প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

তূয়া নূর সংখ্যা | জিরাফের গলা

বাতায়ন/ তূয়া নূর সংখ্যা/ সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/ ৪০ তম সংখ্যা/ ২৪শে মাঘ,   ১৪৩২ তূয়া নূর সংখ্যা | সম্পাদকীয়   জিরাফের গলা "সম্পূর্ণ ভাবে ...

Friday, February 6, 2026

ঠুমরি | অজয় দেবনাথ

বাতায়ন/তূয়া নূর সংখ্যা/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া নূর সংখ্যা | ছোটগল্প
অজয় দেবনাথ
 
ঠুমরি

"টালাপার্কের গেটে দাঁড়িয়ে ওরা ফুচকা খাচ্ছিল। রিমোর স্মোকার্স কাফে তখন খুকখুকে কাশি। ফুচকা খেতে খেতে সবে জলটা গিলেছে হঠাৎই কাশির দমক। মুখটা ঘোরানোরও সময় পেল না রিমো।"

 

তখন চৈত্রের প্রচণ্ড গরম কাটানো সদ্য বিকেল, কিন্তু ঘড়ি না থাকলে সময় বোঝার উপায় নেই। আকাশ-ভাঙা ঝড়বৃষ্টির মধ্যে আনমনা, একা-একা, টালাপার্কের পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল রিমো। ইতিমধ্যে জল জমে গেছে রাস্তায়

। ধারে-কাছে আর একটাও মানুষ, এমনকি রাস্তার কুকুরও নেই। বাইপাস সার্জারির দেড় বছর পরে এ-ভাবে ভেজা হয়তো ঠিক হচ্ছে না। হঠাৎই খুকখুকে কাশি শুরু হয়েছে। লাং ঝাঁ-ঝাঁ, জ্বালা-জ্বালা করছে। কিন্তু আশ্চর্য এক উদাসীনতা ইদানীং গ্রাস করেছে তাকে।
 
অন্যমনস্কভাবে টালাপার্কেই ঢুকে পড়ল রিমো, হয়তো শেলটারের খোঁজে। জীব মাত্রেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে আশ্রয় খোঁজে। সঙ্গে ছাতা নেই, অবশ্য ছাতা থাকলেও কোন কাজে দিত না। কয়েক পা এগিয়েই বেদি দিয়ে ঘেরা ঝাঁকড়া বটগাছটার নীচে বেদির উপর দাঁড়াল। সেখানে বেশ কয়েক জোড়া তরুণ-তরুণী ছাতায় মুখ ঢেকে নিজেদের নিয়ে মশগুল।
 
অনেক বছর আগে, সেদিন ভাদ্রের ঘামাচি বের হওয়া পচা গরম, সেদিনও এমনই মুষলধারায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল। সঙ্গে ছিল ঝড়, বজ্রপাত। ঠুমরি কলেজের শেষের দিকের ক্লাস বাঙ্ক করে আর রিমো সকালসকাল বেরিয়ে মার্কেটিং-এর কাজ সামলে প্রায় রোজই এখানে আসত। বিকেলের মনোহর পরিবেশে বকবকম করত, তারপর চলে যেত পার্ক-ক্যাফে, ফ্যামিলি-কেবিনে কাটাত বেশ কিছুটা সময়। ঠুমরি ঘেরাটোপ ছাড়া পাবলিক প্লেসে অন্তরঙ্গ হতে চাইত না।
 
দুপুর থেকেই আকাশের মুখ ভার, হাওয়া নেই, অসহ্য গুমোট ভাব। হঠাৎ ঝড় উঠল। ঝড়ের মধ্যেও ওরা বসে ছিল, উপভোগ করছিল পাগল করা ঝোড়ো-হাওয়া। হাতেগোনা দু-চারটে পায়রাজুটি ছাড়া কেউই আসেনি সেদিন। অল্প সময়ের মধ্যেই বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল। শীত-শীত করছিল। ওরা ঝাঁকড়া গাছটার তলায় আশ্রয় নিল বেদির ওপরে। ছাতা যদিও ছিল কিন্তু মানছিল না। সাদা হয়ে যাওয়া বৃষ্টিতে দু হাত দূরেরও কিছু দেখা যাচ্ছিল না। ঝোড়ো-হাওয়ায় সওয়ার হওয়া বৃষ্টির ছাঁট সম্পূর্ণই ভিজিয়ে দিয়েছিল ওদের। ঘনঘন বজ্রপাতের শব্দে, চমকে উঠে ভয় পেয়ে বারে বারে জাপটে ধরছিল ঠুমরি। অনায়াসে ভেসে যাচ্ছিল ওর সমস্ত সংকোচ। প্রকাশ্যেই ওদের মধ্যে শুরু হচ্ছিল হয়তো অন্য সমীকরণ। সাদা হয়ে যাওয়া বৃষ্টি, চোখের ঝাপসা দৃষ্টি… মনশ্চক্ষে হয়তো স্বর্গীয় মিলনের সরগম রচিত হচ্ছিল।
 
আর একদিন, টালাপার্কের গেটে দাঁড়িয়ে ওরা ফুচকা খাচ্ছিল। রিমোর স্মোকার্স কাফে তখন খুকখুকে কাশি। ফুচকা খেতে খেতে সবে জলটা গিলেছে হঠাৎই কাশির দমক। মুখটা ঘোরানোরও সময় পেল না রিমো। আধ-চেবানো ফুচকা বোম্ব ব্লাস্টিং-এর মতো ছিটকে ভর্তি হয়ে গেল ঠুমরির চোখ-মুখ। দমকা হাসিতে ঠুমরিকে তখন সামলানো দায়।
 
সত্যিই মনের দৌড় বড়ই বিচিত্র! অবাধ তার গতি।
 
ওদের সম্পর্কের শুরুর দিকে ঘনিষ্ঠ এক বান্ধবী অর্পিতার বিয়েতে ওরা দুজনেই নিমন্ত্রিত। ঠুমরিকে বাইকে করে বাড়ি থেকে নিয়ে একসঙ্গেই গেছে। বিয়ে বাড়িতে যা হয়, বিয়ে মিটে যাওয়ার পরেও ঠুমরির ফিশফাশ নানান গল্পে রাত্রি গড়িয়ে তখন দেড়টা। স্বাভাবিক ভাবেই ঠুমরি বলল তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে। রিমোও এই দায়িত্ব আনন্দের সঙ্গেই নিল।
 
তারপর টিপটিপ ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে সোজা রাস্তায় না গিয়ে এ-রাস্তা সে-রাস্তা ধরে যতটা সম্ভব ঘুর পথে ডিগডিগ করে খুব আস্তে আস্তে বাইক চালাচ্ছিল রিমো যাতে সময় বেশি পাওয়া যায়। পৃষ্ঠলগ্না ঠুমরি খুশিতে মাঝেমধ্যেই জাপটে ধরছিল রিমোকে। ওরা বাড়ি পৌঁছল অনেক রাত্রে, সবাই শুয়ে পড়েছে তখন। সদরের ছিটকিনি সোজা করে দেওয়া থাকায় ওদের ঢুকতে অসুবিধা হল না। দোতলায় উঠে সেদিনই প্রথম চুমু খেতে চেয়েছিল রিমো, ঠুমরিও বিন্দুমাত্র বাধা না দিয়ে সানন্দে সাড়া দিল। অনেকটা সময় অধরের রসে তৃপ্ত হয়ে নিজের বাড়ি ফিরে গেল রিমো।
 
দুজনের মধ্যে বিয়ের সবই ঠিক ছিল। শুধু বাড়িতেই জানানোর অপেক্ষা। রিমো ঠুমরির বাড়ি গেল। ঠুমরির তথাকথিত অভিজাত রক্ষণশীল পরিবার দূর দূর করে রিমোকে তাড়িয়ে দিল। সার্বিক পরিস্থিতিতে ঠুমরি পাগলের মতো আচরণ শুরু করল। ঠুমরির অবস্থা দেখে স্থির থাকতে পারল না রিমো, কিন্তু… তখনই কিছু না বলে অপমানে, দ্বিধায় চুপচাপ বেরিয়ে গেল। মনে রইল সিদ্ধান্তহীনতা, দোলাচল।
 
মাস খানেকের মধ্যেই ঠুমরির বিয়ে হয়ে গেল। রিমো জানতে পারল, মাস ছয়েক আগেই ঠুমরির পূর্ণ সম্মতিতে এ বিয়ে ঠিক করাই ছিল।
 
~~000~~

No comments:

Post a Comment

গঙ্গার পাড়ে সূর্যাস্ত


Popular Top 10 (Last 7 days)