বাতায়ন/নবান্ন/ছোটগল্প/৩য়
বর্ষ/৩৬তম সংখ্যা/১৬ই পৌষ, ১৪৩২
নবান্ন
| ছোটগল্প
সঙ্ঘমিত্রা
দাস
বটগাছের
কান্না
"সেদিন আমার শিকড় পর্যন্ত কেঁপে উঠল। আমার আশঙ্কা সত্যি হল। ওই যে মিনি আসছে। হাতে একটা মোটা দড়ি। এদিকেই আসছে সে।"
ছোট একটা নদী আঁকাবাঁকা পথে
বয়ে গেছে। হাটুর বেশি জল থাকে না সারাবছর। তারই এক পাড়ে কুসুমপুর গ্রাম। সবুজ
ধানের ক্ষেত, সোনালি ধানের
হাওয়ায় দোল খাওয়া। লাল মেঠো পথ,
চাষিদের হন্তদন্ত
পথচলা। দূর থেকে মনে হয় যেন ক্যানভাসে আঁকা ছবি।
গ্রামের মেয়ে-বউ দল বেঁধে
আসে, নদীর পাড়ে বাসন ধোয়, স্নান সারে। ছোট ছেলেমেয়েরা নীল সাদা পোশাকে স্কুলে যায়।
ছুটির দিন বাচ্চাগুলো নদীর জলে খেলা করে। এপার থেকে ওপার ওদের ছুটোছুটি দেখলে মন
জুড়িয়ে যায়। ঘর বলতে ছোট মাটির দালানে খড়ের ছাউনি। মানুষগুলো পরিশ্রম করতে ভয়
পায় না। দিনরাত খাটে দু মুঠো ভাতের জন্য। একটু সুখের আশায়।
কিন্তু ওই যে গ্রামের দক্ষিণ
দিকে বড় অট্টালিকা, বিরাট উঁচূ পাঁচিলে
ঘেরা যে প্রাসাদ ওখানে দস্যুর বাস। গ্রামের মাথা, গরিব মানুষের মা-বাপ, গ্রামের সর্বেসর্বা তিনি। খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কাছ থেকে
মহাজন সেজে সুদের নামে সর্বস্ব লুঠ করছে। নিংড়ে নিচ্ছে ওদের রক্ত, রাতের ঘুম।
গত কয়েক বছরে রাস্তাঘাটের
বেহাল অবস্থা, মাঝে বড় বড় গর্তে ধান বোঝাই
গাড়ি উল্টে পড়ার জোগাড়। বর্ষায় চলাচলের অবস্থা থাকে না। ওদিকে তার বাড়ি
কলেবরে বেড়ে চলেছে। আকাশ ছুঁয়েছে ছাদ। গভীর নলকূপ নেই। পানীয় জলের অভাব
অথচ সরকারের বরাদ্দ টাকায় একটা মাত্র কল বসানো হয়েছে। ওদিকে প্রাসাদে অতিথি
আপ্যায়নের নামে আরো দুটো বিলাসবহুল ঘর তৈরি চলছে। মাঝেমধ্যে
সুন্দর সাজে তার কুৎসিত চেহারা ঢেকে আসেন গ্রামের মানুষের ভালমন্দের খবর নিতে।
ভয়ে কাঁপে তখন সারা গ্রাম। ছেলেদুটো তৈরি হয়েছে একেবারে
বাপের আদলেই। একটা উন্মত্ত পাগল,
নৃশংস
তার চোখের চাহনি। ক্ষিপ্র চালচলন। বাপের অঙ্গুলি হেলনে পাশবিক অত্যাচারে মেতে ওঠে
সহজেই। সামনে এলে গায়ে কাঁটা দেয়। আর একটা মদ্যপ চরিত্রহীন। বন্ধুবান্ধব নিয়ে
মেতে থাকে। গাঁয়ের মেয়ে-বউদের উত্তক্ত করা, কু ইঙ্গিত চলতে থাকে তার। ওদের বাধা দেবার সাহস নেই কারোর। কখনও সামান্য
প্রতিবাদের চেষ্টা হলেও তা ওই উঁচূ পাঁচিলের আড়ালে হারিয়ে যায়। মানুষ ওদের
অত্যাচার থেকে বাঁচতে আড়াল খোঁজে শুধু। মাঝে মাঝেই পাঁচিলের ওপার থেকে অসহায়
কারোর কান্না ভেসে আসে। কেউ হয়তো পাগলের অন্যায় আবদারের শিকার, কেউ লম্পট ছেলের কুনজরের বলি। প্রধান আর তার স্ত্রী চোখ
থেকেও অন্ধ। এ যুগের ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারী।
কী বলছ? আমি কে? এত কথা আমি কীভাবে জানলাম? ওই যে দূরে পুবদিকে বাঁধানো বুড়ো বটগাছ দেখছ, আমি সে। তিন প্রজন্মের এই গ্রাম্য মানুষগুলোর সুখ-দুঃখের সাক্ষী
হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার যে চলার উপায় নেই, বলার শক্তি নেই। তবু ডালপালা নেড়ে অনেক ইশারা করি। কিন্তু ওরা যে তা বোঝে না।
তাই নীরব সাক্ষী হয়ে একভাবে দাঁড়িয়ে আছি আজ এতগুলো বছর।
আমাকে ঘিরে কিশোরের দাপাদাপি, ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা। যুবতী মেয়ে-বউদের নদীর
ঘাটে স্নানে যাবার পথে দু দন্ড জিরিয়ে নেওয়া, কত আলোচনা, ফিশফাশ সবই তো আমার বেদীতে বসে। সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে পুরুষেরা একটু আড্ডা
জমায় আমার কাছে। ওদের সুখ-দুঃখের ঝুলি খুলে বসে। সেখান
থেকেই গ্রামের সব খবর জেনে যাই। এই তো সেদিনের কথা, রাখাল
গোয়ালার পোয়াতী বউটা যমে মানুষে টানাটানির পর ফুটফুটে এক মেয়ের জন্ম দিল। নাম
ওর মিনি। ছোট থেকে একটু একটু করে বড় হতে দেখলাম। দুই বেণি
ঝুলিয়ে বন্ধুদের সাথে স্কুলে যেত। কী অপূর্ব সুন্দর সে
দেখতে। তেমন তার গানের গলা। ফেরার পথে আমার ডাল ধরে ঝুলে দোলনা দুলত আর গান গাইত। অপূর্ব সে গান আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি। চুপটি করে
দাঁড়িয়ে থাকি যাতে সে দোল খেতে গিয়ে পড়ে না যায়। পাতা নাড়িয়ে বাতাস করি ওর
একটু আরামের জন্য।
হঠাৎ শুনলাম ওর বিয়ে। এই তো
সেদিন সবে আঠারো পেরোলো। সারা গ্রাম আনন্দে মেতে উঠেছে। আমিও খুশি হলাম। কিন্তু
যখন দেখলাম প্রধানের লম্পট ছেলেটা সানাই,
বাদ্যি
বাজিয়ে বিয়ে করতে যাচ্ছে খুব ভয় পেয়েছিলাম। বারণ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি
যে নিরুপায়। রাখাল বড় ঘরে মেয়ের বিয়ের আশায় বোধ হারিয়ে ফেলল। বাড়ির বউরা
নদীর ঘাটে জল সইতে এলো, গঙ্গা নিমন্ত্রণ করল।
আমি প্রাণপণে হাওয়া দিয়ে প্রদীপ নিভিয়ে বললাম বন্ধ কর এই বিয়ে। কেউ শুনল না
আমার বোবা আর্তনাদ।
বিয়ের পর প্রথম প্রথম মিনি
যখন বাপের বাড়ি যেত আমি তাকিয়ে থাকতাম। ওর ওই রাঙা মুখে হাসি, শরীরে স্বামী সোহাগের চিহ্ন দেখে কিছুটা তৃপ্ত হলাম। আশীর্বাদ করলাম
সুখী থাকার। বছর ঘুরে এলো। গায়ে গতরে একটু মোটা হয়েছে সে। দেখতে আরও সুন্দর হয়ে
গেছে।
মাঝে অনেকদিন হয়ে গেল তাকে
আর এ পথে দেখি না! এক রাতে প্রধানের ছেলেকে গাড়ি করে যেতে দেখেছিলাম আর তো ফিরল
না। গ্রামের মেয়ে-বউদের ফিশফিশানি
কানে এলো। সে ছেলের নাকি বউয়ের থেকে আগ্রহ উঠে গেছে। সখ মিটে গেছে তাই আর ফিরবে
না। সে এখন শহরে আস্তানা গেড়েছে। এদিকে মিনির ঘরে রোজ রাতে পৌঁছে যাচ্ছে আর এক ছেলে। ওই শয়তান পাগলটা। বাধ্য করছে একসাথে রাত কাটাতে।
প্রধান গিন্নিও বংশধরের আশায় মেনে নিয়েছেন সব।
সেদিন আমার শিকড় পর্যন্ত
কেঁপে উঠল। আমার আশঙ্কা সত্যি হল। ওই যে মিনি আসছে। হাতে একটা মোটা দড়ি। এদিকেই
আসছে সে। আমি আমার ডালগুলোকে গুটিয়ে নিতে চাইলাম। চিৎকার করে লোক জড়ো করার চেষ্টা করলাম। পারলাম না। সে একটা শক্ত ডাল থেকে ঝুলে পড়ল। ডালটা
ভেঙে ফেলব কিন্তু আমার যে হাত নেই। আমি যে এক জায়গায় আটকে আছি। চোখের সামনে
মিনির শরীরটা থেমে গেল। নীরব সাক্ষী হয়ে রইলাম এক নিষ্পাপ অপমৃত্যুর।
~~০০~~

No comments:
Post a Comment