প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

ক্ষণিকের অতিথি | আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কগ্রস্ত

বাতায়ন / ক্ষণিকের অতিথি /সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/৪৪তম সংখ্যা/২৩শে   ফাল্গুন ,   ১৪৩২ ক্ষণিকের অতিথি  |  সম্পাদকীয়     আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কগ্রস্ত ...

Sunday, March 8, 2026

বেনুগোপাল | অঞ্জনা মজুমদার

বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪তম সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি | ছোটগল্প
অঞ্জনা মজুমদার
 
বেনুগোপাল

"বেনু প্রতিদিন স্কুলে কিছু না কিছু ঘটনা ঘটাবেই। তবে আজকের ঘটনা সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। ব্যাপারটা কীসেদিন টিফিনে ডিম ভাত। সবাই মজা করে খেয়ে হাত ধুতে গেছে কলতলায়।"

 
হরনাথ ভাদুড়ি একটা প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। এমনিতেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র সংখ্যা বেশি নেই তার ওপর আজ পাশের পাড়ায় মনসাপুজো। তাই চারটে ক্লাসে মোটে জনা কুড়ি ছাত্রছাত্রী এসেছে। এমন সময়ে একটা বেশ মলিন পোশাক, শতচ্ছিন্ন জামা কাপড় পরা একটি ছেলের হাত ধরে দারোয়ানের বউ এসে দাঁড়াল।
-মাস্টারদাদা, এই ছেলেটাকে তোমার ইস্কুলে নেবে?
-কে এই ছেলেটি?
-আমার দিদির ছেলে। গত মাঘে ওর মা চলে গেল। ওর বাবা আবার বিয়ে করেছে। ছেলেটা খেতে পায় না। ইস্কুলে যায় না। আমি আর ওর মেসো এখানে নিয়ে এসেছি। যদি এখানে পড়ে তবে মিড-ডে-মিল খাবে আর তোমার কাছে লেখাপড়া করতে পারবে।
হরনাথ বললেন,
-বেশ তো আয় আমার কাছে। কী নাম তোর?
ছেলেটি মাথা নিচু করে বলল,
-বেনুগোপাল, মা ডাকত বেনু।
-ঠিক আছে বেনুগোপাল আজ থেকে তুমি লেখাপড়া করবে।
বেনুগোপাল সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। ছাত্রদের মাঝে ঝুপ করে বসে পড়ল।
 
দুদিনেই বোঝা গেল বেনুগোপাল মোটেই সুবোধ গোপাল নয়। লেখাপড়ায় মোটেই মন নেই। এর চুল টানছে, ওকে চিমটি কাটছে। টিফিনের খাবার সময় নিজের ভাগ তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে এর-ওর থালা থেকে খাবলা করে নিয়ে খেয়ে নেয়। তবে যেদিন ডিম থাকে বেনু কিন্তু কারোর ডিম কেড়ে খায় না। আর ছেলেরা খেলতে গিয়ে হাত-পা ছড়ে গেলে তাকে যত্ন করে আদর করে চোখ মুছে দেয়। গাছের কুল, পেয়ারা, কলা, জলপাই পেড়ে এনে দেয়। তাই বোধহয় ছেলেরা ওকে বেশ পছন্দই করে। স্কুলের মাস্টারমশাই দিদিমণিও মাতৃহারা ছেলেটাকে বেশি বকাবকি করতে পারেন না।
 
বেনু প্রতিদিন স্কুলে কিছু না কিছু ঘটনা ঘটাবেই। তবে আজকের ঘটনা সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। ব্যাপারটা কী? সেদিন টিফিনে ডিম ভাত। সবাই মজা করে খেয়ে হাত ধুতে গেছে কলতলায়। টিউবওয়েলটা জামতলায়।
একটা কাক কা কা করে মুখ থেকে এক টুকরো হাড় ফেলেছে আর লেগেছে সেই মস্ত মৌচাকে যেটা জামগাছে মাসখানেক বাড়ছে। আর যায় কোথায়? ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি তেড়ে এল ছেলেদের দিকে। আর ছেলেরা কামড় খেয়ে লাফালাফি চেঁচামেচি শুরু করে দিল। বেনু পেছনে ছিল। ক্লাস ঘরে ঢুকে মস্ত শতরঞ্চিটা নিয়ে দৌড়ে এল। ওর শুয়ে পড়, শুয়ে পড় আওয়াজে ছেলেরা মাটিতে শুয়ে পড়ল আর শতরঞ্চি দিয়ে ওদের ঢেকে বেনু নিজেও শুয়ে পড়ল। আর মৌমাছিরা বেনুকেই ছেঁকে ধরল।
মাস্টারমশাই চেঁচামেচি শুনে ঘর থেকে বাইরে এসে হতবাক। কী করবেন বুঝতে পারছেন না। রাঁধুনি ঠাকুর রান্নাঘর থেকে জ্বলন্ত নারকেল ছোবড়ার ধোঁয়া নিয়ে ছুটে এলেন। সম্বিত ফিরল হরনাথবাবু আর অন্য মাস্টারমশাইদের। সবাই ধোঁয়ার ব্যবস্থা করলেন। মৌমাছিরা উড়ে গেল।
ছেলেদের আর বেনুকে উদ্ধার করা হল। কামড় খেয়েও ছেলেরা হাত-পা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু বেনু আর উঠল না। দিদিমনি বললেন,
-কী হবে স্যার? বেনু যে নড়াচড়া করছে না।
-ওকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।
বেনুর মাসি-মেসো চলে এসেছে। সবাই মিলে ভ্যান রিকশা করে হসপিটালে নিয়ে গেলে ডাক্তারবাবু আঁতকে উঠলেন। ছেলেরা কেঁদে কেঁদে বেনুকে ডাকছে। বেনুর মাসি-মেসো ডাকছে। মাস্টারমশাই দিদিমনিরা ডাকছেন। ডাক্তারবাবু স্যালাইন দিয়ে, ইনজেকশন দিয়ে কত চেষ্টা করলেন। সবাই মিলে বেনুকে ডাকছে কিন্তু বেনুগোপাল আজ আর চোখ মেলে চাইলে না।
ডাক্তারবাবু মাথা নাড়লেন,
-স্যার আর কিছু করার নেই। আই অ্যাম সরি বয়েজ। বেনুগোপাল আর নেই।
ছেলেরা বড্ড কাঁদছে। দিদিমনির চোখে অঝোরে জল। সেটা মোছার চেষ্টাও করলেন না। অস্ফুটে বলে উঠলেন,
-স্যার বেনু আমাদের ক্ষণিকের অতিথি। এই কদিনে আমাদের বড্ডই আপনার হয়ে গিয়েছিল তাই না? ও যে নিজের জীবন দিয়ে বাকি ছেলেদের বাঁচিয়ে গেল।
ছেলেদের অভিভাবকরা খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। আজ বেনুগোপালকে ঘিরে থাকা সব মানুষের চোখেই জল।
 
~~000~~

No comments:

Post a Comment

ফিরতে হবে ঘরে~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)