক্রিনে
বন্ধুর নাম্বার দেখেও রিং ব্যাক করার ইচ্ছা হলো না। কিন্তু বন্ধুটি বড়ই নাছোড়।
তাই আবার সেই ‘বাচ্চার কান্না’। একরাশ বিরক্তি নিয়ে,
-কী হলো?
-তুই কী সুন্দর বনে বেড়াতে গেছিস?
-আরে না না কোথাও যাইনি।
-এই যে কথায় কথায় মিথ্যা বলার অভ্যাসটা তোর গেল না।
-বিশ্বাস কর, অফিসে বসে আছি।
-তোর মোবাইলে ইঞ্জিন চলার শব্দ পাচ্ছি! মনে হচ্ছে লঞ্চ চলছে।
-আরে ওটা আমার মাথার উপর সিলিং পাখাটার শব্দ।
-এই ইন্দ্র, এটা কীসের শব্দ
বললি?
-বললাম তো মাথার উপর ঘুরতে থাকা পাখার শব্দ।
-রাগ করিস না বন্ধু তোকে একটা অনুরোধ করব!
-কী অনুরোধ?
ইন্দ্রজিতের উদরে আবার সেই আম
সঞ্চয়জনিত রোগের উপসর্গ। সে কিছুতেই চেয়ারে সোজা হয়ে বসতে পারছে না।
-অনুরোধটা কী বলবি তো?
-বন্ধু তুই এখনই ওই পাখাটার নিচ থেকে সরে গিয়ে অন্য
জায়গায় বসে কাজ কর।
-কেন কী হয়েছে?
-ওই পাখাটা এখনই তোর মাথায় ভেঙে পড়বে!
-কী যা তা বলছিস?
-ভাই আমার এই অনুরোধটা রাখ!
নাছোড় বন্ধুটির গলায় কাতর
অনুরোধ।
-আরে রাখ তো ফোনটা! এদিকে দ্বি-ফলার আক্রমণে বেহাল অবস্থা, আর তুই আছিস মাথায় পাখা ভেঙে পড়া নিয়ে। রাখ ফোনটা!
ইন্দ্রজিত নিজেই ফোনটা কেটে
দিল। বেশ কিছু সময় সব নীরব। ঘড়ির টিক টিক শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
হঠাৎ সেই তীক্ষ্ণ স্বরে ‘বাচ্চার কান্না’।
-ইন্দ্র তুই কিন্তু অবুঝের মতো জেদ ধরে বসে আছিস!
-আরে আপনি কে বলছেন?
-আমি তোর বাল্যবন্ধু অপূর্ব।
-আমি কী ধরে বসে আছি?
-এই যে, ইঞ্জিনের শব্দ করে
মাথার উপর পাখাটা ঘুরছে। যে-কোনো মুহূর্তে তোর মাথায় ভেঙে পড়লে, তোর বাঁচার চান্স কিন্তু জিরো পার্সেন্ট। জেদ না করে
চেয়ারটা নিয়ে অন্যত্র সরে গিয়ে বোস।
-আমার বাঁচার চান্স জিরো পার্সেন্ট কেন?
-এই তোর মাথার যে-কটা চুল আছে ওরা কি ওই ভারী বস্তু থেকে তোর
মাথাকে বাঁচাতে পারবে?
-কী বিরম্বনায় পড়লাম! তোদের বারংবার ফোন, আর এদিকে বাচ্চার কান্না!
-এর মধ্যে ‘বাচ্চার কান্না’ পেলি কোথায়?
-এই শোন, পাখা ভেঙে পড়ে
মৃত্যু হলে আমার বউ বিধবা হবে। তাতে তোর কী?
বলেই ফোনটা কেটে দিল সে।
কিছু সময় পর। বস ফোনে কথা
বলতে বলতে ইন্দ্রজিতের কাছে এসে সশব্দে ঘুরতে থাকা পাখাটার দিকে তাকিয়ে,
-আরে ম্যাডাম, আপনি যা ভাবছেন সেরকম
কিছুই নয়। শুনুন বাড়ি বসে এই গরমে বেশি চিন্তা করলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। এখানে
বড় হাসপাতাল, নার্সিংহোম সব আছে। পাখাটা
যদি মাথায় ভেঙে পড়ে ওর চিকিৎসার কোন অসুবিধা হবে না।
একরাশ বিরক্তি নিয়ে লাইনটা
কেটে দিয়ে।
-কী ব্যাপার ইন্দ্রজিতবাবু? সিলিং পাখা ভেঙে পড়ে, আপনি মারা যাবেন। এ
কথা আপনার স্ত্রী নিশ্চিত করে বলছেন কী করে?
বসের কথা শুনে পাখা ভেঙে পড়ার
আগেই আকাশ ভেঙে পড়ল ইন্দ্রজিতের মাথায়। সে করুণভাবে বলল,
-বিশ্বাস করুন স্যর,
এসবের
বিন্দুবিসর্গ আমার জানা নেই। আমি গল্পের ছলেও কোনদিন বলিনি যে, এই পাখায় হওয়ার থেকে শব্দ হয় বেশি।
-আপনি না বললে, বাড়ির লোক জানলো কীভাবে?
নাছোড় স্বপ্না ম্যাডামের
প্রশ্ন।
-স্যর বিশ্বাস করুন,
এই গলার
নালী ছুঁয়ে বলছি, আমি কাউকে কিছু
বলিনি। স্যর সেই সকাল থেকে নাভিকমলের কামড়ে আমি অস্থির। সেই সঙ্গে স্বপ্না
ম্যাডামের এই ছুঁচ ফোটানো কথা আর সহ্য হচ্ছে না।
-শুনুন, আপনার স্ত্রী ফোন করে
কী বলল জানেন? আমি জেনে বুঝে আপনাকে
যমদন্ডের নিচে বসিয়ে রেখেছি! যে কোন মুহূর্তে আপনি ফটো হয়ে যেতে পারেন। আজকাল
রজনীগন্ধা মালার অনেক দাম। প্রতিদিন না হলেও বছরে একদিন তো ফটোতে মালা পরাতেই হবে, সঙ্গে ধূপ, ধূনো, কত খরচ!
-স্যর আমি নিশ্চিত,
আমার
ঝিলিকের মাথা খারাপ করেছে ওই আমার বাল্যবন্ধুটি!
-মাথা খারাপের মতন কিছু তো মনে হল না।
-মাথা খারাপ না হলে কোনও পতিব্রতা স্ত্রী কী করে নিশ্চিত হয়
যে, তার স্বামী ফটো হয়ে যাবে!
-যাক ছাড়ুন সে কথা। আপনার নাভিকমলের কামড় কেমন?
-অ্যাই মরেছে, আবার মনে করিয়ে
দিলেন! এখন যে দাঁড়াতেই দেবে না।
-যান যান দেরি করবেন না। বাকি সময়টা ওখানেই বসুন। শুনুন ভাল
করে পরিষ্কার হয়ে বেরুবেন, তা না হলে স্বপ্না
ম্যাডাম আবার...
স্যরের কথা শোনার অবস্থায়
ছিল না ইন্দ্রজিত। সে প্যান্টের হুকে হাত দিয়ে ছুটল। সবে দরজা দিয়ে কমোডে বসেছেন, হঠাৎ ‘বাচ্চার কান্না’ ফোনটা টেবিলে রাখতে ভুলে গেছেন।
ভাগ্যক্রমে হাতটা তখনও শুকনো। অনেক কষ্টে ফোনটা বের করে ‘উঃ’ শব্দ উচ্চারণ করলেন।
সেই ‘উঃ’ শব্দে অফিসের
স্বপ্নাদি সহ সকলেই হেসে উঠল।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment