প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নবান্ন | আমরা ভাল, ওরা খারাপ

  বাতায়ন/নবান্ন/ সম্পাদকীয় /৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ ,   ১৪৩২ নবান্ন | সম্পাদকীয়   আমরা ভাল, ওরা খারাপ "স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বাংলা ...

Thursday, January 1, 2026

দুষ্টের দমন | অরূপ কুমার দেব

বাতায়ন/নবান্ন/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন | ছোটগল্প
অরূপ কুমার দেব
 
দুষ্টের দমন

"হতচকিত বাকিরাও অনুসরণ করতে যাবেসমুখের আবছায়া থেকে আচমকাই যেনছুটতে ছুটতে এসে আবির্ভূতা হলেন স্বয়ং মা কালী। হাতে রক্তাক্ত বঁটির ফলাপোশাকে রক্তের দাগ!"

 
রাত প্রায় সাড়ে সাতটা। মেয়েটা এখনও বাড়ি ফিরল না! প্রীতম সাহা ছটফট করতে করতে ঘরবার করছে। একবার ঘরের সামনের দাওয়ায়, তো আবার সামনের এক চিলতে রাস্তায়, আবার কখনো বা রাস্তা পেরিয়ে সামনের মাঠটার ওপর। জ্বর গায়ে, আরও যে এগিয়ে যাবে, সেটাও পারছে না। শরীরটা খুব দুর্বল, মাথা ঘুরছে। দুদিনের জ্বরে কী যে হাল হল শরীরটার!
 
মাঝে মাঝে মেয়েটার উপরেই খুব রাগ ধরছে। কী হতো কয়েকটা দিন দোকানটা খোলা না হলে! স্টেশনের কাছে তার একখানা সবজির চালু দোকান আছে। বিক্রিবাটাও বেশ ভাল। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে সবজি কেনাবেচার লাভের উপরেই তার সংসারযাত্রা নির্বাহ হয়। ছেলের ইস্কুলের খরচ, মেয়েটার কলেজ, টিউশন, বইপত্র, খাওয়াপরা, খুচখাচ অসুখবিসুখ, কিন্তু তাই বলে দুদিন দোকান বন্ধ থাকলেই সব যে অচল হয়ে যাবে এমনটাও তো নয়! কতবার বারণ করেছিল, কিন্তু বড্ড জেদি মেয়েটা।
 
মেঘলা আকাশে অস্পষ্ট জোৎস্নায়, কাছে-দূরের সব কিছুই কেমন যেন ঝাপসা।
-বাইরে হিম পড়া শুরু হইচে, জ্বর গায়ে বারে বারে খোলা মাঠে গিয়ে ডাঁড়ালেই, মেয়ে তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরবে নাকি
দাওয়া থেকে উদ্‌বিগ্ন স্বর ভেসে আসে প্রীতমের বউ পারুলের।
-চাদ্দিকে কী সব হতিচে, খবর পাও না! এই দেশে হিন্দুদের থাকা যে এক্কেবারে নরক হইয়া যাইতেছে তা বোঝো না। চিন্তা কী আর শুদুমুদু কত্তিচি!
ঝাঁঝালো স্বর প্রীতমের।
 
আড়াআড়িভাবে মাঠ পেরিয়ে পায়ে চলা পথটা, ওপারে কলেজের পিছনের বাউন্ডারিওয়াল লাগোয়া সরু রাস্তাটায় গিয়ে উঠেছে। সেখান থেকে একটু এগিয়ে সরু পথটা বাঁ হাতে মোড় নিয়ে, কলেজ বিল্ডিংটার পাশ বরাবর, সোজা গিয়ে শহরের বড় রাস্তায় গিয়ে ওঠে। তারপর মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই স্টেশন। স্টেশন-প্ল্যাটফর্মের বাইরে, সারি সারি মাছ, সবজির দোকান। প্রীতম সেইখানেই একখানা দোকান দিয়েছে। রাত প্রায় আটটা পর্যন্ত, এইসব দোকান খোলা থাকে, কিন্তু বেশির ভাগই তাদেরই দোকান। লাস্ট ট্রেনে বাড়ি ফেরা লোকেরা, মাছ, সবজি কেনাকাটা করে বাড়ি ফেরে বলে সেই সময়টায় বিক্রিবাটা বেশ ভালই হয়। তারপর ট্রেনটা চলে গেলে, শহর নিঝুম হয়ে পড়ে। বড় রাস্তার দোকানগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। কেনাবেচা সেরে প্রীতম তখন, ওই মাঠের রাস্তা ধরেই বাড়ি ফেরে। সে শর্টকাট করে, তাই বলে অম্বিকাও কি আজ তাই করবে নাকি! রাতের বেলা মাঠটা যে সমাজবিরোধীদের আখড়া হয়ে যায়, তার উপর হিন্দুদের পেলে আর বলে লাভ নেই। নির্জন মাঠের ওই ধারে বসে কতগুলো ছেলে নেশাভাঙ্ করে, বাড়ি ফেরার সময় মাঠের মধ্যে দিয়ে শর্টকাট করতে গিয়ে প্রীতম ওদের প্রায়ই দেখে। গুন্ডা-বদমাইশের দল, যাবতীয় কুকীর্তির নায়ক এক-একজন। পুলিশের খাতায় নাম আছে। শহরে ওদের না চেনে এমন লোক নেই। কিন্তু কে জানে কোন মন্ত্রবলে, পুলিশের জালে ধরা পড়ার দু-তিনদিনের মধ্যেই আবার যে-কে-সেই। সারা শহর জুড়ে মোটরবাইকে কান ফাটানো আওয়াজ তুলে দাপিয়ে তোলাবাজি করে বেড়ানো থেকে শুরু করে মেয়েদের উত্যক্ত করা সব কিছুই ওদের কাছে জলভাত। পুলিশ দেখেও দেখে না। মাঠে বসে, বোতল হাতে নেশার ঘোরে গালিগালাজ, মাতলামির চরমে উঠে নিজেদের মধ্যে মারামারিও করে। অসভ্যতা যেদিন চরমে ওঠে, প্রীতম রাস্তা বদলে আবার, ঘুরপথে বাড়ি ফেরে।
 
আজ তার একবগ্গা মেয়েটা, আবার শর্টকাট করতে ওই পথটাই ধরবে না তো! উহ্ দমবন্ধ হয়ে আসছে যেন। এই তো সেদিন সদ্য সদ্য, সমগ্র বিশ্ব তোলপাড় করা একখানা নারকীয় ঘটনা আমূল কাঁপিয়ে দিয়েছে সমস্ত চেতনা ও বিবেকসম্পন্ন মানুষজনকে। কীরকম নিষ্ঠুরভাবে মেরে ফেলল হিন্দু ছেলেটাকে। এর মাঝে আবার যদি কিছু একটা অঘটন হয়। নাহ্‌ আর ধৈর্য ধরা যায় না, এবারে পাশের বাড়ির সাধুদাকে ডাকতেই হয়!
 
প্রীতমের ডাকে সাধুদা, তার বউ আর দুই ছেলেমেয়ে, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো। প্রীতমদের পাড়াড়শিরা, নিজেদের মাঝে যতই মনকষাকষি, টুকটাক ঝামেলা করুক না কেন, একের দরকারে আর একজন সর্বদাই একবাক্যে হাজির। কারণ তারা জানে এই দেশে খাকতে গেলে নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখতেই হবে।
-যাও, যাও, টর্চটা নিয়ে এগিয়ে পড়ো দিকিনি।
সাধুদার স্ত্রীর গলায় উদ্‌বেগ চাপা থাকে না। ইতিমধ্যে গায়ে গায়ে লাগোয়া ঘরের পড়শিরাও কেউ কেউ এগিয়ে এসেছে। একের উদ্‌বেহ অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। কেউ কাউকে ডাকেনি, কেউ কাউকে আসতে বলেনি, তবুও সবাই আজ একে একে এসে জুটেছে। ওদের অনেক অভাব, নিত্য অনটন, মতান্তর থেকে মনান্তর, ইত্যাদি নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু এইসব ছাপিয়ে, বিপদে-আপদে প্রত্যেকে, প্রত্যেকের পাশে থাকা এটাই এদের সম্বল, সম্পদ এবং এই দেশে হিন্দুদের সুরক্ষার একমাত্র পথ।
 
জটলার মানুষজন নিজেদের মধ্যে আলোচনা সেরে নিয়ে একটু এগিয়ে, এপাশ-ওপাশে খুঁজতে যাবার সিদ্ধান্ত নিল। দু-তিন দলে ভাগ হয়ে এগোলো সবাই। কেউ কেউ টর্চ, আর মোবাইলের আলো জ্বেলে মেঠো পথ বরাবর পা বাড়িয়েছে। তাই দেখে হাতে একখানা গাছের সরু ডাল নিয়ে রাস্তার ভবঘুরে পাগলটাও, বুঝে হোক না বুঝে হোক ওদের সঙ্গ নিল।   আচমকাই মাঠের ওপার থেকে পুরুষ কন্ঠে মর্মভেদী আর্তনাদ! হতভম্ব সবাই একেবারে স্থাণুবৎ। নারী কন্ঠ তো নয়, পুরুষের গলা! ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্যজনক! কয়েক মুহূর্ত মাত্র। অন্য কেউ সম্বিত ফিরে পাবার আগেই, পাগলাটাই মত্তহস্তীর মতো সামনের দিকে ছুট লাগিয়েছে, হতচকিত বাকিরাও অনুসরণ করতে যাবে, সমুখের আবছায়া থেকে আচমকাই যেন, ছুটতে ছুটতে এসে আবির্ভূতা হলেন স্বয়ং মা কালী। হাতে রক্তাক্ত বঁটির ফলা, পোশাকে রক্তের দাগ! ওকি! ওটা অম্বিকা না!
 
দৃশ্যটি নজরে আসতেই পাগলাটা হঠাৎ হাতজোড় করে, মা, মা বলে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে, বাকিরা হতচকিত। কাছাকাছি এসে অম্বিকা চেতনা হারিয়ে, একেবারে মাটিতে পড়ে গেল। অম্বিকার মাথাটা কোলে নিয়ে পারুল দাওয়ায় বসে আছে। জলের ঝাপটা দিয়ে মেয়ের জ্ঞান ফেরানো হয়েছে। তাদের বাড়ি ঘিরে জটলা বাড়ছে। ব্যাপারটা বুঝতে কয়েকজন পুরুষ, মাঠ বরাবর রওনা দিয়েছে।
 
জ্ঞান ফিরতে, অম্বিকা ধড়মড়িয়ে উঠে বসল, এদিক-ওদিক চেয়ে আবার মাকেই আঁকড়ে ধরেছে। প্রশ্নোত্তরের পালা চলতেই থাকে। ধীরে ধীরে জানা গেল, দোকান বন্ধ করে বড় রাস্তা ধরেই ফিরছিল অম্বিকা। হঠাৎ দেখে রাস্তায় বদমাইশদের একটা দল হাঙ্গামা, ভাঙচুর চালাচ্ছে। তাই দেখে অম্বিকা আবার উল্টোপথে হেঁটে, নিজেদের দোকানের কাছে ফিরে আসে। ওদিকে রাত বাড়ছে, আর ছেলেটার সাথে ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনার টাটকা ছাপ অম্বিকার মনে। অম্বিকা এখন কী করে! অসুস্থ বাবাকে ফোন করে ব্যস্ত করতে মন চায় না। অবশেষে পাশের দোকানের মাছওয়ালা দাদু দোকান বন্ধ করছে দেখে, তার কাছ থেকে বড় বঁটির ফলাটা চেয়ে নিয়ে এসেছিল। একটু ইতস্তত করলেও অবশেষে দাদু, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে, সেটি ওর হাতে তুলে দেয়, ভাগ্যিস!
 
অম্বিকা এবারে পথ বদলে শর্টকাট রাস্তাটাই ধরে নিয়েছিল। ভাবতেও পারেনি ইতিমধ্যেই রাস্তা ছেড়ে আরও একদল সাঙ্গপাঙ্গ-সহ মাঠেই এসে বসেছে। প্রত্যেকের হাতে বোতল। অম্বিকার তখন জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। কোন পথে বাড়ি ফিরবে! সন্তর্পণে মাঠের একেবারে অপর প্রান্তের ঝোপঝাড়ের আড়ালে পায়ে চলার পথটা ধরে নিয়েছিল। তবুও ঠিক পালের গোদাটার নজরে পড়ে যায়। বাকিটুকু আর বলার অপেক্ষা রাখে না, তবে অম্বিকাও ছেড়ে দেয়নি। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে কোঁচড় থেকে মাছকাটা বটির ফলাটা বের করে বেশ করে কুপিয়ে দিয়েছে হাতের নাগালে যাকে পেয়েছে তাকেই!
 
হতচকিত জনতা। জটলায় গুঞ্জন বাড়ছে। কেউ বুঝি পুলিশে খবর দিয়েছে। প্রীতমের মুখ শুকিয়ে গেছে। এখন কী হবে! তার মেয়েটাকে পুলিশ নির্ঘাত গ্রেফতার করে লক আপে ভরবে। মেয়েটার ভবিষ্যৎ যে একেবারে অন্ধকার, হয়ে যাবে। সব্বাইকে চরম শত্রু বলে মনে হয়। দুর্বল শরীরে চিন্তার ভার আর বইতে পারছে না প্রীতম। ও কি এবারে জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে! হায় ভগবান এ তুমি কী করলে!
 
ঠিক তখনই সৃষ্টি হল এক অভূতপূর্ব আয়োজন। আশেপাশের যত অল্পবয়সি, মধ্যবয়সি মেয়েদের দল, বঁটি কাটারি হাতে ভিড় করে এসে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের কাছে জবানবন্দীতে প্রত্যেকেই বলেছে, সে-ই নাকি কুপিয়ে দিয়েছে বদমাইশের দলকে। এবার পুলিশই খুঁজে নিক আসল অপরাধীকে! ঠিক করে নিক কাকে ধরতে চায়!
 
বাঁধ ভাঙা স্রোতের মতো আশেপাশের অঞ্চলের মেয়েরাও এসে জুটছে, কারণ এই বিষম কালে এই দেশে দুষ্টের দমনের ভার নেওয়া বুঝি তাদেরই কর্তব্য। জমায়েত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, হয়েই চলেছে, ক্রমশ সেটা বুঝি জনসমুদ্রের আকার ধারণ করবে! তবে তাই হোক, ভাসিয়ে নিয়ে যাক সব জঞ্জাল।
 
~~০০~~

No comments:

Post a Comment

২০২৬-এর নতুন সূর্য


Popular Top 10 (Last 7 days)