বাতায়ন/চৈতি
হাওয়া—নববর্ষ/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | ছোটগল্প
অর্পিতা
চক্রবর্তী
নব
দিগন্ত
"ছেলেটির মাথায় ঝাঁকড়া চুল। গান শুনতে শুনতে হাসি হাসি মুখে সে কী যেন আবার বিড়বিড় করে। তবে তিনি একা নন, তার সাথে থাকেন একজন সুন্দরী যুবতী। পান্না আর নিধির বিকেলটা আজকাল দিব্য কাটছে।"
-তা বলি কানের
মাথা খেয়ে যে গানটি শুনে বড় বড় করে ঘাড় নাড়ছেন তার মানে বুঝলেন কিছু? আরে মশাই আমি বলতে চাইছি গানের ভাষাটি ঠিক কী? বাংলা হিন্দি না ইংরেজি?
-তিনটির
সংমিশ্রণ।
-মানেটা কী? কী বলতে চাইছেন একটু খোলসা করে বলুন তো মশাই।
-পান্নাদা দয়া
করে আপনার কানটিকে একবার কষ্ট করে আমার মুখের কাছে আনুন, আমি সব বুঝিয়ে বলছি।
-আসলে আমি এতক্ষণ কিছু না বুঝে শুধু শুধুই মাথা নাড়ছি আর
সেটা কেন জানেন? যাতে ওরা কিছু বুঝতে
না পারে। আর আমি বসে বসে ওদের রোমান্টিক ছবিটা দেখতে পারি।
পান্নালাল বিশ্বাস আর নিধিরাম
চক্রবর্তীর বন্ধুত্ব সেই কর্মজীবন থেকে। দুজনেই ভারতীয় রেলের কর্মচারী ছিলেন।
বর্তমানে দুজনেই অবসর গ্রহণ করেছেন। বাড়ি করেছেন কল্যাণীতে। ওনাদের বাড়ি থেকে
সামান্য দূরেই এই পার্কটি অবস্থিত। ওনারা প্রতিদিন বিকেলে নিয়ম করে চলে আসেন এই
পার্কে। এরপর প্রাণের কথা মনের কথা সেরে সন্ধ্যায় আবার ঘরে
ফিরে যান ঠিক ওই পরিযায়ী পাখিদের মতো।
তবে বেশ কিছু দিন যাবৎ দেখা যাচ্ছে এই পার্কে এক যুবকের আগমন ঘটেছে। সে এসে ওই পার্কের এক কোণে বসে বেশ জোরে একটা গান চালিয়ে
শোনে। ছেলেটির মাথায় ঝাঁকড়া চুল। গান শুনতে শুনতে হাসি হাসি মুখে সে কী যেন আবার বিড়বিড় করে। তবে তিনি একা নন, তার সাথে থাকেন একজন সুন্দরী যুবতী। পান্না আর নিধির
বিকেলটা আজকাল দিব্য কাটছে। সামনে রোমান্টিক সিনেমা, ব্যাকগ্ৰাউন্ডে না বোঝা গান, ফুরফুরে হাওয়া, সাথে আবার লিকার চা। ব্যাস আর কী চাই? এই বয়সে এত সুখ সত্যি ভাবা যায় না...
-আচ্ছা নিধি
একবার ওদের কাছ গিয়ে ওদের সাথে আলাপ করা যায় না?
-না প্রস্তাবটা
মন্দ না কিন্তু কীভাবে সেটি সম্ভব হতে পারে সেটাই এখন ভাবার
বিষয়।
-কাকু... কালকের চায়ের সাথে বিস্কুটের দাম ধরতে ভুলে
গিয়েছিলাম। আজকের চায়ের সাথে জুড়ে দিলাম।
-বিলক্ষণ।
-তবে এতবড়
একটা ভুল তুই করলি কী করে সুজয়? আচ্ছা সুজয় তুই আমাদের হয়ে একটা কাজ করতে পারবি?
-কী কাজ কাকু?
-ওই যে দূরে
দেখছিস ছেলেটিকে আর মেয়েটিকে ওদেরকে দু কাপ চা দিয়ে আসতে পারবি? আর হ্যাঁ ওরা পয়সা দিতে চাইলে নিবি না। বলবি আমরা দিয়েছি।
সুজয় একগাল হেসে বলল,
-সে আমি এক্ষুনি দিয়ে আসছি কিন্তু ওরা কারা? আপনারা ওনাদেরকে চেনেন বুঝি?
-আরে না না, একেবারেই চিনি না। তবে চিনতে চাই।
-ওই তো সুজয়
বেশ হাসি হাসি মুখে এদিকেই ফিরে আসছে। যাক গে ওষুধে মনে হয় কাজ হয়েছে।
-কাকু... ওনারা
চা পেয়ে খুব খুশি হয়েছে। আর বলেছে এরকম রোজ রোজ হলে মন্দ হয় না।
সুজয় তার কাজ করে চলে গেছে।
এদিকে পান্নাবাবু আর নিধিবাবু দুজনেই নিজের মতো করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু
পুরো বিষয়টি তখন ওনাদের মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
পরের দিনের পটভূমি আবার সেই
আগের মতো। কোন অগ্ৰগতি নেই। ওনারা দুজনেই কোন-না-কোন সুফলের আশায় বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর যেইমাত্র
উঠতে যাবেন ঠিক সেই মুহূর্তে ওনাদের সামনে এসে দাঁড়াল
অঙ্কুশ আর ইলোরা।
-কাকু... আপনাদেরকে
অনেক অনেক ধন্যবাদ। কাল আপনারা আমাদের চায়ের ট্রিট দিয়েছিলেন কিন্তু আজ আমাদের
টার্ণ।
এদিকে কথায় কথায় নবীন
প্রবীণের পরিচয় পর্ব বেশ জমে উঠেছে। কিন্তু ওদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সুতরাং
আজকের মতো এখানেই গল্পের সমাপ্তি।
পান্নবাবু আর নিধিবাবু আজকাল
বেশ পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে, গায়ে সুগন্ধি মেখে
পার্কে যান এবং ফেরার সময় বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ফেরেন। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক কী সেটা
কিছুতেই ধরতে পারছেন না অর্চনাদেবী এবং শ্রীময়ীদেবী (পান্না এবং নিধির স্ত্রী)।
যদিও এই বিষয়ে মহিলা মহলে অনেক শলাপরামর্শ হয়েছে কিন্তু আজ এই দুই হিরোকে ফলো
করতেই হবে।
ও বাবা এতো পুরো জলসা বসেছে।
চারিদিক সাজানো গোছানো সবুজ পার্ক, সামনে দুই প্রবীণ এবং
দুই যুবক-যুবতী। মাঝখানে চার কাপ লিকার চা আর সাথে মাথামুন্ডুহীন গান।
-পেয়েছি আজ দুটোকে হাতেনাতে ধরেছি।
অর্চনাদেবীর কথায় তখন রীতিমতো হতবাক দুই প্রবীণ।
-কাকিমা আপনারা একটু বসুন। প্লিজ রাগ করবেন না। আর যদি কোন ভুল না করি তবে
আপনারা নিশ্চয়ই ওনাদের স্ত্রী। আসলে আমি অঙ্কুশ আর ও ইলোরা। ওই যে দূরে হলুদ বাড়িটা দেখছেন ওখানেই বাস আমাদের। আমরা একটু-আধটু গানবাজনা করি। আসলে আমাদের একটি নিজস্ব মিউজিক ব্যান্ড আছে।
শ্রীময়ীদেবী বললেন,
-বাহ্ সে তো খুব ভাল কথা। তাহলে একটা গান শোনা যাক।
ইলোরা দুই কাকিমার অনুরোধে
গান শুরু করল আর অঙ্কুশ গিটারে সুর দিল। আর অন্যদিকে দুই প্রবীণ গান শুনতে শুনতে
মহানন্দে ডাইনে বাঁয়ে ঘাড় দোলাতে লাগল। মুখে তাদের সেই
সবজান্তা হাসি। শেষমেশ গান শেষ হল।
-আচ্ছা কাকিমাদের গানটা কেমন লাগল বললেন না তো? (প্রশ্নটা ছিল ইলোরার)
অর্চনাদেবী একগাল হেসে বললেন,
-প্লিজ কিছু মনে করো না। আসলে গানের ভাষাটা বাংলা হিন্দি না ইংরেজি
সেটাই বুঝিনি। দ্বিতীয়ত, তোমাদের গলায় সুরের
খেলা আছে কিন্তু তোমরা এমন একটা গান গাইলে যা বোঝা তো দূর-অস্ত পুরোটাই
আমাদের মাথার উপর দিয়ে গেল। তৃতীয়ত,
তোমাদের
সামনে এই যে দুই ভদ্রলোককে দেখছ এনারা তোমাদের গান শুনে না বুঝে শুধু শুধুই মাথা
দোলান। কি তাই তো? আশা করি আমরা ভুল
বলিনি।
ওদিকে দুই প্রবীণ তখন একদম
চুপ। ধরা পড়ে মাথা চুলকানো ছাড়া তখন তাদের আর তেমন কোন কাজ নেই।
শ্রীময়ীদেবী বললেন,
-তবে তোমরা
দুজনেই খুব মিষ্টি স্বভাবের। আসলে তোমরা বয়সে আমাদের সন্তানের মতো। তবে যদি কিছু না মনে করো তবে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি? আচ্ছা তোমরা কি বিবাহিত?
-না কাকিমা, আমরা লিভ-ইন করি।
শ্রীময়ীদেবী বললেন,
-তা এসব কথা
তোমাদের বাড়ির লোক জানে?
-না কাকিমা। আসলে আমাদের বাড়ি বলে কিছু নেই।
-সে আবার কী কথা! তাহলে তোমাদের বাবা-মা কোথায় থাকেন?
-আমরা একটা
অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছি। তাই আজ আর আমদের জানতেও ইচ্ছা করে না কে আমাদের বাবা আর
কে আমাদের মা?
ওদের সব কথা শোনার পর কাকিমারা বললেন,
-একদম ঠিক
করেছ। জীবনে অপ্রয়োজনীয় কথা না জানাই ভাল। আর তাছাড়া আমরা তো আছি। ধরে নাও
আমরাই আজ থেকে তোমাদের অভিভাবক। তবে হ্যাঁ আমরা কিন্তু এবার
তোমাদের চার হাত এক করব। তা তোমরা রাজি তো?
আজ সেই শুভ তিথি। আজ অঙ্কুশ
আর ইলোরার শুভ পরিণয়। নবদম্পতি মন্ডপ থেকে নেমে কাকু আর কাকিমাদের প্রণাম করে আর্শীবাদ নিতে গেলে শ্রীময়ীদেবী
বললেন,
-তোমাদের জন্য
প্রকৃতপক্ষে আমরা কিছুই করিনি,
করেছেন
আমাদের স্বামীরা। তবে সুরের প্রসঙ্গ যদি তোল তবে আজ একটা কথা না বলে পারছি না।
আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে মনে হয়, সুর তাকে বলে জানো
যার মূর্ছনায় চোখে বারিধারা আসে, হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
তোমাদের গান বা আজকের আধুনিক গানকে আমি কখনই খারাপ বলতে পারব না। তবে এটাও ঠিক
পুরোন দিনের গানের মধ্যে যে মধুরতা ছিল তা আজকের গানে প্রায় লুপ্ত। তোমাদের তো
শুনলাম একটি মিউজিক ব্যান্ড আছে। তার মানে তোমরা সুরের পুজারী। আমি আজ থেকে বহু
বছর আগে সুরের জগৎ থেকে বিদায় নিয়েছি তবে সুরের সাধনা ছাড়িনি। তোমাদের এই দুই
কাকুর গানের গলাও কিন্তু বেশ ভাল। আজও আমরা চারজন একসাথে হলে সুরের সাগরে ডুবে
যাই। তবে তোমাদের গানের গলাও খুব সুন্দর। আমরা আজ প্রাণ ভরে তোমাদের আর্শীবাদ করছি
তোমরা সুখী হও। সৃষ্টি কর নতুন নতুন সুর।
অঙ্কুশ আর ইলোরা ওদের নতুন
জীবনে প্রবেশ করার আগে কাকু-কাকিমার হাত ধরে একটা অনুরোধ রাখল,
-কাকু আপনারা তো সেদিন না বুঝেই আমাদের গানকে আপন করে
নিয়েছিলেন আর আজ সব বুঝে আমাদের মিউজিক ব্যান্ডটিকে আপন করে নিন। প্লিজ আমাদের
হাত ধরে আরও একবার ফিরে আসুন সুরের জগতে,
আমাদের
পথপ্রদর্শক হয়ে।
শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস পরিবার
আর চক্রবর্তী পরিবার ওদের এই মধুর প্রস্তাবে আর না বলতে পারল না। আর আজ এই শুভ
দিনে শুভ মুহুর্তে ইলোরা মহানন্দে বলে উঠল,
-হিপ হিপ হুর
রে, আজ থেকে আমাদের নতুন মিউজিক
ব্যান্ডের নাম হবে ‘নব দিগন্ত’। আমরা সৃষ্টি করব নতুন কিছু
তবে পুরাতনকে বাদ দিয়ে নয় বরং সঙ্গে নিয়ে। আর এটাই হবে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব।
~~000~~

No comments:
Post a Comment