বাতায়ন/নবান্ন/অন্য চোখে/৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন
| অন্য চোখে
অরূপ কুমার
দেব
তাতারসি
রহস্য
"সাহিত্য থেকে বিজ্ঞান সর্বত্র নলেন গুড়ের স্তুতি শুনতে পাওয়া যায়। বিজ্ঞানের মতে নলেন গুড় উচ্চ ক্যালোরি যুক্ত খাবার, অথচ অ্যান্টি-ফ্যাটের উৎস এটি। তাই যুগে যুগে ঘরে ঘরে প্রতিটি শীতকালে এর চাহিদা প্রচুর।"
ছন্দরাজ কবি শ্রী
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর একটি কবিতায় লিখেছিলেন, ‘তাতারসির তপ্ত রসে বাতাস সাঁতার দেয় হরষে...’ তাতারসি, তাতরসি, তাতরস যার বিশেষ্য হল
খেজুর বা আখের রস জ্বাল দিয়ে প্রস্তুত তরল গুড়। তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের অর্থ হল
তপ্ত তারপর আসে তাত যা রস জ্বাল দেওয়া হয়েছে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সবশেষে যা তৈরি হয় তা হল
গুড়।
তাতারসি বা গুড় অতি প্রাচীন
শব্দ। প্রাচীন ভারতে গুড়ের আরেক নাম খন্ড। বড়দানা চিনির আদি নাম বিগুড় আর গুড়ের
পাটালির নাম ছিল গুড়পট্ট। এই যে গৌড় দেশ তার আদিতেও রয়েছে গুড়, ভাল গুড় হত বলেই গৌড়। গুড়ের সারিবদ্ধ কলশিকে ‘মিছিল’
বলা হত আর বর্তমানের মিছিল শব্দটির উৎপত্তি এখান থেকেই।
খেজুর গাছের প্রথম দিনের রসকে
বলে জিরেন রস, পরের দিন ঝরা রস, তার পরদিন নিম-ঝরা এবং তার পরের দিন ওলা। হাঁড়ি ঝুলিয়ে রস
সংগ্রহ করে তাকে জাল দিতে দিতে মোটা করে ঝোলা গুড়। গাছে হাঁড়ি ঝোলানো হয় বলেই হয়তো এই গুড়ের
নাম ঝোলা গুড়, আবার ‘ঝরা’ শব্দটি
থেকেও ‘ঝোলা’ শব্দটি আসতে পারে। আমাদের ঝোলা গুড়ের কথা এলেই তো মনে পড়ে যায়
ভারতীয় সাহিত্যে ননসেন্স ছড়ার প্রবর্তক কবি শ্রী সুকুমার রায়ের সুপরিচিত লাইনগুলো—
শিমুল তুলো ধুন্তে ভাল,
ঠাণ্ডা জলে নাইতে ভাল,
কিন্তু সবার চাইতে ভাল
পাউরুটি আর ঝোলা গুড়...।
কেউ কেউ বলেন ‘নলেন’ মানে
নতুন আর বিদ্দজ্জনের মত নলেন হল সংস্কৃত শব্দ। তবে যেহেতু খেজুর গাছ ছেদন করে রস সন্ধান করা
হয় তাই দ্রাবিড়ীয় ‘নরক্কু’ শব্দের সঙ্গে নলেন গুড়ের মিল খুঁজতে পারেন কারণ
‘নরক্কু’ কথার মানে ছেদন করা।
বঙ্গীয় শব্দকোষ অভিধান মতে
‘নরুন’ বা নরশনি মানেও ছেদন করা বা কাটা। নলেন গুড়ের লালচে রঙের কারণে কেউ কেউ একে
আদর করে লালি গুড় বলতেন। রসিক গুড় প্রস্তুতকারীরা প্রথমে দা দিয়ে চেঁচে দেয়
তারপর একটা ফুটো করে বাঁশের কাঠি ঢুকিয়ে দেয় ও তার থেকে রস চুঁইয়ে চুঁইয়ে হাঁড়িতে
পড়ে। ওই বাঁশের ছিলাটি লাগিয়ে দেওয়া হয় হাঁড়ি পর্যন্ত।
তবে শব্দের অর্থ যাই হোক, সাহিত্য থেকে বিজ্ঞান সর্বত্র নলেন গুড়ের স্তুতি শুনতে
পাওয়া যায়। বিজ্ঞানের মতে নলেন গুড় উচ্চ
ক্যালোরি যুক্ত খাবার, অথচ অ্যান্টি-ফ্যাটের
উৎস এটি। তাই যুগে যুগে ঘরে ঘরে প্রতিটি শীতকালে এর চাহিদা প্রচুর।
পূর্ব বর্ধমানের উত্তর রাঢ়দেশ
তথা কেতুগ্রাম ও গঙ্গাটিকুরি অঞ্চলে নলেন গুড়ের ইতিহাসে জড়িয়ে আছে এক বিচিত্র
পরিযায়ী জীবন। যেমন উত্তরের শীতের দেশগুলি থেকে পরিযায়ী পাখিরা ভারতের বিভিন্ন
অঞ্চলে উড়ে আসে আর গোটা শীতকাল তারা এখানে কাটিয়ে আবার ফিরে যায় তাদের শীতের দেশে।
ঠিক একরকমভাবে নদিয়ার দেবগ্রাম, কালীগঞ্জ, ধুবুলিয়া, তেহট্ট থেকে গুড়
প্রস্তুতকারী বিভিন্ন মানুষ শীত পড়তেই প্রতিবার ঘাঁটি গাড়েন কেতুগ্রাম ও
গঙ্গাটিকুরির আশেপাশে বন্দর, গোমাই, শিবলুন, গঙ্গাটিকুরি, বালুটিয়া প্রভৃতি গ্রামগুলিতে। তারপর কাজ শেষে মার্চের
শুরুতে আবার ফিরে যান নিজ নিজ আস্তানায়।
নভেম্বর মাসে এসে প্রথমেই
খেজুরগাছ সমৃদ্ধ কোনও ডাঙা জায়গাকে তাঁরা বেছে নেন, বিশেষত পুকুরপাড়ের পাশে কোনও ডাঙাকে। তারপর নির্দিষ্ট
জমির ওপর খেজুর গাছের মালিকানা অনুযায়ী, সেইসব খেজুর গাছের মালিকদের থেকে ইজারা নেন। এর পর
পর্যবেক্ষণ শেষে কাজ শুরু হয়।
শীত পড়লে বিকালের পর বিভিন্ন
খেজুর গাছের ওপরের পাতার নীচে গা চেঁচে ফাঁকা হাঁড়িগুলো ঝুলিয়ে দিয়ে আসা হয়। তার পরের দিন ভোরে সেই রস নামিয়ে এনে বিভিন্ন হাঁড়ি থেকে ঢালা সমস্ত রস একত্র করে বড় পাত্রে ফোটানো হয়। ফুটিয়ে ফুটিয়ে ধীরে
ধীরে রস থেকে গুড় প্রস্তুত করেন তাঁরা। গুড়কে নিদিষ্ট পদ্ধতির মাধ্যমে ঠান্ডা করে
পাটালি তৈরি করা হয়। নলেন গুড়ের এই দুই ধরন আমাদের কাছে ঝোলা গুড় ও পাটালি গুড়
হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।
আখের রসকে গুড় না বানিয়ে
কখনো চিনিও বানানো যায়। গুড় চিনির থেকে কম মিষ্টি হলেও বেশি পুষ্টিকর। চিনির
জন্য দুবার ফোটালে ঘন কালচে একটু তিতকুটে ভেলি গুড় পড়ে থাকে। আরো বেশি বার চিনি
বের করে নিলে থাকে চিটে গুড়, যার মধ্য প্রচুর
ভিটামিন থাকলেও তেতো বলে সাধারণত গরুকে খাওয়ানো হয়ে থাকে।
আজকাল আমাদের ঘরে ঘরে
ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের সংখ্যা ক্রমে বেড়েই চলেছে যারা চিনি বা শর্করা জাতীয়
খাবার খেতে পারেন না। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত
মানুষদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই কারণে চিনির পরিবর্তে গুড় ব্যবহার করলে
রক্তে শর্করা বা ব্লাড গ্লুকোজের মাত্রা কমিয়ে ডায়াবেটিস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা
যায়।
তারপর মিষ্টির রাজধানী
কলকাতায় জয়নগরের মোয়া আর আমাদের এই অঞ্চলে শীতকালের জন্য অপেক্ষারতদের নলেন গুড়ের
রসগোল্লা ও গোবিন্দভোগ চালের নলেন গুড়ের পায়েসের কথা উল্লেখ করে বলতেই হবে ‘জিভে
প্রেম করে যেই জন সেই জনই প্রকৃত রসিক’।
[তথ্য সম্বন্ধীয় মতামত লেখকের নিজস্ব]
~~০০~~

No comments:
Post a Comment