বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ভ্রমণ/৩য় বর্ষ/৪৪তম সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি
| ভ্রমণ
ডঃ শেষাদ্রি
শেখর ভট্টাচার্য
উইক
এন্ড-এ মাথেরান
"৪-৫ কিমি রাস্তা ফিরে আসার পরে হঠাৎই গাড়ির গণ্ডগোল শুরু হল এবং কিছু দূর এগিয়ে সে থেমেই গেল। গাড়ি স্টার্ট করা গেলেও চাকা আর ঘোরে না। বুঝতে পারলাম গাড়ির ক্লাচ-প্লেট জ্বলে গিয়েছে।"
আজ তোমাদের একটা জায়গার গল্প
শোনাতে ইচ্ছে করছে। সেই সুন্দর জায়গাটার চারপাশেই পাহাড়। সেখানে হাল্কা জঙ্গল আছে, আর আছে একটি সুন্দর লেক। সমুদ্রতল থেকে সেই জায়গাটা কতটা
উঁচুতে? বেশি নয়, মাত্র ৮০৩ মিটার বা ২৬২৫ ফুট। মুম্বাই থেকে দূরত্ব? তাও বেশি নয়, মাত্র ৮৩ কিমি। এবার
বোধ হয় বোঝা যাচ্ছে জায়গাটার নাম কী। হ্যাঁ ঠিক ধরেছ, জায়গাটার নাম মাথেরান।
কী করে যেতে হয়
সেখানে? সেটাও খুব সহজ ব্যাপার।
মুম্বাই অথবা থানে থেকে ট্রেনে চেপে নেরালে এসে, ন্যারোগেজ লাইনের টয় ট্রেন চড়ে মাথেরানে আসা যায়। আবার ওই জায়গাগুলো
থেকে সড়ক পথে নিজের গাড়ি বা ট্যাক্সিতেও আসা যায় মাথেরানে। নেরাল থেকে টয় ট্রেনে
চাপার ছোট্ট স্টেশনটি হ’ল ‘আমন লজ’ – বেশ মজার নাম, তাই না?
আমরা শনিবারের সকালে
(শিবরাত্রির দিনও বটে) মাথেরানের উদ্দেশ্যে বার হয়েছি থানে থেকে। যাত্রার
প্ল্যানটা এবার একটু অন্যরকম। মাজিওয়াড়ার রুস্তমজী (অ্যাজিয়ানো) টাওয়ার থেকে অটোয়
চেপে চলে এলাম জুম কার রেন্টাল সেন্টার-এ। অনলাইনে আগেই বুক করা ছিল একটি হুণ্ডাই
অ্যাক্সেন্ট। গাড়ি পেতে আধ ঘণ্টা লেগে গেল। গাবলু নিজেই চালাবে গাড়ি, আমি বসলাম তার পাশের আসনে। পিছনের সিটে ঋতি ও পারমিতা। আমরা
পাম বিচ রোড ধরে চলে এলাম বেলাপুর। রাস্তার বাঁ দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে রিলায়েন্স
কোম্পানির বিশাল বিল্ডিংগুলো। কিছুক্ষণ পরেই শিলাফাটা রোড ধরে পৌঁছে গেলাম মুম্বরা
ভ্যালি। কল্যান-সিল রোড ধরে গাড়ি ছুটছে। পূর্ব ডোম্বিওলি থেকে গাড়ি ডান দিকে বাঁক
নিল।
বহু দিনের ইচ্ছে আজ পূর্ণ হতে
চলেছে, তাই মনে বেশ আনন্দ। পালাভা
পেরিয়ে নায়ারা পৌঁছলাম সকাল ৯টা ৪০-এ। গাড়ি একটু পরেই পূর্ব বাদলাপুর পেরিয়ে
কার্জাট রোডে চলে এল। আমরা রাস্তার পাশে নারায়ণ ধাবায় এসে থামলাম চা পানের জন্য।
অম্বরনাথ পেরোতেই রাস্তার দু’ পাশে শুষ্ক, পর্ণমোচী বৃক্ষের হাল্কা সমাবেশ। এ আমার পরিচিত দৃশ্য, কয়েক বছর আগে প্রায় একই সময়ে পুনে থেকে মহাবালেশ্বর এবং
লোনাভলা-খাণ্ডালা যাবার কারণে।
গল্প করতে করতে আমরা ডান দিকে
নেরাল যাবার রাস্তা ছাড়িয়ে সোজা কার্জাটের পথে অনেক দূর চলে এসেছিলাম। ভুল ভাঙতেই
গাড়ি ঘোরানো হল। ৪-৫ কিমি রাস্তা ফিরে আসার পরে হঠাৎই গাড়ির গণ্ডগোল শুরু হল এবং
কিছু দূর এগিয়ে সে থেমেই গেল। গাড়ি স্টার্ট করা গেলেও চাকা আর ঘোরে না। বুঝতে
পারলাম গাড়ির ক্লাচ-প্লেট জ্বলে গিয়েছে। ধোঁয়াও উঠছিল অল্প অল্প। আমরা থেকে গেলাম
গাড়িতে, আর গাবলু ছুটল মেকানিকের
খোঁজে।
আমাদের গাড়ি যেখানে দাঁড়িয়ে
পড়েছে সেখান থেকে মাত্র ২০ হাত দূরে একজন লোক বিভিন্ন প্রকার শুঁটকি মাছ বিক্রি
করছে এক অস্থায়ী দোকানে। মাঝে মাঝে শুঁটকি মাছের উৎকট গন্ধ নাকে ভেসে আসছিল। গাড়ির
পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, কী করে তাড়াতাড়ি পৌঁছনো
যাবে মাথেরানে। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে মোটর সাইকেল চেপে এক মেকানিক ও তার হেল্পার এসে
হাজির। তারা গাড়ির উপসর্গ দেখে জানাল,
গাড়ির
ক্লাচ-প্লেটই জ্বলেছে এবং সেটা পাল্টাতে হবে। খরচ পড়বে প্রায় ১২ হাজার টাকা এবং
সময় লাগবে কম করেও ৩ ঘণ্টা। খরচ আমাদের দেওয়ার কথা নয় এবং ৩ ঘণ্টা সময়ও নষ্ট করার
নয়। দ্রুত যোগাযোগ করা হল জুম কার-এর অফিসে। সঙ্গের মহিলাদের নিরাপত্তাহীনতার
কারণে এবং পুলিশের ভয় দেখিয়ে জুম কার-এর ভারপ্রাপ্ত এক অফিসারকে রাজি করান গেল
শর্ত সাপেক্ষে। আমরা গাড়ির চাবি ভিতরে রেখে গাড়ি বন্ধ করে দিলাম। গাড়ি কোথায় পার্ক
করা আছে তা আগেই জানানো হয়েছিল জুম কার-এ।
অনাহুত ঝামেলায় ইতিমধ্যে এক
ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়ে গেছে। ১০ কিমি দূরত্বে মাথেরান যাবার ট্যাক্সি এল আরও ১৫ মিনিট
পরে। গাড়িতে চড়ে বাঁ দিকে নেরাল হয়ে মাথেরানের রাস্তায় আসতেই আমরা খুশি হয়ে উঠলাম।
শুরু থেকেই চড়াই রাস্তা পাহাড়কে পাক দিয়ে ওপরে উঠেছে। ফেব্রুয়ারির দুপুর ১২টায়
রোদের তেজ যথেষ্ট। তবে মাঝে মাঝে হাওয়াও বইছিল। সহ্যাদ্রি পর্বতমালার পর্ণমোচী
বৃক্ষকুলের মাঝে কিছু চিরহরিৎ গাছ চোখের আরাম যোগাচ্ছিল। দুপুর একটা নাগাদ পৌঁছে
গেলাম মাথেরানের কার স্ট্যাণ্ডে। সেখান থেকে মূল মাথেরানের হোটেলে পৌঁছতে হবে
ঘোড়ার পিঠে চড়ে। ঘোড়া পিছু ৪৫০ টাকা দরে ৪টি ঘোড়া এবং মাল বওয়ার জন্য আরও ৩০০
টাকায় একজন কুলি নেওয়া হল সঙ্গে। প্রথমেই বুঝতে পারলাম, শৈলশহর হিসেবে মাথেরান যথেষ্ট খরচ-বহুল।
আমাদের মতো আরও কিছু পর্যটক
ঘোড়ায় চেপে চলেছেন তাঁদের জন্য আরক্ষিত নির্দিষ্ট হোটেলগুলিতে। রাস্তার চড়াই ভয়ংকর
নয়, কিন্তু অনভিজ্ঞ ও ক্লান্ত
পর্যটকদের কাছে ঘোড়ায় চড়ে যাওয়াটা দরকারি। কিছু দূর এগোতেই রাস্তার দু পাশে
প্রাচীন ও নবীন চিরহরিৎ বৃক্ষের জঙ্গল মন ভরিয়ে দিল ভাললাগায়। চড়াই পথে আড়াই-তিন
কিমি দূরত্ব পেরিয়ে ‘হোটেল শালিমার’ পৌঁছতে আধ ঘণ্টা লেগে গেল। ১৯৪৮ সালে স্থাপিত, বহু গাছপালায় সজ্জিত,
অনেকটা
জায়গা জুড়ে ছড়ানো হোটেলের গঠন অনেকটা বাংলো স্টাইলের। হোটেলে প্রবেশ করতেই আমাদের
ঠান্ডা পানীয় জল দিয়ে আপ্যায়ন করা হল। ততক্ষণে হোটেলের ৭ ও ৮ নং ঘরে আমাদের
লাগেজ দুটো পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা পরিষ্কার শোবার ঘর ও স্নান ঘর পেয়ে খুবই খুশি
হলাম।
সবারই খুব খিদে পেয়েছিল।
দুপুর আড়াইটে নাগাদ ডাইনিং হলে যাওয়ার ডাক পড়ল। দুটি নিরামিষ ও দুটি আমিষ থালি
নেওয়া হয়েছে। প্রতিটা পদই ছিল সুস্বাদু। ঘণ্টা-খানেক বিশ্রাম করে সাড়ে ৪টের আগেই তৈরি হলাম ঘোড়ায় চড়ে ১২-পয়েন্ট দেখার জন্য। এবার আমরা
দরাদরিতে সফল হলাম। সহিসরা চাইল ঘোড়া পিছু ১১০০টাকা, আমরা রফা করলাম ঘোড়া পিছু ৯০০ টাকায়।
চড়াই উতরাই পথে
আমাদের ঘোড়া চারটি এগোতে লাগল। অনেক দিন পরে ঘোড়ায় চড়েও আমার তেমন ভয় বা অসুবিধে
না হওয়ায় আমি নিজেই বেশ আশ্চর্য হলাম। গিন্নি ও মেয়ে প্রথমে ভয় পেলেও পরে তা
মানিয়ে নিয়েছিল। এ ব্যাপারে অসম সাহসী ছিল শুধু গাবলু। কিন্তু তাকেও দামাল ঘোড়া
ছাড়েনি। যাত্রার মাঝে বড় অঘটন থেকে রক্ষা পায় সে।
‘লুইসা পয়েন্ট’ থেকে পশ্চিমঘাটের অসাধারণ রূপ প্রত্যক্ষ করার
পর হঠাৎই মনে এল মহাবালেশ্বরের কথা। সেখানে সাইট সিয়িং করেছিলাম গাড়িতে, আর এই মাথেরানে সেটাই ঘোড়ায় চড়ে। সাইট সিয়িং-এর ব্যাপারে
একটা মিল আছে দুটি জায়গাতেই। মহাবালেশ্বরে সাইট সিয়িং-এর সময় গাড়ি একটি নির্দিষ্ট
জায়গায় থামিয়ে গাইড আমাদের পর পর ৩-৪টে স্পটের নাম বলে দিত, আর আমরা বহু কষ্টে সেই স্পটগুলিকে আলাদা করে চেনার চেষ্টা
করতাম। এখানে মাথেরানেও সেই একই রীতি। প্রায় ৪০ মিনিট ঘোড়সওয়ারির পর একটি জায়গায়
থেমে সহিস আমাদের জানাল, একটু এগোলেই দেখতে
পাব হনিমুন পয়েন্ট। পূর্বে সেখানে বিভিন্ন গাছ থেকে আদিবাসীরা হনি (মধু) সংগ্রহ
করত। সময় পেরিয়ে ‘হনি কালেকশন পয়েন্ট’ কীভাবে যেন ‘হনি মুন পয়েন্ট’-এ নামান্তরিত
হয়! এরপর সহিস জানাল, একটু এগোলেই পর পর
দেখতে পাব পিসরনাথ মন্দির, লেক পয়েন্ট, কিং জর্জ পয়েন্ট,
ইকো
পয়েন্ট ইত্যাদি। লেক পয়েন্ট থেকে সুন্দর চারলোট্ লেকটি দেখে সেতু পেরিয়ে চললাম সান
সেট পয়েন্টে সূর্যাস্ত দেখতে। জানিয়ে রাখি,
মাথেরানে
জল সরবরাহের প্রধান উৎস ওই শান্ত, সুন্দর লেকটি।
মাথেরান থেকে অপরূপ সূর্যাস্ত
দেখা মনে থাকবে বহু দিন। সন্ধে ৬টা ২৫ মিনিটে আমরা এসে পৌঁছলাম সান সেট পয়েন্টে।
তখনই ফটো তোলার জুতসই জায়গা বেছে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। পরবর্তী সাত মিনিটে লাল
সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত গেল পাহাড়ের পিছনে। চরাচরে রঙের বন্যা থেকে গেল আরও কিছুক্ষণ।
ক্যামেরায় তোলা থাকল অস্তমান দিবাকরের ছবিগুলো। আমাদের সবারই মনে ভারি আনন্দ।
নির্দিষ্ট স্থানে ফিরে এসে আবার চড়ে বসলাম ঘোড়ার পিঠে।
সন্ধে ৭টা, আলো কমে আসছে দ্রুত। আমরা ঘোড়ার লাগাম ধরে সাবধানে ফিরে
চললাম। পথের ধারে সোলার লাইটগুলো জ্বলে উঠেছে। দু পাশের জঙ্গলকে আরও বেশি ঘন ও
অন্ধকারময় মনে হচ্ছে। সন্ধে সাড়ে ৭টায় মাথেরানের মার্কেটে এসে পৌঁছলাম। আমরা ঘোড়া
থেকে না নেমে এগিয়ে চললাম হোটেলের পথে। আরও ১০-১২ মিনিট পরে এসে পৌঁছলাম আমাদের
সুন্দর হোটেলে। ঘোড়াওয়ালাদের টাকা মিটিয়ে আমরা ঘরে চলে এলাম হাত-মুখ ধুয়ে পরিষ্কার
হতে।
রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ হোটেলের
প্রশস্ত লবিতে ফিরে এলাম। উইক এণ্ড-র সন্ধ্যাতে আলোয় সাজানো হয়েছে জায়গাটিকে। একক সংগীত
পরিবেশনের মাধ্যমে হোটেলের পর্যটকদের মনোরঞ্জন করবেন এক স্থানীয় শিল্পী। আমরা
চেয়ারে এসে বসতেই টেবিলে চলে এল গরম গরম পনীর পকৌড়া ও চিকেন পকৌড়া। ততক্ষণে যুবক
শিল্পী গান গাইতে শুরু করেছে ক্যারাওকের সহায়তায়। রাত দশটায় গান থামলে আমরা হোটেল
ম্যানেজারকে উজ্জ্বল আলোগুলি নিভিয়ে দিতে অনুরোধ করলাম। কাছাকাছি সোলার লাইটগুলোর
ম্লান আলোয় গাছে ঘেরা হোটেলের পরিবেশ মায়াময় হয়ে উঠল। আমরা এবার ডিনারের অর্ডার
দিলাম। রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ আমরা শুতে গেলাম ঘরে।
পরদিন সকালে মুখ-হাত ধুয়ে এসে
বসেছি একটা চেয়ারে। সারাদিনের ঝরা পাতা পরিষ্কারে ব্যস্ত হোটেলের দুই কর্মচারী।
গাছপালার ফাঁক দিয়ে নবীন সূর্যের নরম আলো এসে পড়েছে লবিতে। হাল্কা, মধুর বাতাসে মন ভাললাগায় অসাড় হয়ে আসছিল। সাড়ে ৭টায় একজন
অল্পবয়সি ছেলে আমায় গরম চা দিয়ে গেল। একা বসে চা পান করলাম পরম তৃপ্তিতে। পাখিদের
কলরব প্রকৃতির মাঝে সুরেলা সংগীত হয়ে ফিরে আসছিল।
হোটেলের পিছন দিক থেকে কিছুটা
নীচে নেমে এবার প্রবেশ করলাম জঙ্গলে। প্রকৃত পক্ষে হোটেলের চারদিকেই জঙ্গল, কোথাও হাল্কা, কোথাও ঘন। জঙ্গলের
উত্তর দিক বরাবর হাঁটতে লাগলাম পায়ে-চলা সরু পথ ধরে। এদিকে জঙ্গল বেশ ঘন। হঠাৎই
দুটি বুনো মুরগি ভয়ে ছুটে পালাল। এদিকে সেদিকে সাপের গর্ত দেখে সাবধান হলাম। হোটেল
কর্মচারী বৈভব সাপের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিল গতকালই। ফিরে চললাম এবার দক্ষিণ
দিক বরাবর। এদিকে জঙ্গল কিছুটা হাল্কা। পথের বাঁ দিকে নজরে পড়ল একটি সুন্দর রেস্ট
হাউস। সেটার ছবি তোলার সময় পাহাড়াদার কুকুরটি ডেকে উঠল। এবার জঙ্গল পথেই ধীরে ধীরে
ফিরে এলাম হোটেলে। দেখি, লবিতে বসে অপেক্ষায়
পারমিতা। তার সঙ্গে বসে আরও একবার চা খেলাম।
রবিবারের সকালটা তারিয়ে
তারিয়ে উপভোগ করছি মাথেরানে। ততক্ষণে ঋতি ও গাবলু যোগ দিয়েছে চায়ের টেবিলে। আমাদের
চারপাশেই সবুজ গাছের স্নিগ্ধ আলিঙ্গন। মাঝে মাঝেই ঘোড়ার খুড়ের শব্দে চমকে তাকিয়ে
দেখছি সহিসরা তাদের ঘোড়াগুলো ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নির্দিষ্ট কোন জায়গায়। ঋতির
প্রশ্নের উত্তরে জানাই, মাথেরান মহারাষ্ট্রের
রায়গড় জেলায় কারজাট তালুকাস্থিত একটি পাহাড়ি শহর এবং নগরপালিকা পরিষদ। পশ্চিমঘাট
পর্বতে অবস্থিত মাথেরান সমুদ্রতল থেকে ২৬২৫ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এশিয়ার একমাত্র
অটোমোবাইল-মুক্ত হিল স্টেশন। এই হিল স্টেশনের আয়তন মাত্র ৭ বর্গ কিমি। আরও জানালাম, মারাঠি ভাষায় ‘মাথেরান’ শব্দের অর্থ ‘পাহাড়ের উপর জঙ্গল’।
আজ ব্রেকফাস্ট সারলাম
ব্রেড-বাটার-ওমলেট-এ। সঙ্গে গরম কফি। এবার আমরা চারজনেই হাঁটতে বার হলাম। লাল
ল্যাটেরাইট মাটিতে তৈরি রাস্তা। মাথেরানে কাল থেকেই দেখছি, আধুনিক হোটেলের পাশাপাশি বহু পারসি বাংলোর অবস্থান। এখানকার
বাস্তুকলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ছাপ স্পষ্ট। হোটেল বা বাংলো, প্রতিটাই গাছপালায় ঘেরা। হাঁটার সময় পথের পাশে গাছের
গুঁড়িতে সাপের গর্ত চোখে পড়ল, যদিও সাপ দেখিনি
একবারও। প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটাহাটি করে হোটেলে ফিরলাম বেলা ১১টা নাগাদ।
মাথেরান পশ্চিমঘাট পর্বতমালায়
অবস্থিত ছোট্ট একটি শৈলশহর। সমগ্র ভারতে এটাই সবচেয়ে ছোট হিল স্টেশন। পুরো মাথেরান
জুড়েই জঙ্গল, মাঝে মাঝে ব্রিটিশ
স্থাপত্য-রীতিতে তৈরি বাংলো এবং হোটেল। গাড়ি প্রবেশের অনুমতি নেই মাথেরানে, গাড়ি রাখতে হয় ছোট্ট শহরের বাইরে। ভারত তথা সমগ্র এশিয়া
মহাদেশে মাথেরানের তুলনা নেই গাড়ি পার্কিং-এর ব্যাপারে। তাই আজও অনেকটাই দূষণ
মুক্ত, অনুপম এই শৈলশহর।
দুপুর ১টার মধ্যে স্নান সেরে
লাগেজ গুছিয়ে আমরা সবাই তৈরি। দেড়টা নাগাদ লাঞ্চ করতে গেলাম। মেনুতে ভাত, রুটি, ডাল, আলু-গোবি, ভেন্ডি মশালা এবং
চিকেন কারি। থাকা-খাওয়ার বিল মিটিয়ে আমরা বিদায় জানালাম হোটেল কর্মচারীদের।
অপেক্ষারত কুলি মাথায় লাগেজ তুলে নিল। আমরা চারজন তার সঙ্গে উতরাই পথে চলতে
লাগলাম।
আমি মালবাহকের সঙ্গে গল্প
করতে করতে সামনে চলেছি, বাকি তিন জন পিছনে।
তাকে জিজ্ঞেস করায় সে জানাল, তার নাম আনন্দ। ঘরে
তার কে কে আছে জানতে চাইলে সে বলে, ঘরে আছে তার বাবা-মা, এক দাদা ও আর এক ছোট বোন। দাদাও মুটের কাজ করে। আমাকে
সহমর্মী ভেবে সে আরও জানায়, কোভিড মহামারীর সময়
তাদের আধপেট খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছিল। কারণ,
মাথেরানে
তখন না ছিল কোন পর্যটক, না ছিল তাদের কোন চাষ
জমি।
গল্প করতে করতেই পৌঁছে গেলাম
ন্যারোগেজ লাইনের ছোট্ট স্টেশন ‘আমন লজ’-এ। সেখান থেকে আর একটু এগিয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড।
থানের মাজিওয়াড়া যাবার জন্য ২৩০০ টাকায় রফা হল একটি নতুন হুন্ডাই অরা। দুপুর সোয়া
৩টে নাগাদ গাড়ি চলতে শুরু করল। গরম যথেষ্ট, তাই শুরু থেকেই গাড়ির এসি চালাতে হল। সদ্য পরিচিত উতরাইয়ের পথে
গাড়ি নামতে শুরু করল। মাত্র ২০ মিনিট পরেই পৌঁছে গেলাম নেরাল। পশ্চিমঘাট থেকে নেমে
এসে মনটা একটু খারাপই হয়ে গেল। পথে কোথাও থামলাম না। মাজিওয়াড়ায় রুস্তমজীর
অ্যাজিয়ানো টাওয়ার-এর নীচে গাড়ি এসে থামল বিকেল ৫টা নাগাদ।
বেড়ানোর গল্পটা এখানেই শেষ
হবার কথা ছিল, কিন্তু আমরা তা হতে দিলাম না।
ফ্ল্যাটে এসে লাগেজ রেখে এক কাপ করে চা খেয়ে নিলাম। কারুরই ঘরে থাকার ইচ্ছে নেই।
সুতরাং নীচে নেমে আবার একটি গাড়ি বুক করা হল। আমরা এবার যাব ভারসোভা বিচ। শুরু
থেকেই গাড়ি জোরে ছুটতে লাগল ইষ্টার্ন এক্সপ্রেস হাইওয়ে ধরে। ভারসোভার অবস্থান
উত্তর মুম্বাইয়ে। থানে থেকে ভারসোভা বিচের দূরত্ব ২৯ কিমি। সেখানে পৌঁছলাম সন্ধে
সাড়ে ৭টায়। ফলে ওই বিচ থেকে অপরূপ সূর্যাস্ত দেখা হল না এবার। বিশাল ভারসোভা
বিচ নিঃসন্দেহে মুম্বাইয়ের সেরা বিচ। জুতো খুলে আরব সাগরের জলে পা ভিজোলাম। বিচে
জোরে হাওয়া বইছিল। অসীম সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বেশ কয়েকটি এরোপ্লেনের যাওয়া-আসা
দেখলাম। ভারসোভা জেলেদের একটি ছোট গ্রাম। বিচের পিছন দিকে একটি ছোট অস্থায়ী দোকানে
এসে পৌঁছলাম। প্লেটে গরম গরম কাণ্ডা ভাজি (পেঁয়াজি) ও চার কাপ কফি নিয়ে বসলাম
দোকানের বাইরে রাখা বেঞ্চ-এ। দেখছিলাম, পর্যটক, ফেরিওয়ালা ও স্থানীয়
অধিবাসীদের নিয়ে বিচে ঘটতে থাকা নৈমিত্তিক ঘটনাগুলো।
রাত ৯টায় উঠে পড়লাম বিচ ছেড়ে।
আবার গাড়ি বুক করা হল থানে ফেরার জন্য। ভারসোভা বিচ পড়ে রইল পিছনে। গত দু দিনে
পাহাড়, জঙ্গল ছাড়াও দেখে নিলাম সমুদ্র। এই সব
ভাবতে ভাবতে ফিরে এলাম অ্যাজিয়ানো টাওয়ারের ফ্ল্যাটে। রাতে শুয়ে বার বার মনে ভেসে
আসছিল মাথেরানের কথা। সে যেন সহ্যাদ্রির আর এক রত্ন!
~~000~~







No comments:
Post a Comment