প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

ক্ষণিকের অতিথি | আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কগ্রস্ত

বাতায়ন / ক্ষণিকের অতিথি /সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/৪৪তম সংখ্যা/২৩শে   ফাল্গুন ,   ১৪৩২ ক্ষণিকের অতিথি  |  সম্পাদকীয়     আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কগ্রস্ত ...

Sunday, March 8, 2026

প্রায়শ্চিত্ত [১ম পর্ব] | মমিনুল পথিক

বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪তম সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি | ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
 
প্রায়শ্চিত্ত
[১ম পর্ব]

"অবুঝ নিষ্পাপ শিশুটি মায়ের মুখপানে চেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মা-বাবা বলতে নাহার একাই। বাবাকে হয়তো চেনেই না শিশুটি। মা-ই সব।"

 
আদালতের রায়টি হাতে পাওয়ার পর আজ খুশিতে ভরপুর নাহারের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়। মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে দুচোখ আনন্দাশ্রুতে ভাসিয়েছেন তিনি। মা-বাবার দিকে তাকিয়ে একরকম ক্ষোভের সাথেই বললেন, দেখলে তোমরা, আমি বলেছিলাম না, আমি জিতবই। আল্লাহ সবার বড় বিচারক। তিনি বিচারের কোন অন্যথা করেন না।
 
অবুঝ নিষ্পাপ শিশুটি মায়ের মুখপানে চেয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মা-বাবা বলতে নাহার একাই। বাবাকে হয়তো চেনেই না শিশুটি। মা-ই সব। জন্মের পর বাবাকে কোনদিনই দেখেনি সে। তাইতো বাবার অভাব অনুভব করতে দেয় না নাহার। ভাগ্যিস নাহারের বাবা-মা সুস্থ আছেন নইলে বাচ্চাটিকে বড় করতে কতই না যন্ত্রণা সইতে হতো তাকে। দুধের বাচ্চাকে রেখে ঢাকায় গিয়ে পড়াশোনা করা কি সম্ভব? শুধু বাচ্চার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই প্রায় সাড়ে চারশো কিলোমিটার দূরে গিয়ে তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। অনেকের পক্ষে হয়তো এটা অসম্ভব ছিল। কিন্তু নাহার নিজের জীবনকে বাজি রেখে তার সংকল্পে তিনি বদ্ধপরিকর ছিলেন। তবে সর্বদা তিনি মনে করেন অন্য কারো জীবনে যেন এরকম দূর্ঘটনা না ঘটে। সেটা তার শক্রু হলেও।
 
আর আট-দশটা মেয়ের মতো স্বাভাবিক জীবন ছিল নাহারের। কিন্তু কোত্থেকে এক কালো ছায়া এসে তার ভাবী জীবনের সকল আশা ও স্বপ্নকে ঢেকে দিয়েছিল। তার হৃদয় বাগিচার অফোটা ফুলগুলোকে কুঁড়িতেই বিনাশ করে দিয়েছিল। তারপরও দমে যাননি তিনি। সংগ্রাম, সাহস, মনোবল আর আল্লাহর উপর আস্থা এই চারটিকে তিনি সম্বল করে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ বাসনা মনে পোষণ করে রেখেছিলেন।
 
এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সুন্দর সাজানো-গোছানো নাসিরুল ইসলামের সংসার। তিনি সরকারি চাকুরি করতেন। বছর কয়েক হলো অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। ছেলে লতিফুল ইসলাম লেখাপড়ায় ভাল ছিল না বলে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর আর এগুতে পারেননি। অগত্যা ব্যবসায় লাগিয়ে দেন। পক্ষান্তরে, মেয়ে নাহার ছাত্রী হিসেবে খুবই ভাল। অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলেন। মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএফ ফাইভ পাওয়ার পর জেলা সদরে অবস্থিত সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ফলাফল ভাল হওয়ায় নাহারের ঢাকায় ভাল কোন কলেজে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বাবা-মার ইচ্ছা ইন্টারমিডিয়েটটা অন্তত তাদের কাছে থেকে পড়াশোনা করুক। তাছাড়া একটি মেয়ে হওয়ায় সবারই আদরও একটু বেশি ছিল।
 
নাহারদের বাড়ি ছিল শহরের অনতিদূরে একটি গ্রামে। বাসে কিংবা ইজিবাইকে গিয়ে ক্লাস করতেন তিনি। তার মনে অনেক স্বপ্ন ছিল। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে তিনিও দেশ সেবায় এগিয়ে আসবেন। সে আশাতেই তিনি লেখাপড়া আপন মনে চালিয়ে যান।
 
কলেজে ভর্তি হওয়ার পর রীতিমতো ক্লা করতে থাকেন নাহার। মাস ছয়েক পর একদিন হঠাৎ লক্ষ্য করলেন যে, কে যেন তাকে দূর থেকে অনুসরণ করছে। প্রথমে তিনি ব্যাপারটিকে আমলে নেননি। কলেজে আসা-যাওয়া, পড়ালেখা এতেই তিনি ব্যস্ত সময় কাটান। অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার মতো মন-মানসিকতা কিংবা সময় কোনটিই তার ছিল না।
 
এর মাস-খানেক পর একদিন সরাসরি সামনে এসে হাজির দৈত্যরূপী এক যুবক। প্রথমে যুবকটি নাহারকে প্রেম নিবেদন করেন। নাহার সেদিন কোন কথা বলেননি। ভয়ে কোন মতে তার নিকট হতে আল্লাহর কৃপায় অক্ষত অবস্থায় বাড়িতে ফিরে যেতে পেরেছিলেন। বাড়িতে গিয়ে ভয়ে তার গা ছমছম করছিল। প্রতিবাদ করার মতো সাহসটুকু পর্যন্ত ছিল না।
 
এক সপ্তাহ পর প্রতি দিনের মতো সেদিনও নাহার কলেজে রওনা দেন। কলেজে পৌঁছানোর একটু আগে আবার পথরোধ করলেন যুবকটি। নাহারের প্রথমে ভয় করলেও পরে মনের ভেতর শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করে প্রতিবাদ করলেন। জবাবে শাসিয়ে গেলেন বখাটে যুবকটি।
 
এভাবে প্রায়ই নাহারকে উত্যক্ত করতেন যুবকটি। নাহার যত প্রতিবাদ করেন বিপরীতে তার উত্যক্ত করার মাত্রা আরও দ্বিগুন হারে বাড়তে থাকে। এ অবস্থায় একদিন নাহার ঘটনাটি তার বাবা-মার কানে উঠালেন। বিষয়টি নিয়ে নিরীহ বাবা-মা মহা দুশ্চিন্তাই পড়লেন। একে তো তারা অন্য জেলা থেকে মাইগ্রেট হয়ে আসা। অন্যদিকে তারা কোন গোলমাল ও গন্ডগোল কখনোই পছন্দ করতেন না। এখন কী করবেন, কাকে জানাবেন, ব্যাপারটি মানসম্মানের প্রশ্ন হয়ে দেখা দেয়
 
একদিন পুরো ঘটনাটির ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে শহরে গেলেন নাসিরুল ইসলাম। সারাদিন বিভিন্ন জায়গা ঘুরে তাঁর প্রাক্তন সহকর্মী, রাজনৈতিক নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তির নিকট এবং সদর থানায় খোঁজ নিয়ে অবশেষে যুবকটির পরিচয় মেলে। তিনি শহরের ধনাঢ্য এক ব্যক্তির একমাত্র ছেলে। নাম সুজন। তিনি একটি রাজনৈতিক দলের ওয়ার্ড শাখার সভাপতি। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এমন কোন খারাপ কাজ নেই যে, তিনি তা করেননি। তার কর্মকাণ্ডে অনেকে মুখ খুলতে সাহস পান না। চাঁদা-বাজি, টেন্ডার বাজি, নারী কেলেংকারি, ইভটিজিং, খুনসহ বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত আছেন। এমনকি দুই জন স্ত্রীও বর্তমান আছে তার। এত কিছু শোনার পর নাসিরুল ইসলাম হতবম্ভ হলেন। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর দুশ্চিতার মাত্রা আরও বেড়ে গেল
 
দুশ্চিন্তার বোঝা মাথায় নিয়েই বাড়িতে ফিরলেন নাসিরুল ইসলাম। স্ত্রী লতিফা বেগমের নিকট ছেলেটি সম্পর্কে সব কথা খুলে বললেন। ঘটনার ভয়াবহতা শোনার পর যেন লতিফা বেগমের গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। তারপর স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে নাহারের কলেজে যাওয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। নাহারকে ডেকে এরকম সময়োপযোগী সিন্ধান্তের কথা জানালে, তিনি কখনো কলেজে যাওয়া বন্ধ করতে রাজি হলেন না। তিনি খুব জেদি স্বভাবের মেয়ে। তার কথাঃ সুজন আমাকে কিছুই করতে পারবে না। এভাবে বখাটের অত্যাচারে ঘরে বসে থাকলে তো দেশের কোন মেয়েরই পড়াশোনা হবে না। মুর্খ হয়ে সারাজীবন চুলায় লাকড়ি ঠেলতে হবে। তাইতো তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন।
 
ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

ফিরতে হবে ঘরে~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)