বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪৪তম
সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি
| ছোটগল্প
হিমাদ্রী
শেখর দাস
অচেনা
"আজ সত্যিই কেউ এসেছিল, নাকি সে নিজেই নিজের কাছে এসেছিল। কেবল এটুকু জানল—কিছু দরজা একবার খুলে গেলে, আর আগের মতো বন্ধ হয় না।"
সন্ধ্যা নামার আগেই আজ
অন্ধকারটা নেমে এসেছিল। আকাশে মেঘ নেই,
তবু আলো
নেই। অনিরুদ্ধ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবছিল—আজকের দিনটা কেমন যেন। তখনই দরজায়
কড়া নাড়ার শব্দ। খুব জোরে নয়। খুব হালকা নয়। ঠিক এমন, যেন কেউ নিশ্চিত নয়—ভেতরে কেউ আছে কি না। অনিরুদ্ধ চমকে
উঠল। এই বাড়িতে এখন আর কেউ আসে না। পরিচিতরা সবাই জানে—সে কারও সঙ্গে দেখা করতে
চায় না। তবু আজ…
সে দরজা খুলল। দরজার ওপাশে
দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখে প্রথমে মনে হলো,
আলোটা
ঠিক পড়ছে না। মুখটা স্পষ্ট নয়, অথচ চেহারাটা কেমন
চেনা।
-আমি কি… ভেতরে আসতে পারি?
লোকটি জিজ্ঞেস করল। তার কণ্ঠে
অদ্ভুত একটা প্রতিধ্বনি। যেন সে ঘরের ভেতর থেকেই কথা বলছে। অনিরুদ্ধ একটু সরে
দাঁড়াল। লোকটি ঘরে ঢুকেই দাঁড়াল। চারদিকে তাকাল খুব মন দিয়ে। দেয়ালে টাঙানো
ছবিগুলো, পুরনো আলমারি, কোণায় পড়ে থাকা ভাঙা হারমোনিয়াম—সবকিছু এমন দৃষ্টিতে
দেখল, যেন বহুদিন পর ফিরে এসেছে।
-আপনি এখানে একাই থাকেন?
লোকটি জিজ্ঞেস করল।
-হ্যাঁ।
অনিরুদ্ধ সম্মতি জানাল।
-আগেও?
-আগে মানে?
-আগের জীবনেও।
অনিরুদ্ধর হাসি পেল, কিন্তু হাসল না।
-আপনি কে?
সে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল।
লোকটি একটু হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই।
-ধরুন, আমি আপনার অতিথি। খুব
অল্প সময়ের জন্য।
এই কথাটা ঘরের ভেতর কেমন যেন
প্রতিধ্বনিত হলো। অল্প সময়—এই শব্দদুটো অনিরুদ্ধের মাথায় ধাক্কা দিল।
-আপনি কি বসবেন?
-বসি… তবে বেশি সময় নয়।
লোকটি বসল। বসার সময়
চেয়ারটা ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করল—যেন অনেকদিন পরে কেউ ওখানে বসেছে। ঘরে আলো জ্বালানো
হয়নি। বাইরে সন্ধ্যা নামলেও ভেতরের অন্ধকার যেন ঘন হতে থাকল।
-আপনি কি আমাকে
চিনতে পারছেন?
লোকটি জিজ্ঞেস করল। অনিরুদ্ধ
ভাল করে তাকাল। চোখদুটো—এই চোখদুটো সে কোথাও যেন দেখেছে। আয়নায়? না স্বপ্নে?
-না।
সে বলল।
-স্বাভাবিক।
লোকটি শান্ত গলায় বলল।
-আমি সাধারণত মনে থাকি না।
এই কথায় অনিরুদ্ধের শরীরে
ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। লোকটি পকেট থেকে একটা ছোট চাবির গোছা বের করল, পুরনো, মরচে ধরা।
-এগুলো আপনার বাড়ির।
সে বলল। অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে
দেখল—সত্যিই একটা চাবি পুরনো তালার- তারই আলমারির, একটা, যেটা সে অনেক বছর খোলেনি।
-এগুলো আপনি পেলেন কোথায়?
-যেখানে আপনি ফেলে রেখেছিলেন।
লোকটি এবার ঘরের ভেতর খুব
ধীরে হাঁটতে শুরু করল, মনে হল যেন প্রতিটা
জায়গা সে পর্যবেক্ষণ করছে।
-এই কোণাটায়।
সে বলল,
-আপনি একবার ভেবেছিলেন সব ছেড়ে চলে যাবেন।
অনিরুদ্ধ চমকে তাকাল।
-এই জানালার সামনে দাঁড়িয়ে।
-আপনি কাউকে শেষবারের মতো দেখতে চেয়েছিলেন।
অনিরুদ্ধের বুক ধড়ফড় করতে
লাগল।
-এই
হারমোনিয়ামটা।
লোকটি আঙুল বুলিয়ে বলল,
-আপনি আর কখনো বাজাননি,
কারণ
একদিন ভুল সুর বেরিয়েছিল।
অনিরুদ্ধ ফিসফিস করে বলল—
-থামুন… এসব আপনি জানলেন কী করে?
লোকটি ঘুরে তাকাল।
-কারণ যখন আপনি এই সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিলেন, আমি সেখানেই ছিলাম।
হঠাৎ বাইরে হাওয়া উঠল।
জানালার কাচ কেঁপে উঠল। অনিরুদ্ধ চিৎকার করে বলল—
-আপনি আসলে কী
চান?
লোকটি চেয়ারে বসল আবার।
-আমি কিছু চাই
না।
সে বলল,
-আমি শুধু দেখতে এসেছি—আপনি এখনো বেঁচে আছেন কি না।
এই কথাটা যেন ঘরে অন্যরকম
পরিবেশ তৈরি করল দিল।
-এটা কী ধরনের
কথা!
-আপনি কি নিশ্চিত—আপনি বেঁচে আছেন?
লোকটি প্রশ্ন করল।
খানিককাল নীরবতা। অনিরুদ্ধ
বুঝতে পারল—সে কখনো এই প্রশ্নটা নিজেকে করেনি। লোকটি ব্যাগ থেকে একটা খাতা বের
করল। খুব পরিচিত।
-এটা…
-হ্যাঁ,
লোকটি বলল,
-আপনার লেখা।
অনিরুদ্ধ পাতা উল্টাতে লাগল।
কিছু লেখা সে মনে করতে পারছে, কিছু নয়। শেষ পাতায়
লেখাটা তার হাতের লেখা নয়।
-এগুলো কে
লিখেছে?
-আমি,
লোকটি বলল।
-আপনি তো
বললেন—আপনি আলাদা মানুষ!
-আমি বলিনি,
লোকটি শান্তভাবে বলল,
-আপনি নিজে ভেবে নিয়েছেন।
ঘড়িটা হঠাৎ শব্দ করে চলতে
শুরু করল, অনেকদিন পর। টিক… টিক… টিক…
-আমার সময় শেষ,
লোকটি উঠে দাঁড়াল।
-আপনি চলে
যাচ্ছেন?
অনিরুদ্ধ নিজের অজান্তেই বলল।
লোকটি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল—
-আমি তো কখনো
থাকিই না,
-আপনি আবার আসবেন?
-না,
লোকটি উত্তর দিল,
-আমি একবারই আসি।
-তাহলে আমি আপনাকে পাব কোথায়? খুঁজব কীভাবে?
অনিরুদ্ধ প্রশ্ন করল। লোকটি
দরজা খুলল।
-যেদিন আপনি আর নিজেকে এড়িয়ে যাবেন না—সেদিন।
সে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হতেই ঘরটা কেমন
ফাঁকা হয়ে গেল। যেন কিছু একটা সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। অনিরুদ্ধ চেয়ারে বসে পড়ল। খাতাটা
খুলে দেখল, নতুন লেখা—
“অতিথি চলে গেছে। এবার তুমি কী করবে—সেটাই আসল রহস্য।”
আবার ঘড়িটা থেমে গেল। অনিরুদ্ধ
বুঝতে পারছে না—আজ সত্যিই কেউ এসেছিল,
নাকি সে
নিজেই নিজের কাছে এসেছিল। কেবল এটুকু জানল—কিছু দরজা একবার খুলে গেলে, আর আগের মতো বন্ধ হয় না। আর কিছু অতিথি—ক্ষণিকের হলেও—
অচেনা হলেও সারাজীবনের জন্য থেকে যায়।
~~000~~

No comments:
Post a Comment