বাতায়ন/ধারাবাহিক
গল্প/৩য় বর্ষ/৩৮তম সংখ্যা/৩রা মাঘ, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
রুবি
রায়
[৩য় পর্ব]
"অতনু এগিয়ে এসে দু হাতে ওর মুখটা তুলে ধরে গভীর চুম্বন এঁকে দিল ওর ঠোঁটে, মুখে, গালে, গলায়, কেঁপে উঠল অনুমিতার দেহ নিজেকে সঁপে দিল অতনুর বুকে, ওকে জড়িয়ে ধরল অতনু।"
পূর্বানুবৃত্তি রুবি রায়ের চিঠি পেয়ে মন খারাপ হয়েছিল অতনুর। ভেবেছিল দিল্লি যাবে না। তারপর কলকাতায় ফিরে আসেনি, পিএইচডি কমপ্লিট করে জেএনইউয়ের প্রফেসর হয়েছে। তারপর...
-না রে পড়িনি, বোধহয়
ভেতরের পাতায় ছিল, অত
খবর আমি পড়ি না, ভাল
লাগে না, তা
তুই এই নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিস কেন!
-তুই কি মনে
করছিস…?
-হ্যাঁ
অতনুদা অনেকটা মিলে যাচ্ছে যে।
-ভদ্রমহিলা
এখন কোথায় থাকেন কী করেন, সেসব কিছু
লেখা নেই?
-না অতনুদা, থাকলে তো
আমি চলে যেতাম, কিন্তু
এই বিশাল শহরে সে কোথায় আছে, কোথায় খুঁজে বেড়াব তাকে?
-অতনু একটা
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
কিন্তু আমাকে যে তাকে খুঁজে পেতেই হবে, আমি ঘর বেঁধেও ধরে রাখতে পারিনি শুধু
ওই একজন আমার মনে এখনও বাসা বেঁধে আছে বলে।
-কিন্তু
কোথায় খুঁজবে তাকে?
-দেখি, এখনও কিছু
মাথায় আসছে না, শুধু
জানি খুঁজে তাকে পেতেই হবে,
প্রথম লগনে যে ফুল ফুটেও ঝরে পড়ে গেছিল, গোধূলি লগনে তাকে যদি আবার নতুন করে
ফোটান যায়।
যে
ভদ্রলোকের সাথে দেখা করতে এসেছিল তার সাথে কাজটা সেরে নিতে হবে, অতনু হাতের
ঘড়িটা দেখল। টুটু বলল,
-তোমার দেরি
হয়ে যাচ্ছে বোধহয়?
-না রে এখানে
একজন প্রফেসর এসেছেন তন্ময় লাহিড়ী নামে, উনি আমার প্রফেসর, পিএইচডির
সময় অনেক সাহায্য পেয়েছি ওঁর কাছ থেকে তাই কলকাতায় এলাম যখন ভাবলাম একবার দেখা করে
যাই।
-ও ওই যে
সোমাদিদের বাড়িটা ভেঙে যে ফ্ল্যাট বাড়িটা তৈরি হয়েছে ওইখানে থাকেন।
-তুই চল-না আমার সাথে, কতদিন পর দেখা একটু কথা বলি, পুরানো কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে তোদের
সাথে, তোর
জন্যেই রুবি রায়ের ভালবাসা তো পেয়েছিলাম।
-কাকিমা,
কাকু কেমন আছেন?
-কেউ নেই রে,
আমিও ওর মতন একা এখন,
এ সময়ে দুজনের দেখা হওয়া খুব দরকার, একদিন যে ভালবাসা আমরা হারিয়ে
ফেলেছিলাম আজ হয়তো তার পূর্ণতা দিতে পারতাম।
-পারতাম মানে! পারতেই হবে, দেখি না কী হয়। আজ আমার চেম্বার আছে গো, আজ হবে না, কাল বা পরশু
আমরা একদিন বসব কোথাও। আজ তুমি যাও ডঃ লাহিড়ীর কাছে।
-হ্যাঁ, কাল-পরশুর বেশি দেরি করিস না আমাকে সামনের সপ্তাহে দিল্লি ফিরে যেতে হবে।
- সামনের
সপ্তাহে দিল্লি যাচ্ছ?
ওখানে তো এখন একাই থাক তাই না?
-হ্যাঁ রে, ঘর তো
বেঁধেছিলাম, ভেঙে
গেল, এখন
আমার খালি বাড়ি।
-ঠিক আছে গো
দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমার
আবার চেম্বার আছে, আমি কাল-পরশুর মধ্যেই
তোমাকে ফোন করব,
নাম্বারটা দাও।
-হ্যাঁ এই যে
নে, ফোন
করিস কিন্তু।
-হ্যাঁ রে তুই বইমেলা যাস না?
-না গো সময়
পাই না, অনেক
দায়িত্ব যে আমার
তার ওপর হসপিটাল,
চেম্বার তো আছেই,
আর একজন তো সব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে চলে গেল।
অতনু ওর
মাথায় একটা হাত রাখল,
তারপর বলল আসিস কিন্তু।
অতনু তার
প্রফেসরের সাথে দেখা করে,
কিছুক্ষণ কথা বলল,
চা খেল তারপর ওঁকে প্রণাম করে বেরিয়ে এলো। বইমেলার উদ্দেশ্যে ড্রাইভারকে গাড়ি চালাতে নির্দেশ দিল। এই নিয়ে তার সাত নম্বর বই বার হচ্ছে, প্রত্যেকটি
বইতে কখনও রুবি রায়কে নিয়ে কবিতা, কখনও বা গল্প লিখেছে। আজ যে তার জন্য এক বিস্ময় অপেক্ষা
করছে তার জন্য প্রস্তুত ছিল না। দূর থেকে দেখতে পেল তার বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছে এক
মহিলা, মহিলার
মুখটা দেখা যাচ্ছিল না কিন্তু পেছন থেকে অতনুর চোখে পড়ল, পরনে হালকা
গোলাপি রঙের তাঁতের শাড়ি পরা, লম্বা দীঘল চেহারা, উজ্জ্বল
গৌরবর্ণা, ঘাড়ের
কাছে একটা এলো খোঁপা। অতনুর বুকটা ধক করে উঠল, কীরকম যেন চেনা লাগছে পেছন থেকে, এ সে নয়তো!
দুরুদুরু বক্ষে কাছে এলো কী এক অমোঘ আশা নিয়ে। কাছে আসতেই সে মুখ
ফেরাল, অতনুর
মনে হল ঈশ্বর আছেন, এই
তো তার রুবি রায়।
একটু গায়ে মেদ লাগলেও মুখের ভাব একইরকম আছে, অতনুর উজ্জ্বল চোখ দুটো যেন কী এক হঠাৎ পাওয়ার আনন্দে ভেসে যাচ্ছে, তার চোখে জল এসে যাচ্ছে, সে কিন্তু
কৌতুক করে সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
-তোমাকে
কোথায় যেন দেখেছি।
অতনু তার দু
কাঁধটা শক্ত করে ধরে বলল আর তোমাকে হারিয়ে যেতে দেব না, আমার ভাঙা
ঘর শুধু তোমার পথ চেয়েই আছে।
-আমাকে তুমি
খুঁজেছিলে?
ওরা মেলার
প্রাঙ্গণ থেকে একধারে সরে এলো, তারপর অতনু বলল, যেদিন থেকে টুটুর কাছে জানতে পারলাম
যে তুমি একা হয়ে গেছ,
সেদিন থেকে শুধু তোমাকেই খুঁজে গেছি। মা-বাবার জবরদস্তিতে
বিয়ে একটা করেছিলাম কিন্তু ভালবাসতে পারিনি, তাই সে আমাকে মুক্তি দিয়ে চলে গেছে।
আর আমি পাগলের মতন তোমাকে খুঁজে গেছি।
বই বেরোবার
সময় হয়ে গেছে, তার
ডাক পড়ল, প্রধান
অতিথিরা সব এসে গেছেন। কোনরকমে মোড়ক উন্মোচন করে অতনু চলে এলো তার
রুবি রায়ের কাছে,
হাতে কয়েকটা নতুন প্রকাশিত বই নিয়ে, এসে তাকে বলল আমার নতুন বইয়ের নামটা
দেখ।
-হ্যাঁ সেটা
দেখেই তো দাঁড়িয়ে গেলাম,
তাছাড়া শুনলাম তুমি এখনই আসছ, মনে একটু সংশয় থাকলেও পেছনে তোমার ছবি আর পরিচিতি দেখে আর
কোন সংশয় রইল না।
-চল এখান থেকে বেরিয়ে পড়ি।
-কোথায় যাবে?
-যেদিকে দু
চোখ যায়, এখন
কোন বাধা নেই।
-এবার আমরা
মুক্ত বিহঙ্গ কিন্তু কতক্ষণ?
-মানে?
-মানে সময় তো
কমে এসেছে।
-না না
এতদিনের অপেক্ষা আমাদের সময় অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
অতনু উদাত্ত
কণ্ঠে আবৃত্তি করল,
-‘ওরে বিহঙ্গ
তবু বিহঙ্গ মোর এখনি অন্ধ বন্ধ কোর না পাখা…’
অনুমিতা
হেসে বলল,
-চলো যাই।
ওরা চলে এলো
গঙ্গার ধারে, তখন গঙ্গার ধার এত সাজানো-গোছানো ছিল না, এলোমেলো ছিল।
রেললাইন পার হয়ে যেতে হত, তা হয়তো এখনও হয়, কিন্তু সাজানো-গোছানোর চেয়ে এলোমেলো গঙ্গার ধারটাতেই যেন প্রকৃতিকে বড় নিবিড় করে পাওয়া
যেত। পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা ফেরি, দূর আকাশে
উজ্জ্বল চাঁদের আলো।
অনুমিতা বলল,
-আজ
পূর্ণিমা দেখ, কেমন
সুন্দর চাঁদ।
-হ্যাঁ দেখেছি, সেদিনও
পূর্ণিমা ছিল।
-কবে?
-মনে নেই? দোল
পূর্ণিমার দিন, যেদিন তোমাকে আবীর মাখানোর ছলে প্রথম
স্পর্শ করেছিলোম আর আজ প্রায় পঁচিশ বছর পর আবার তোমাকে স্পর্শ করলাম।
-অনুভবটা
একইরকম আছে শুধু সময়টা পেরিয়ে গেছে।
বলে অনুমিতা হাসল সুন্দর করে।
-এই সেই টোল
ফেলা গালের মিষ্টি হাসি।
অতনু নতুন
করে আবেগে ভেসে গেল বলল,
-আমার ইচ্ছে করছে এখনি গঙ্গা পার হয়ে দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে মায়ের মূর্তির
সামনে সিঁদুর পরিয়ে তোমাকে নিজের করেনি, তারপর ভেসে
বেড়াই দুজনে বাধা-বন্ধনহীন এক ভালবাসার সাগরে।
অনুমিতা
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা কবিতা মনে মনে তৈরি করে বলে উঠল,
-দেখো তো
চেনো কি আমায়!
আমি তোমার
সেই রুবি রায়,
রাস্তায় যার
জন্য থাকতে অপেক্ষায়।
কত যুগ গেল
কেটে
এতদিনে সেই
অপেক্ষার সুতোটা গেল ছিঁড়ে।
এলো সেই
মিলনের ক্ষণ,
মিলিত হোক
দুটি অপেক্ষারত প্রাণ।
অতনু এগিয়ে
এসে দু হাতে ওর মুখটা তুলে ধরে গভীর চুম্বন এঁকে দিল ওর ঠোঁটে, মুখে, গালে, গলায়,
কেঁপে উঠল অনুমিতার দেহ নিজেকে সঁপে দিল অতনুর বুকে, ওকে জড়িয়ে
ধরল অতনু। তারপর বলল চল এবার যাওয়া যাক।
-কোথায়?
-কোথায় মানে
দক্ষিণেরশ্বর, ঘর
বাঁধব না এবার।
-হ্যাঁ বহু
প্রতিক্ষিত আমাদের ভালবাসার ঘর।
চাঁদটা
আকাশে জ্বলজ্বল করছে,
ওরা দুজন ফেরিতে উঠল মন্দিরে যাবে বলে। গঙ্গবক্ষের উত্তাল
হাওয়ায় অনুমিতার আঁচল চুল সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, অতনু ওর
আঁচলটা টেনে নিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে গাইল,
-‘মনে পড়ে
রুবি রায় কবিতায় তোমাকে একদিন কত করে ডেকেছি, আজ হায় রুবি রায় ডেকে বলো আমাকে…’ এবার
অনুমিতা গাইল,
-তোমাকে
কোথায় যেন দেখেছি…’
~~০০~~

No comments:
Post a Comment