প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

ক্ষণিকের অতিথি | আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কগ্রস্ত

বাতায়ন / ক্ষণিকের অতিথি /সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/৪৪তম সংখ্যা/২৩শে   ফাল্গুন ,   ১৪৩২ ক্ষণিকের অতিথি  |  সম্পাদকীয়     আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কগ্রস্ত ...

Sunday, March 8, 2026

ভোরের আলো | সুদীপ্তা চট্টোপাধ্যায়

বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪তম সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি | ছোটগল্প
সুদীপ্তা চট্টোপাধ্যায়
 
ভোরের আলো

"আচ্ছা আপনার জানতে ইচ্ছে করে নাআপনার মধ্যে ছেলে ছিল না মেয়ে। অপারেশনের সময় আপনার অপরিণত ভ্রূণকে দেখলাম।"

 
কিছুতেই ঘুম আসছিল না দীনেশের। ব‍্যালকনিতে পাচারি করতে করতে ভাবছিল, কাল একটা বিশেষ দিন। বেশ চিন্তা হচ্ছে তার। একটা সিগারেট ধরায়। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে দীনেশ পৌলমীর ঘরে গেল। মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত অনেক হতে চলল। পৌলমী এখনো জেগে। তার চোখে ঘুম নেই। সিগারেটটা পা দিয়ে পিষে ফেলে ঘরে ঢোকে দীনেশ। পৌলমীর কাঁধে হাত রাখে। দীনেশের সারা শরীর দিয়ে সিগারেটের গন্ধ ছাড়ছে। গা-টা গুলিয়ে ওঠে পৌলমীর। বাথরুমে ঢুকে পড়ে। বমি হয়। অনেকটা সময় পর পৌলমী বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে।
-কী গো শরীরটা কি খুব খারাপ লাগছে?
-দীনেশ এগিয়ে যায় পৌলমীর দিকে। খুব অস্বাভাবিক লাগছে পৌলমীকে। দীনেশ পৌলমীর পায়ের কাছে বসে।
-তোমার কী ভয় করছে এখন। টেস্টটা তো তুমিই করাতে চেয়েছিলে। তোমার সাথে আলোচনা করেই তো গোপনে এতগুলো টাকা নার্স, ওয়ার্ড বয়কে দিয়ে রাজি করালাম। ওরা গোপনে টেস্টটা করতে রাজি হয়ে গেছে। ওদের কোন এক জানাশোনা ডাক্তার আছে। গোপনে এই সব অপারেশন করে থাকে। তোমাকে তো সব জানিয়েছিলাম আমি।
পৌলমীর মাথায় হাত রাখে দীনেশ। পৌলমী কিছু বলতে পারে না। টেস্টটা পৌলমীই করাতে চেয়েছিল। তাই সে সব দোষ দীনেশের ঘাড়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে পারছে না। মনের ইচ্ছে ছিল, পুত্র সন্তানের মা হবে।
-কী হল তোমার? ঘুমিয়ে পড়ো। কাল যা হবার তাই হবে। চিন্তা করো না।
দীনেশ পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। পর পর দুটো মেয়ে। দীনেশ বলেছিল,
-আর রিস্ক নিয়ে লাভ নেই। ছেলে হোক বা মেয়ে এখনকার দিনে এই সব নিয়ে কেউ আর ভাবে না।
পৌলমী শোনেনি।
-মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাবার পর বুড়োবয়সে কে দেখবে আমাদের।
-যত্তসব সেকেলে ভাবনাচিন্তা তোমার।
দীনেশ প্রথমে রাজি হতে চায়নি। পৌলমীর কোনো ভাই নেই। ছেলে ছেলে করে পৌলমীর মায়ের পাঁচ মেয়ে। পৌলমী সবার ছোট। পৌলমীর মা প্রায় বলত, ‘এখনকার মতো তখন যদি এত টেস্ট, ওষুধের ব‍্যবস্থা থাকত…’
কী হত তবে! পৌলমীর জন্ম হত না। পৌলমী জন্মানোর আগে কোনো এক জ‍্যোতিষী পৌলমীর মার হাত দেখে বলেছিল, ‘এবার আপনার একটি পুত্র সন্তান হবে।’ পৌলমী যখন মায়ের গর্ভে ছিল, পৌলমীর মা গ্রামের মনসা মন্দিরের এক পুরোহিতের কাছে এক দৈব-ওষুধ খেয়েছিল। সেই দৈব-ওষুধ খেলে গর্ভে থাকা ভ্রূণের লিঙ্গ পরিবর্তন হয়ে যায়। অর্থাৎ মেয়ের ভ্রূণ ছেলেতে পরিণত হয়ে যায়। পৌলমী জন্মাল। মা পৌলমীর মুখ দেখেনি। বুকের দুধ দেয়নি। পৌলমী জন্মানোর খবর শুনেই তার বাবা গলায় কলসি বেঁধে পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিল। গ্রামের লোক তার বাবাকে পুকুর থেকে তুলে এনেছিল।
তার বড়দি বিয়ে করেনি। বলা চলে বিয়ে হয়নি। বড্ড কালো সে। তাছাড়া সেই সময় পপ্রথা বড্ড বেশি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। পৌলমীর বাবার পাঁচটা মেয়ে। সুবলবাবু সংসার চালাতেই হিমসিম খেতেন। পৌলমীর বড়দি কাঁথাস্টিচ সেলাই করে সংসার টানত। বড়দিকে বাকি সব বোনরা বড়দি-মা বলে ডাকে। বড়দি-মাই পৌলমীকে বার্লি, সাবু খাইয়ে কোলেপিঠে মানুষ করেছে। এখন সে ক‍্যানসার হসপিটালে ভর্তি। মেজদির বিয়ে হয়েছে খুব ভাল ঘরে। সুবলবাবু পাত্র হাতছাড়া হবার ভয়ে সব জমানো টাকা পাত্র পক্ষের হাতে তুলে দিয়েছিল। সংসারে আরও অভাব নেমে এসেছিল। পৌলমী উচ্চমাধ‍্যমিক পাশ করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ নিয়েছিল। সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই কোনো ভাবে দীনেশের সাথে পরিচয়। তারপর প্রেম। বিয়ে। পৌলমীর ফুলদি স্কুল টিচার। জেলার মধ্যে প্রথম হয়েছিল। বাবার সব আশা ছিল তার উপর। খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। বিয়েও হয়েছে। বাবা, মা এখন তার কাছেই থাকে।
সব থেকে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল সেজদির সাথে। একটা খারাপ ছেলেকে বিশ্বাস করে রাতের অন্ধকারে বাড়ি ছেড়ে ছিল। কিছুদিন পর বাঁশ বনে পৌলমীর সেজদির রক্তাক্ত মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। সুবলবাবু পুলিশ কে করেনি। পুলিশকে ঘুস দেওয়ার মতো টাকা নেই। সুবলবাবু বলেছিল, ‘ওইরকম মেয়ের মুখ দেখতে চাই না।’ মা শুধু হাউ হাউ করে কাঁদছিল।
ভোর হতে চলল। দীনেশ ঘুমে আচ্ছন্ন। মেজদির সাথে কথা হয়েছে পৌলমীর। মেয়ে দুটোকে তার কাছে রেখে যাবে। দীনেশকে ডাক দেয়।
-এই ওঠো।
দীনেশ আড়মোড়া ভাঙে। পৌলমী বাথরুমে ঢোকে। তলপেটে ব‍্যথা অনুভব করে। সারারাত ঘুম হয়নি। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে এখন। চোখে জলের ছিটে দেয়। তলপেটের ব‍্যথাটা আরও তীব্র হয়। কমোডে বসে পড়ে। চাপ চাপ রক্ত পড়তে থাকে। ব‍্যথা বেড়ে যায়। কমোড ফ্লাশ অন করে বেরিয়ে আসে। দীনেশ উঠে পড়েছে। মেয়ে দুটো  এখনো ঘুমিয়ে। সায়াটা জড়িয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসে।
-একি! কী হল তোমার।
-শরীর খারাপ লাগছে।
পৌলমী বিছানায় বসে পড়ে। ব্লিডিং হতে থাকে। সায়াটা ভিজে যায়। দীনেশ এগিয়ে যায়। একটা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে দেয়। রক্ত দেখে ভয় পেয়ে যায় সে।
-তোমাকে বলেছিলাম না, সিঁড়ি দিয়ে বেশি ওঠানামা করো না। কোনো কথা যদি তুমি আমার শোন!
ভয় পেয়ে দীনেশ চিৎকার করে ওঠে। দীনেশের চিৎকারে মেয়েদের ঘুম ভেঙে যায়। মাকে এই অবস্থায় দেখে ভয় পেয়ে যায় দুই বোন। দীনেশ গলা নামিয়ে কথা বলে।
-সোনা, রুপা তোমরা দুজন পাশের রুমে আর একটু ঘুমিয়ে নাও। আজ স্কুল যেতে হবে না। তোমাদের মেজ মাসি এখুনি আসবে। তোমাদের নিয়ে যাবে।
দশ বছরের সোনা, ' বছরের রুপা বাধ্য মেয়ের মতো পাশের রুমে চলে যায়।
পৌলমী হসপিটালে ভর্তি হয়। লিঙ্গ টেস্ট করতে হয়নি। অপারেশন হয়ে গেছে। স্যালাইন চলছে। অনেকটা ব্লাড লস হয়েছে। রক্ত লেগেছে এক বোতল। দীনেশ এসে দেখে গেছে। তার মুখে কোনো ভাষা ছিল না। সূর্য পশ্চিম দিকে অস্ত গেছে। আর কিছুক্ষণ পরেই রাত নেমে আসবে। পৌলমীর জীবনে অনেক দিন আগেই রাত নেমে এসেছিল, যখন তার জন্মের পর মা-বাবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। বুকের দুধ না খাইয়ে মেয়েকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল সন্ধ‍্যাদেবী। পৌলমীও ঠিক মায়ের মতোই লিঙ্গ টেস্ট করে কন‍্যা সন্তানের ভ্রূণ হত্যা করতে চেয়েছিল।
রাত বাড়তে থাকে। পৌলমীর চোখে ঘুম নেই। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। নার্স এসে দেখে যায়।
-কী হল, আপনি এখনো ঘুমোননি?
ঘাড় নাড়ে পৌলমী।
-ঘুম আসছে না।
-ঘুমিয়ে পড়ুন। আপনার অনেক ব্লাড লস হয়েছে।
চলে যাবার আগে নার্স পৌলমীর আরও কাছে আসে।
-আচ্ছা আপনার জানতে ইচ্ছে করে না, আপনার মধ্যে ছেলে ছিল না মেয়ে। অপারেশনের সময় আপনার অপরিণত ভ্রূণকে দেখলাম।
নার্সের কথায় উত্তেজিত হয়ে ওঠে পৌলমী। নিজের হাত দিয়ে কান দুটো চাপা দেয়।
-না সিস্টার। আমি জানতে চাই না। আমি জানতে চাই না। কোনদিনও জানতে চাইব না ক্ষনিকের অতিথির কথা।
অন্ধকার পেরিয়ে ভোর হতে চলল। এই ভোর পৌলমীর জীবনে আর একটা নতুন ভোর। রাতের অন্ধকারের সাথে সাথে মনের অন্ধকারকে দুরে সরিয়ে পৌলমীর জীবনে ফুটে উঠল নতুন ভোরের আলো।
 
~~000~~

No comments:

Post a Comment

ফিরতে হবে ঘরে~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)