বাতায়ন/কালো কাল/অন্য চোখে/৩য় বর্ষ/৩৫তম
সংখ্যা/৭ই পৌষ, ১৪৩২
কালো কাল | অন্য
চোখে
হিমাদ্রি
শেখর দাস
নীরবতার
অপরাধ
"আশ্চর্যের বিষয় হলো, আইন যেখানে নীরব দর্শক। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও যদি কার্যকর ভূমিকা না নেয়, তবে প্রশ্ন ওঠে—আইন কি কেবল নথিপত্রের জন্য?"
অমানবিকতার এক কালো অধ্যায়।
একটি পাড়ায়, পরিচিত মুখের ভিড়ে, বন্ধুত্বের আড্ডায় শুরু হওয়া সামান্য কথাকাটাকাটি কীভাবে
একটি তরুণের মৃত্যুর দিকে গড়িয়ে যায়—এই প্রশ্নটি আমাদের সমাজের সামনে। আজ তা বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। কারণ এই
মৃত্যু কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, এটি পরিকল্পিত না
হলেও সম্মিলিত নিষ্ঠুরতার ফল।
ঘটনাটি শুরু হয়েছিল তুচ্ছ
কারণে। বন্ধুরাই ছিল অভিযুক্ত, আবার বন্ধুরাই ছিল
সাক্ষী। কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিকারক ভূমিকা
পালন করেছে তারা, যারা সেখানে উপস্থিত
থেকেও কিছু করেনি। যারা চিৎকার শুনেও এগিয়ে আসেনি। যারা চোখে চোখ রেখে একটি প্রাণ
নিভে যেতে দেখেছে, অথচ হাত বাড়ায়নি।
একজন যুবক—যার অপরাধ ছিল
শুধুমাত্র ঝগড়া থামাতে চাওয়া—নির্মমভাবে প্রহৃত হয়। সে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল।
পায়ে ধরে কাঁদছিল। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর মানুষের কানে পৌঁছায়নি। কারণ সে তখন আর
মানুষ ছিল না—সে হয়ে উঠেছিল ‘অন্য কেউ’,
যাকে
মারলেও দায় নেই।
এই সমাজে আজ সহানুভূতি একটি
বাছাইযোগ্য অনুভূতি। যার মা নেই, যার বাবা ক্যান্সারে
আক্রান্ত, যার পেছনে শক্ত পরিবার বা
ক্ষমতার ছায়া নেই—তার প্রাণের মূল্যও যেন কম। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতাই আমাদের
সবচেয়ে বড় লজ্জা।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আইন যেখানে নীরব দর্শক। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও যদি
কার্যকর ভূমিকা না নেয়, তবে প্রশ্ন ওঠে—আইন
কি কেবল নথিপত্রের জন্য? নাকি দুর্বলদের রক্ষা
করার দায়িত্ব তার নেই? এই নীরবতা কেবল
ব্যর্থতা নয়, এটি অপরাধের সহযোগিতা।
মৃত্যুর পরেও অমানবিকতা থেমে
থাকেনি। লাশকে তার বাড়ির সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে—যেন মৃত্যুও যথেষ্ট শাস্তি
নয়। এটি কেবল একটি ব্যক্তির অবমাননা নয়,
এটি
মানবজাতির উপর আঘাত। এই দৃশ্য আমাদের সমাজের মুখে চাবুকের মতো পড়ে।
এই ঘটনায় শুধু যারা মারধর
করেছে তারা দোষী নয়। দোষী তারা সবাই—
যারা দেখেও দেখেনি, যারা শুনেও শোনেনি,
যারা
জানার পরেও চুপ থেকেছে। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষ নয়। নীরবতা এখানে অপরাধ।
আজ যদি আমরা এটিকে ‘একটি
বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে এড়িয়ে যাই, তবে আগামীকাল এমন ঘটনা আবার ঘটবে—আরও নিষ্ঠুরভাবে, আরও প্রকাশ্যে। কারণ অপরাধ তখন সাহস পায় আমাদের চুপ থাকার
ভেতর থেকেই।
এই অমানবিকতার বন্ধ হোক। বন্ধ
হোক মব মানসিকতা। বন্ধ হোক নীরব দর্শকের সংস্কৃতি।
মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে
শিখতে হবে। প্রতিবাদ করতে শিখতে হবে। একটিমাত্র কণ্ঠস্বরও কখনো কখনো মৃত্যু ঠেকাতে
পারে—এই বিশ্বাস আমাদের ফিরিয়ে আনতেই হবে।
এই কালো দিন যেন আর না ফিরে
আসে। কারণ একটি প্রাণ হারানোর দায় কেবল খুনিদের নয়— আমাদের সবার।
No comments:
Post a Comment