বাতায়ন/তূয়া
নূর সংখ্যা/পর্যালোচনা/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া নূর সংখ্যা | পর্যালোচনা
কবিতা— তৃষ্ণা বিষয়ে জলের হিসাব
কবি— সৌহার্দ সিরাজ
পর্যালোচক— তৈমুর খান
তূয়া নূর সংখ্যা | পর্যালোচনা
কবিতা— তৃষ্ণা বিষয়ে জলের হিসাব
কবি— সৌহার্দ সিরাজ
পর্যালোচক— তৈমুর খান
"কবিতার নামটি বেশ ইঙ্গিতবহ। ‘তৃষ্ণা’ হলো মানুষের আদিম প্রবৃত্তি বা আকাঙ্ক্ষা, আর ‘জলের হিসাব’ হলো সেই আকাঙ্ক্ষাকে মেটানোর জাগতিক বা লজিক্যাল সমীকরণ।"
এটা কারো ভোলার কথা নয়!
মনোভাব বদল করে করে
কিছু একটা করতে চাইছে
ঘুম ভেঙে গেলে আশ্চর্য নীল বছরগুলো একবার দেখে নিও
কবিতা সমালোচনা: তৃষ্ণা বিষয়ে জলের হিসাব
১. শিরোনামের সার্থকতা
কবিতার নামটি বেশ ইঙ্গিতবহ। ‘তৃষ্ণা’ হলো মানুষের আদিম প্রবৃত্তি বা আকাঙ্ক্ষা, আর ‘জলের হিসাব’ হলো সেই আকাঙ্ক্ষাকে মেটানোর জাগতিক বা লজিক্যাল সমীকরণ। শিরোনামটি শুরুতেই পাঠককে বুঝিয়ে দেয় যে, এই কবিতা কেবল রোমান্টিক কোনো তৃষ্ণা নয়, বরং অস্তিত্ব ও চাহিদার এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
২. বিষয়বস্তু ও ভাবনার গভীরতা
কবিতাটি মূলত মানুষের অস্তিত্ব, স্মৃতি এবং আধুনিকতার দ্বন্দ্ব নিয়ে কথা বলে।
প্রথম স্তবক: কবি ‘মানব সরোবর’ এবং ‘জন্মের ইতিহাস’ দিয়ে শুরু করেছেন। এটি মানুষের কালেক্টিভ মেমোরি বা সমষ্টিগত অবচেতনের দিকে ইঙ্গিত করে। জন্মের ইতিহাস যে ঘুমিয়ে থাকে, কিন্তু ভোলা যায় না—এই লাইনটি মানুষের শেকড়ের টানকে মনে করিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় স্তবক: এটি কবিতার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। ‘বহু পুরাতন তৃষ্ণা আধুনিক সমাজের চিন্তা মাথায় নিয়ে হামাগুড়ি দিচ্ছে’—এই চিত্রকল্পটি অসাধারণ। মানুষের আদিম প্রবৃত্তি (তৃষ্ণা) যখন আধুনিকতার জটিলতা (চিন্তা) দ্বারা ভারাক্রান্ত হয়, তখন সে আর স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না, তাকে ‘হামাগুড়ি’ দিতে হয়। এটি আধুনিক মানুষের অসহায়ত্বের এক নিখুঁত ছবি।
৩. চিত্রকল্প ও রূপক (Imagery & Metaphor)
কুয়াশার চোখ: কুয়াশার মতো অস্পষ্ট জিনিসের ‘চোখ’ খুলে রাখা—এটি একটি চমৎকার বিমূর্ত চিত্রকল্প। এটি হয়তো অবচেতন মনে দেখার বা অস্পষ্ট ভবিষ্যতের দিকে ইঙ্গিত করে।
নীল বছর: ‘নীল বছর’ শব্দবন্ধটি নস্টালজিয়া, বেদনা বা গভীরতার প্রতীক হতে পারে। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো এখানেও রঙের একটি বিষণ্ন ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
৪. গঠন ও ভাষাভঙ্গি
কবিতাটি গদ্যছন্দে লেখা এবং এর ভাষাভঙ্গি বেশ সংযত। তবে তৃতীয় স্তবকটি (‘যৌথ উপস্থিতির প্রবণতা বিষয়ক অধিকার...’) কিছুটা তাত্ত্বিক (theoretical) মনে হয়েছে। এখানে আবেগের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্যামিতি বেশি কাজ করেছে, যা সাধারণ পাঠকের জন্য কিছুটা দুর্বোধ্য হতে পারে। ‘অধিকার’ এবং ‘মনোভাব বদল’ শব্দগুলো কবিতার লিরিক্যাল ফ্লো-কে কিছুটা ধীর করে দিয়েছে।
৫. সামগ্রিক মূল্যায়ন
এটি একটি ‘ইন্টালেকচুয়াল’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক কবিতা। কবি এখানে আবেগের চেয়ে মস্তিষ্ককে বেশি নাড়া দিতে চেয়েছেন। কবিতার শেষ দুই লাইন একটি রহস্যময় আশাবাদের জন্ম দেয়—যেখানে ঘুম ভাঙলে ‘আশ্চর্য নীল বছর’ দেখার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এটি পাঠককে ভাবনার অবকাশ দেয়।
পরামর্শ (যদি গ্রহণ করেন):
তৃতীয় স্তবকটি (যৌথ উপস্থিতি...) আরেকটু সহজ বা চিত্রল (visual) করা গেলে কবিতার প্রবাহ আরও মসৃণ হতো। বর্তমানে এটি খুব বেশি বিমূর্ত (abstract) মনে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এটি একটি শক্তিশালী আধুনিক কবিতা যা মানুষের চিরন্তন তৃষ্ণা এবং সমসাময়িক সংকটের মধ্যে সেতু তৈরি করেছে।

No comments:
Post a Comment