বাতায়ন/তূয়া
নূর সংখ্যা/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া
নূর সংখ্যা | ছোটগল্প
জয়নাল
আবেদিন
ঋণ
শোধ
"রাতে বিছানায় পিঠ পেতে মাঝে মাঝে ভাবে সজল। ঋণের বোঝা যে কী ভীষণ বোঝা। যার ঘাড়ে না চেপেছে, কিছুই বুঝল না। অথচ, মেয়েদের জন্য কী সহজ ঋণ শোধের নিয়ম। যেন গঙ্গা জলে গঙ্গা পুজো।"
সুমনা যখন নববধূর সাজে বাড়ি
থেকে শেষ বিদায় নিয়ে বের হবে। দরজার সামনেই জেঠিমা কুলোয় চাল হাতে দাঁড়িয়ে।
সুমনার মা, দিদি, মাসি সকলেই প্রায় পিছু পিছু। জেঠিমা সুমনাকে দাঁড় করিয়ে
মায়ের ঋণ শোধ করে যেতে বলে। দু’হাতে মুঠো ভরে চাল বাঁধের উপর দিয়ে পিছনে
ফেললে সে। ওর মা আঁচল পেতে দাঁড়িয়েছিল ধরে নিল। এমনভাবে
পরপর তিনবার মুঠো ভরা চাল ছুঁড়ে দিয়ে। দরজা পেরিয়ে সাজানো গাড়ির দিকে এগিয়ে
গেল।
সজল, সুমনার একমাত্র দাদা। জল ভরা চোখে ভাবছিল। মাত্র
তিন মুঠো চালে সব ঋণ শোধ হয়। কেন এমন প্রথা এ সমাজে বেঁচে আছে। উনিশ বছর কষ্ট করে
লেখাপড়া শিখিয়ে, একটা মেয়েকে বিয়ে
দিয়ে, অন্য সংসারে পাঠানোর বিনিময়ে
তিন মুঠো চালের মূল্য মাত্র!
সুমনা, দাদার বুকে মাথা রেখে একটু কেঁদেছিল। সে জানে কাল থেকে
দাঁতে দাঁত দিয়ে লড়াই শুরু হবে দাদার। সামান্য রোজগারে কষ্ট করে চলা সংসারটা-
আরও কষ্টের গভীরে চলতে থাকবে ক্রমশ। দিন যাপনের লড়াইটা দাদার জন্য কতটা কঠিন
সময়ে এসে ঠেকবে, সুমনা ভাবতে থাকে।
নতুন বাড়িতে হইচই হুল্লোড়ে
কটা দিন কেটে গেল বেশ। সজল সব কাজ সামটে চাকরিতে বের হল। সামান্য বেতনের ছোট্ট
কারখানায় চাকরি। হঠাৎ বাবা মারা যাবার পর মালিক ডেকে বাবার জায়গায় কাজটা
দিয়েছিল।
-তোর বাবা খুব ভাল মানুষ ছিল। হঠাৎ চলে গেল। তুই একটু মন
দিয়ে কাজ শিখেনে। না হলে সংসার চলবে কী করে?
সেই আঠারো বছর বয়সে পড়ায়
ইতি দিয়ে কাজে আসা। এগারো বছর হতে চলল চাকরির জীবন। ধার-দেনা করে
বোনের বিয়ে দিয়েছে ভাল বাড়িতে। এখন মা-ছেলের সংসার। একটু
হিসেব করে চললে, দেনা মেটানো সম্ভব
হবে। মনে মনে অঙ্ক মেলায় সজল।
তিনটে বছর পার। সুমনা জামাইকে
নিয়ে বার কয়েক ঘুরে গেছে। মা’কে নিয়ে সজল বার তিনেক, ছুটির দিনে এক বেলার জন্য দেখে এসেছে। দেনার ভার বেশ কিছুটা
কমিয়েছে। খালাস পেতে আরো একটা বছর। রাতে বিছানায় পিঠ পেতে মাঝে মাঝে ভাবে সজল।
ঋণের বোঝা যে কী ভীষণ বোঝা। যার ঘাড়ে না চেপেছে, কিছুই বুঝল না। অথচ, মেয়েদের জন্য কী সহজ ঋণ শোধের
নিয়ম। যেন গঙ্গা জলে গঙ্গা পুজো।
~~০০০~~

No comments:
Post a Comment