বাতায়ন/তূয়া
নূর সংখ্যা/রম্যরচনা/৩য় বর্ষ/৪০তম সংখ্যা/২৪শে মাঘ, ১৪৩২
তূয়া
নূর সংখ্যা | রম্যরচনা
জয় মণ্ডল
শীতের
সকাল ও লেপ-পুরাণ
"বাঙালির সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ঘড়ির অ্যালার্ম। যখন সাতটার সময় ঘড়িটা চিৎকার শুরু করে, তখন লেপের ভেতর থেকে যে হাতটা বেরিয়ে ওটাকে বন্ধ করে, তার মধ্যে যে শৌর্য থাকে তা নেপোলিয়নেরও ছিল না।"
বাঙালির বারো মাসে তেরো
পার্বণ থাকলেও, আসল উৎসব কিন্তু শুরু হয়
আলমারির ওপর থেকে সেই ধুলোমাখা লেপটা নামানোর দিন থেকে। বাঙালির কাছে শীতকাল মানে
কেবল নলেন গুড় বা জয়নগরের মোয়া নয়; শীতকাল মানে হলো— পরম আলসেমির
লাইসেন্স।
শীতের সকালে বাঙালির সবচেয়ে
বড় শত্রু হলো ঘড়ির অ্যালার্ম। যখন সাতটার সময় ঘড়িটা চিৎকার শুরু করে, তখন লেপের ভেতর থেকে যে হাতটা বেরিয়ে ওটাকে বন্ধ করে, তার মধ্যে যে শৌর্য থাকে তা নেপোলিয়নেরও ছিল না। লেপের
ভেতরের তাপমাত্রা আর বাইরের পৃথিবীর তাপমাত্রার মধ্যে যে যুদ্ধ চলে, তাতে বাঙালির মন সর্বদা লেপের পক্ষেই সওয়াল করে। মনে হয়— আর পাঁচ মিনিট! এই পাঁচ মিনিটেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব
শান্তি লুকিয়ে আছে।
তারপর আসে সেই দুঃসাহসিক
কাজ—স্নান করা। বাঙালির কাছে শীতকালে স্নান করাটা অনেকটা হিমালয় জয়ের মতো।
বাথরুমের চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে বালতির জলের দিকে আমরা যেভাবে তাকাই, মনে হয় যেন সাক্ষাৎ যমরাজ জলকেলিতে মত্ত। কোনোমতে গায়ে দু’-ফোঁটা জল
ছিটিয়ে বেরিয়ে এসে গায়ে চাদর জড়িয়ে যখন আমরা রোদে বসি, তখন নিজেদের মনে হয় একেকজন যুদ্ধজয়ী বীর।
দুপুরে রোদ পোহাতে পোহাতে
কমলালেবুর খোসা ছাড়ানো আর রোববারের খবরের কাগজের রবিবাসরীয় পড়া—এই সুখের কোনো
তুলনা নেই। তবে আসল ট্র্যাজেডি হলো যখন সেই রোদে পিঠ দিয়ে বসে থাকা অবস্থায় মা বা
গিন্নি বলেন, ‘যাও তো, বাজার থেকে একটু ধনেপাতা নিয়ে এসো।’ তখন মনে হয়, এই অমানবিক অত্যাচারের কথা রাষ্ট্রপুঞ্জে জানানো উচিত।
শীতের সন্ধ্যা মানেই হলো
মাঙ্কি টুপি আর সোয়েটার পরা একদল অদ্ভুত দর্শন মানুষের মেলা। কে কার চেয়ে বেশি
কাঁপছে, তাই নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা।
তবে যাই বলুন, কড়া লিকার চা আর গরম বেগুনির
সাথে শীতের এই আলসেমি না থাকলে বাঙালির জীবনটা একবারে বিস্বাদ হয়ে যেত। শীতকাল আসে
আর যায়, কিন্তু বাঙালির এই
‘লেপ-বিলাসী’ আত্মা চিরকাল অমর হয়ে থাকে।
~~০০০~~

No comments:
Post a Comment