প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

চৈতি হাওয়া—নববর্ষ

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ , ১৪৩৩ চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | সম্পাদকীয়   চৈতি হাওয়া—নববর্ষ "দুগ্ধপোষ্য...

Wednesday, April 8, 2026

চৈতালি হাওয়া | সঙ্ঘমিত্রা দাস

বাতায়ন/চৈতি হাওয়া—নববর্ষ/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | ছোটগল্প
সঙ্ঘমিত্রা দাস
 
চৈতালি হাওয়া

"মনে পড়ে তোমার সাথে প্রথম দেখার দিনটাএমনই এক চৈত্র বিকেলে ডালহৌসি মোড়ে চায়ের দোকানে আটকে ছিলাম দুজনে। তোমার সেই স্পেশাল ছাতা? কী ক্যাবলা ছিলে গো।"

 
কটু আগেই শিলা বৃষ্টি হয়েছে। এখন ঝিরঝির করে পড়ছে। সুকল্যান আর শুভ্রা তেরো তলার খোলা বারান্দায় বসে উপভোগ করছে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ, হালকা শীতল চৈতালি হাওয়ায় কেমন যেন প্রেমের ছোঁয়া যা এই বার্ধক্যেও মনকে আকুল করে। বারান্দার কাচের টেবিলে চা আর গরম গরম পেঁয়াজি দিয়ে গেছে মনিকা, ওদের রাতে রান্না, বান্না আর দেখাশোনার কাজ করে সে। সুকল্যানেরই বায়না বৃষ্টিতে একটু তেলেভাজা খাবে। যদিও শুভ্রার কড়া হুকুমে এক পিসই জুটেছে চায়ের সাথে। চায়ের কাপটা মুখের কাছে নিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে শুভ্রা। ওর হাসি দেখে সুকল্যানের কৌতুহলী মন চেয়ে থাকে শুভ্রার দিকেশুভ্রা এবার ওর দিকে তাকিয়ে জোরে হেসে ফেলে,
-মনে পড়ে তোমার সাথে প্রথম দেখার দিনটা? এমনই এক চৈত্র বিকেলে ডালহৌসি মোড়ে চায়ের দোকানে আটকে ছিলাম দুজনে। তোমার সেই স্পেশাল ছাতা? কী ক্যাবলা ছিলে গো।
সুকল্যান মৃদু প্রতিবাদ করে বলল,
-মোটেই না, ওই ছাতাটার জন্যই একটু টেনশনে ছিলাম। তুমি বারবার তাকাচ্ছিলে ওটার দিকে, বুঝেছিলাম ভাগ বসাতে চাও।
দুজনেই হোহো করে হাসতে থাকল। কাজের মেয়েটা ছুটে এলো হাসি শুনে।
-দাদু-দিদা তোমাদের বৃষ্টি দেখে এত আনন্দ হয়েছে, হেসে গড়িয়ে পড়ছ।
শুভ্রা বসাল ওকে।
-আজ নাহয় শুধু খিচুড়ি রান্না করে দিস। এখন শোন তোকে একটি মজার গল্প বলি
শুভ্রা শুরু করল পঁয়ত্রিশ বছর আগের সেই দিনের কথা। সুকল্যান একটু আপত্তি করলেও, স্মৃতিতে ডুব দিল সেও
 
ডালহৌসি অফিস পাড়া, জিপিওতে চাকরি দুজনেরই তবে তখনো আলাপ হয়নি। শুভ্রা জয়েন করেছে মাস তিনেক। সুকল্যানের প্রায় বছর চারেকের চাকরি। মুখ চেনা হলেও সেধে আলাপ জমানো সুকল্যানের মতো মুখচোরা মানুষের পক্ষে একেবারে অসম্ভব তাতে আবার পটপট ইংলিশ বলা সুন্দরী কলিগ। এড়িয়েই চলত ওকে। চোখাচোখি যে হয়নি কয়েকবার তা নয়। সেদিন অফিস থেকে বের হতেই বৃষ্টি। দুজনেই একটা চায়ের দোকানের শেডে দাঁড়িয়ে আছে। মেট্রো পর্যন্ত বেশ খানিকটা পথ। ছাতা আনেনি শুভ্রা। অগত্যা দাঁড়িয়ে থাকা। আড়চোখে একবার সুকল্যানের দিকে দেখে নিল। ব্যাগের মধ্যে থেকে ছাতার মাথাটা উঁকি দিচ্ছে। তবু দাঁড়িয়ে আছে। বোকা নাকি লোকটা? এত আস্তে বৃষ্টি পড়ছে তাও দাঁড়িয়ে। অনায়াসেই চলে যেতে পারে। কারণ বোঝা মুশকিল। খেয়াল নেই নাকি ছাতা এনেছে? নানারকম ভাবতে থাকে শুভ্রা। ওই ছাতায় দুজনই যদি বেরিয়ে যাওয়া যেত লেডিস স্পেশালটা মিস হতো না। পরের ট্রেনগুলোয় তো আর পা রাখার জায়গা থাকে না। সেধে একবার বলবে নাকি? যদি কিছু মনে করে? কিন্তু ট্রেন মিস করলে তো আরও মুশকিলে পড়বে। সেধে বলবে? অসুবিধা কোথায়? একই অফিসে তো যাতায়াত। ভাবতে ভাবতে বলেই ফেলল। সুকল্যানও বেশ বুঝতে পারছিল সে ওর দিকেই বারবার তাকাচ্ছে। ছাতার দিকে নজর কিন্তু ওটা যে লোকের সামনে বিশেষ করে কোন মহিলার সামনে তায় আবার কলিগ, বের করলে মানসম্মান সব যাবে। যা ভয় পাচ্ছিল তাই।
-এই যে শুনছেন, আপনাকে বলছি। ছাতা আছে তো চলুন না মেট্রো অব্দি দুজনে বেশ চলে যেতে পারব। বৃষ্টি তো খুব আস্তেই পড়ছে। আমার ট্রেনটা মিস হলে খুব অসুবিধায় পড়ব
অগত্যা ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে এগিয়ে এলো সুকল্যান। শুভ্রা তাড়াতাড়ি ছাতাটি নিয়ে খুলতে খুলতেই রাস্তায় নেমে এলো। মাথায় ছাতা ধরেছে সুকল্যান। পুরোনো লগবগে ছাতা, হাওয়ায় দুলছে। কয়েকটা শিক থেকে কাপড় খুলে এসেছে। শুভ্রা এতক্ষণে বুঝল ছাতা থাকতেও লোকটার দাঁড়িয়ে থাকার কারণ। এমন একটা ছাতা নিয়ে বেরোনোর কী মানে আছে। চাকরিটাতো নেহাৎ খারাপ নয়। বেশ বড়সড় একটি ফুটোও আছে ছাতায়। সেটা দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে থাকল কাঁধে। কোনমতে নিজেকে বাঁচিয়ে এগোতে থাকল দুজনে। হঠাৎ টং করে সুকল্যানের মাথায় কী একটা পড়ল। ছোট একটি শিল ছাতার ফুটো ভেদ করে ওর মাথায়। আর হাসি চাপতে পারল না শুভ্রা। ওর হাসি দেখে সুকল্যানও নিরুপায় হয়ে মুচকি একটা হাসি দিল। ওরা তখন প্রায় মেট্রোর কাছে পৌঁছে গেছে। বেশ হাওয়া দিচ্ছে। সুকল্যান প্রাণপণে শুভ্রার মাথায় ছাতাটা ধরে আছে। বারবার হেলে পড়ছে, শিকগুলো দুর্বল তাই বেশ কাঁপছে ছাতাটা। স্টেশনের মুখটার কাছে হঠাৎ এক দমকা হাওয়ায় ছাতা গেল উলটে। শুভ্রা তো এক লাফে স্টেশনের সুড়ঙ্গে ছুটে গিয়ে দাঁড়াল। সুকল্যান ঘটনার আকস্মিকতায় কী করবে দিশা না পেয়ে উলটানো ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকল। ঘোর কাটল শুভ্রার চিৎকারে,
-দাঁড়িয়ে আছেন কেন? চলে আসুন, ভিজে যাচ্ছেন তো পুরো।
সেদিন মেট্রোতেই সুকল্যানও দমদম অবধি ফিরেছিল শুভ্রার সঙ্গে। সুকল্যানের সরল ভাবটা ভাল লেগেছিল শুভ্রার। যদিও অফিসে সবাই জেনে যাওয়ায় বহুদিন এই নিয়ে মজা করেছিল। সুকল্যানই বলেছিল বন্ধুমহলে ঘটনাটা। তারপর সেই ভাললাগা থেকেই এই চল্লিশ বছরের বিবাহিত জীবন।
মনিকাও শুনে হোহো করে হাসতে থাকল। বলল,
-দাদুকে তো খুব রাগী ভাবতাম, কী গম্ভীর! কিছু ভুল করলেই বকবে। কিন্তু দাদু ভারী ভাল মানুষ তো দিদা। তোমরা আরোও অনেকদিন এভাবেই ভাল থাকো।
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)