বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৪তম
সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি
| ধারাবাহিক গল্প
মনোজ চ্যাটার্জী
পেয়ারাবাগানের
অতিথি
[১ম পর্ব]
"এত তাড়াতাড়ি বাড়ি গেলে বাড়িতেও খ্যাচখ্যাচানি শুনতে হবে। হঠাৎ বিষ্টুর মনে হল, দুর শালা! সব ছেড়েছুড়ে পালাই। পায়ের ব্যথাটা কোথায় যেন উবে গেল।"
গলি থেকে বেরোলেই রিকশাস্ট্যান্ড।
সরু রাস্তার পাশে এখানে একটু ফাঁকা জায়গা আছে। গোটা-চারেক রিকশা পরপর পিছনে দাঁড়াতে
পারে। প্রায়ই শান্তনীল গলি থেকে বেরিয়ে দেখে বিষ্টুপদ দাঁড়িয়ে আছে লাইনের প্রথমে।
এমনিতে এখানে রিকশা নেওয়ার অনেক লোক। তবু লাইন এগুতে এগুতে বিষ্টুপদ এসে সামনে
দাঁড়ালেই বেশ কিছুক্ষণের জন্য লাইন স্তব্ধ হয়ে যায়। অনেকেই বিষ্টুকে দেখলেই এড়িয়ে
যায়। আরো খানিকটা হেঁটে গিয়ে পরের রিকশাস্ট্যান্ড থেকে রিকশা ধরে। প্রথম রিকশা
দাঁড়িয়ে থাকে, তার পিছনের রিকশারাও
দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়। আজ কয়েকবছর হল বাজারে বেশ বড়সড় তুলনায় অনেক কমফোর্টেবল
ই-রিকশা এসেছে। পায়ে টানা সাইকেল রিকশার আর কদর নেই। তার মধ্যে যারা আবার দুর্বল
বা রুগ্ন, তাড়াতাড়ি টানতে পারে না, তাদের একদম বাজার নেই।
বিষ্টুপদ এমন ছিল না। যাকে
বলে ছিপছিপে চাবুকের মতো তার ইষ্পাতের চেহারা ছিল। সাঁই সাঁই করে তার রিকশা ছুটে গিয়ে
প্যাসেঞ্জারকে বাস-ট্রেন ধরিয়ে দিত। কিন্তু সেদিন যে কী শনির দশা
ছিল, তেমন জায়গা নেই দেখেও এক বাইক
ওভারটেক করতে গিয়ে সামলাতে না পেরে এসে মারল তার ডানপায়ে। বিষ্টু তার অষ্টবক্র পা
নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল বাঁ দিকে। ভিড়ের সময় পালাতে পারবে না বুঝেই বাইকের মালিক তার উপর দরদের বন্যা বইয়ে দিল।
সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি করে তাকে হসপিটালে ভর্তি করে দেয়। হাতে হাজার দশেক টাকাও ধরিয়ে
দিল। টানা দুমাস প্লাস্টার নিয়ে ঘরে বসে থাকে। তবে ওই টাকাটা দিয়েছিল বলে
মেয়ে-বৌকে নিয়ে যাইহোক কিছু পেটে পড়েছিল। একসময় প্লাস্টার খুললে, ভাঙা হাড়
জোড়া লাগলেও সেই যে তার রিকশার
গতি খুব কম হয়ে গেল, সে আর আগের অর্ধেকও
হল না। যদিও-বা আগে দিনগুলো মোটামুটি পেরিয়ে যাচ্ছিল, এখন এক ক্রমশ ভয়ানক মন্দার দিকে বিষ্টু এগিয়ে যেতে থাকে।
তার মুখের এক বিশ্রী বেদনার অভিব্যক্তি, অধিকাংশ প্যাসেঞ্জারকে
তার প্রতি আরো বিরূপ করে তোলে। কিছু তথাকথিত মানবিক প্যাসেঞ্জার ছাড়া তার রিকশায় কেউ উঠতে চায় না।
তখন পুজোর দিনগুলো সব পেরিয়ে
গেছে। হালকা হালকা শীত পড়ছে। ভোরে আর রাতের দিকে ভালই ঠান্ডা লাগে। আর ঠান্ডা
পড়লেই হাড়ভাঙা ব্যথাটা একটু জেগে ওঠে। এক সহৃদয় যাত্রী একটা বড় ক্রেপ ব্যান্ডেজ
দিয়েছে। ওটা পায়ে জড়ালে তাও একটু আরাম পায়। প্যাসেঞ্জার বেশি জোটে। এই সময়টা প্রত্যেক বছরই কেমন খাঁখাঁ শুনশান হয়ে যায়। এমনিতে ভোরে
আর রাতের দিকে রোজগার বেশি হয়, কিন্তু এই সময়টা যেন কেমন। বিকেল থেকে কয়েক ট্রিপ মেরে সন্ধের মুখে বিষ্টু আবার লাইনের প্রথমে এসে
দাঁড়ায়। একটা ঝরঝরে রিকশা আর তারপাশে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত মুখ। বিরক্তি ও হতাশার ব্রেক-ইভেন
পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছে। অন্য সময় মিনিট কুড়ির মধ্যে কাউকে না কাউকে পেয়ে যায়। রিকশাওলাদের
মধ্যে এক বিশেষ স্বজাতিবোধ থাকে। লোকসান হলেও পিছনের রিকশারা কেউ কিছু বলে না।
গভীর নিয়তিবাদ এদের মনের মধ্যে কোন অজান্তে কীভাবে প্রোথিত
হয়েছে ঈশ্বরও বোধহয় বলতে পারবেন না। সে যাইহোক আজ কী হল কে
জানে, প্রায় একঘন্টা হতে চলল বিষ্টু
কোন প্যাসেঞ্জার পায়নি। পিছন থেকে ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে,
-আজ আর কিছু হবে না রে!
বিষ্টুর বুকে কীরকম চিনচিন
করছে। 'বাড়ি চললাম' বলে সে ফাঁকা রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। তবে এত তাড়াতাড়ি বাড়ি
গেলে বাড়িতেও খ্যাচখ্যাচানি শুনতে হবে। হঠাৎ বিষ্টুর মনে হল, দুর শালা! সব ছেড়েছুড়ে পালাই। পায়ের ব্যথাটা কোথায় যেন উবে
গেল। অতি মন্থর রিকশাটাও বেশ গতি পেয়েছে। স্টেশন থেকে বাড়ির দিকের গলিটা ছাড়িয়ে
গেল। কোন অদৃশ্য শক্তি যেন রিকশাটাকে বাইপাসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাইপাস
ছাড়িয়ে রিকশা এগিয়ে চলেছে এক অচেনা ফাঁকা মোড়ামের রাস্তা ধরে। একটু পরেই দেখে এক
অপূর্ব বড় দীঘির পাড়ে তার রিকশা এগিয়ে চলেছে। তৃতীয়ার চাঁদের আলোয় জল যেন সোনালি কাচের মতো তকতক করছে। দীঘির পিছনে কী সুন্দর একটা বাগান। মনে হচ্ছে পেয়ারাবাগান। পরিষ্কার স্বচ্ছ জল দেখেই
তার খুব তেষ্টা লাগল। রিকশা থেকে নেমে মন ভরে খানিকটা দীঘির জল খেল। আহ্! কী আরাম। তৃষ্ণা মেটার পরেই খিদেয় পেট চিনচিন
করছে। এক পা-এক পা করে সে এগোয় পেয়ারাবাগানের দিকে।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment