বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/পর্যালোচনা/৩য় বর্ষ/৪৪তম
সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি | পর্যালোচনা
কবিতা— বৈশাখ
কবি— ইন্দ্রাণী বিশ্বাস মণ্ডল
পর্যালোচক— দীপক বেরা
ক্ষণিকের অতিথি | পর্যালোচনা
কবিতা— বৈশাখ
কবি— ইন্দ্রাণী বিশ্বাস মণ্ডল
পর্যালোচক— দীপক বেরা
"বাতাসের ঈর্ষা করা, মেঘের বজ্রহুংকার বা পাতার অভিমানে ঝরে পড়া—পুরো কবিতায় প্রকৃতিকে মানুষের মতো সংবেদনশীল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।"
সেখানে বসন্ত এসে বসেছিল।
চাতকের মতো তাকিয়ে দেখছে যে তৃষ্ণা
তার কাছ থেকে
সরে থাকা যায়নি।
বৃষ্টি আসার আগে শুকনো পাতা ছড়িয়েছিল
অভিমানে,
তপ্ত শরীর সে পাতার ছোঁয়ায় আরক্ত।
ঈর্ষিত হয়ে বাতাস সব কটি ঝরাপাতা
উড়িয়ে ফেলেছিল কোথাও,
এসব দেখেও বৃষ্টি সময় নিয়েছিল নামতে।
বজ্রহুংকারে মেঘকে উড়িয়ে
দিতে চেয়েছিল চৈত্র।
মাটির ফাটলে ফাটলে লেখা আছে যে বিরহ
তাপিত হৃদয়ের শত ব্যথায়
মন বলে কাছে ডাক,
যতই রুদ্র হোক,
দহন দিনেও তোমায় ভালবাসি বৈশাখ।
এত সাফাই গেয়ে নেবার কারণ হলো, আমি একটি কবিতার পর্যালোচনা লিখতে বসেছি। কবিতাটি পড়ে আমার ভেতরে নতুন যে কবিতাটি জন্ম নিয়েছে, সেটি সম্পর্কে দু’টি কথা জানাতে এসেছি। এর বেশি কিছু নয়! হয়তো আমার এ বোধ নিতান্তই অর্বাচীন। পিপীলিকাসম, —তবু তার পাখা আছে। সেই পাখায় ভর করেই একটু প্রয়াসী হওয়ার চেষ্টা করা মাত্র।
কবিতাটির পাঠ পর্যালোচনা করতে গিয়ে যে প্রধান দিক বা বিষয়গুলো উঠে আসে, সেই পাঁচটি বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করলাম—
কবিতাটির শুরুতে বসন্তের বিদায় ও বৈশাখের আগ্রাসী আগমনের কথা বলা হয়েছে। বসন্ত যেখানে স্নিগ্ধতা আর মিলনের প্রতীক, বৈশাখ সেখানে দহন ও প্রখরতার। বসন্তের ফেলে যাওয়া স্মৃতির ওপর বৈশাখের রুদ্ররূপ এক ধরণের আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে।
এখানে 'চাতক' এবং 'মাটির ফাটল' শব্দবন্ধগুলি অতৃপ্ত হৃদয়ের প্রতীক্ষাকে প্রকাশ করে। বৃষ্টির জন্য মাটির যে হাহাকার, তা আসলে প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাওয়ার এক তীব্র বাসনা। শুকনো পাতার অভিমান কিংবা বাতাসের ঈর্ষা—সবই প্রিয়তমার অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি, যা পাঠককে বিরহের এক গভীর স্তরে নিয়ে যায়।
বলা যায় প্রকৃতিকে মানবিক গুণাবলীতে (Anthropomorphism) ভূষিত করেছে। বাতাসের এই ঈর্ষাকাতর আচরণ বৈশাখের রুক্ষতাকে আরও বেশি রহস্যময় করে তোলে। বৈশাখের এই দহন আসলে প্রেমিকের অন্তরের দহন, যা বজ্রহুংকার বা ঝড়ো হাওয়ার মাধ্যমে তার বিক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে।
পর্যালোচনার সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হলো শেষ লাইনগুলো। যতই রুদ্র হোক বা দহনবেলা আসুক, কবি বৈশাখকেই ভালবাসার কথা বলেছেন। এর অর্থ হলো—কষ্ট, বিরহ বা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অস্তিত্বের মূলে যে টান, তাকে অস্বীকার করা যায় না। এটি কেবল প্রকৃতির বর্ণনা নয়, বরং জীবনের সমস্ত কঠোরতা ও দহনকে মেনে নিয়েও তার প্রতি গভীর অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ। বৈশাখের রুদ্ররূপ আসলে প্রেমেরই এক ভিন্ন ও কঠোর প্রকাশ। এটি মূলত ধ্বংসের মাঝে সৃষ্টির আনন্দ এবং রুদ্রের মাঝে সুন্দরের বন্দনা।
কবিতাটিতে 'চৈত্র', 'বৈশাখ', 'বৃষ্টি' এবং 'শুকনো পাতা'—এই শব্দগুলো কেবল ঋতু বা প্রাকৃতিক অনুষঙ্গ নয়, বরং এগুলো বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের এক চিরন্তন কাব্যিক কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে।
বৈশাখের দহনকে কেবল গরম হিসেবে না দেখে তাকে 'ভালবাসা' ও 'অভিমান'-এর চশমায় দেখা হয়েছে। বিশেষ করে "দহন দিনেও তোমায় ভালবাসি বৈশাখ", লাইনটি কবিতার মূল সুরকে একটি সার্থক সমাপ্তি এনেছে।
কবিতাটিতে পঙ্ক্তি বিন্যাস বা সুনির্দিষ্ট ছন্দ (যেমন: মাত্রাবৃত্ত বা অক্ষরবৃত্ত) স্পষ্ট নয়। এটি গদ্যকবিতার ধাঁচে লেখা হলেও লয় বা তালের কিছুটা অভাব অনুভূত হয়। গদ্যছন্দের প্রবাহে কিছুটা স্থবিরতা লক্ষ্য করছি— যেমন, শেষ দুই লাইনে ("কাছে ডাক" এবং "ভালবাসি বৈশাখ") জোর করে অন্ত্যমিল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা ওপরের মুক্ত ছন্দের সাথে আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কিছু জায়গায় বাক্য গঠন কিছুটা আড়ষ্ট। যেমন— "তৃষ্ণা তার কাছ থেকে সরে থাকা যায়নি" বাক্যটিতে অর্থের অসম্পূর্ণতা বা অস্পষ্টতা বিদ্যমান। বাক্যটি আরও সহজ ও কাব্যিক হতে পারত।
এখানে চৈত্র ও বৈশাখের সময়কাল ও সংঘাতের বিষয়টি আরও একটু স্পষ্ট হলে ভাল হতো।
কবিতায় বৈশাখ, বসন্ত এবং চৈত্র—তিনটি সময়কে একসঙ্গে মেশানো হয়েছে। যদিও কাব্যিক অর্থে এটি সম্ভব, কিন্তু "বজ্রহুংকারে মেঘকে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল চৈত্র" লাইনটি ঋতুচক্রের স্বাভাবিক গতির সাথে কিছুটা সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে, কারণ চৈত্র সাধারণত বৃষ্টির চেয়ে শুষ্কতার জন্য বেশি পরিচিত।
'চাতকের মতো তাকিয়ে থাকা' বা 'মাটির ফাটলে বিরহ'—এই উপমাগুলো বাংলা কবিতায় অত্যন্ত সাধারণ বা ক্লিশে (Cliche)। চিত্রকল্পের নতুনত্বের অভাব এখানে স্পষ্ট।
কবিতাটিতে অনুভূতির তীব্রতা চমৎকার, তবে কিছুটা ঘষামাজা করলে এবং পঙ্ক্তিগুলোকে সুবিন্যস্ত করলে কবিতাটি আরও মানসম্মত হয়ে উঠবে।

No comments:
Post a Comment