বাতায়ন/চৈতি
হাওয়া—নববর্ষ/অন্য চোখে/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ,
১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | অন্য চোখে
পলাশ
চট্টোপাধ্যায়
হে
কৃষ্ণ!
"আমি এগিয়ে যাচ্ছি, সামনে দেখলাম এক জায়গায় নাড়ু দেওয়া হচ্ছে, সবাই হাত পেতে নিচ্ছে, আমিও নিলাম। বিকেলে অফিসের পর সোজা এখানে এসেছি, কিছু খাওয়া হয়নি। খুব খিদেও পেয়েছিল, তাই নাড়ুটা পেয়ে সোজা মুখে পুরে দিলাম।"
আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর
আগেকার ঘটনা। উড়িপির খুবই কাছের শহর মনিপাল,
যেখানে
অফিসের কাজে আমি মাঝে মাঝেই যেতাম। কিন্তু কখনই সময় করে উড়িপির বিখ্যাত
শ্রীকৃষ্ণের মন্দিরে যাওয়া হয়নি। কথিত আছে,
ভাগ্যে
থাকলে তবেই উড়িপির শ্রীকৃষ্ণের দর্শন হয়।
যাই হোক, একবার ভাগ্য বোধহয় সুপ্রসন্ন হল। কাজের জায়গার একজনের
বাড়ি ছিল উড়িপিতে। সে হঠাৎ বলল,
-পলাশ আজ অফিসের পরে তোমাকে উড়িপি নিয়ে যাব ওখানকার কৃষ্ণের
মন্দির দর্শনে। এই নভেম্বর মাসে,
তুলসি পুজো শুরু
হয় আর পুরো মন্দির এক লক্ষ প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করা হয়, কোনও ইলেকট্রিক লাইট ছাড়াই, সে এক অতি সুন্দর দৃশ্য, চলো তোমাকে দেখাই।
অফিসের পরে ওর গাড়িতে মনিপাল
থেকে উড়িপি চলে গেলাম। ও বোধহয় ঠিক করেই এসেছিল যে আজকে আমাকে মন্দিরে নিয়ে
যাবে, তাই বাড়ি থেকে দুটো ধুতি
গাড়িতে নিয়ে রেখেছিল। ওখানে নরমাল পোশাকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। ছেলেদের একটা
সাদা ধুতি পড়তে হয়। সেটাকেই অনেকে নিজের ওপরের অংশে জড়িয়ে নেয়। ব্যাগ, পোশাক আর জুতো ওর গাড়িতে রেখে দিলাম। সাদা ধুতিটা পরে মন্দিরের
ভেতরে প্রবেশ করলাম।
তখন সন্ধে হয়ে
গেছে। চারিদিকে প্রদীপ আর প্রদীপ। পুরো মন্দিরটা যেন আলোকের ঝরনাধারা। শুধুই
প্রদীপের আলোয় মন্দির আলোকিত,
সে এক
অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য, না দেখলে অনুভব করা
বেশ শক্ত। এত সুন্দর দৃশ্য আমি এর আগে কখনো দেখিনি।
যাই হোক, মন্দিরে প্রচণ্ড ভিড়, তাই লাইনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। লাইন এঁকেবেঁকে এগিয়ে
চলেছে। আমার আগে অন্তত ৫০০ লোকের ভিড় হবে। আস্তে আস্তে লাইন এগোচ্ছে। প্রায় এক
ঘন্টা লেগে গেল শ্রীকৃষ্ণের দর্শন পেতে। কাউকেই বেশিক্ষণ দাঁড়াতে দেওয়া হচ্ছে না।
একটা ছোট্ট গর্তের মতো জায়গা দিয়ে ভেতরে শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করতে হয়। ভাগ্যে ছিল, তাই দর্শন হল।
পেছন থেকে প্রায় ধাক্কা
দিয়ে পরের জন এসে গেল। আমি এগিয়ে যাচ্ছি,
সামনে
দেখলাম এক জায়গায় নাড়ু দেওয়া হচ্ছে, সবাই হাত পেতে নিচ্ছে,
আমিও
নিলাম। বিকেলে অফিসের পর সোজা এখানে এসেছি,
কিছু
খাওয়া হয়নি। খুব খিদেও পেয়েছিল, তাই নাড়ুটা পেয়ে সোজা মুখে পুরে দিলাম। যদিও ভগবানের প্রসাদ
সম্বন্ধে কিছু বলতে নেই, কিন্ত মনে হয়েছিল এত
বাজে খেতে নাড়ু আমি কখনও খাইনি। মনে হল বোধহয় শুধু আটা বা ময়দা দিয়ে স্বাদহীন
একটা বস্তু তৈরি করেছে। মানুষকে এত বাজে খেতে কোনও বস্তু দেওয়া উচিত নয়। প্রচণ্ড শুকনো হওয়ার জন্য গলা দিয়ে নামতেই চাইছিল না, কোনমতে কষ্ট করে গলাধঃকরণ করলাম কিন্তু
গলায় আটকে গলা শুকিয়ে গেছে। এখুনি জল খাওয়ার দরকার। কিন্ত এত ভীড়, যে তাড়াতাড়ি বেরোতেও পারছি না। অফিসের কলিগকে বলার চেষ্টা
করছি বলতে, যে গলা শুকিয়ে গেছে, জল খাব, কিন্ত সেটুকুও শব্দ
গলা থেকে বেরোল না। কোনো রকমে ইশারায় বোঝালাম। লাইন থেকে যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি
বেরিয়ে, ও একটা জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে জল রাখা আছে। সেখানে গিয়ে কোনো রকমে জল খেলাম।
তারপরে যেন একটু শান্তি। বললাম,
-তোমাদের মন্দিরের নাড়ু খুব বাজে।
ও জিজ্ঞেস করল,
-নাড়ু কোথায় পেলে?
বললাম,
-ওই তো লাইনে সবাইকে দিচ্ছিল, তুমি নাওনি?
ও এটা শুনে আমার দিকে অদ্ভুত
দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর বলল,
-পেছনে দেখতে।
ঘুরে দাঁড়ালাম, দেখি সবাই ওই নাড়ুটা থেকে থেকে একটু একটু করে কপালে
লাগাচ্ছে, বুকে লাগাচ্ছে, হাতের দুপাশে লাগাচ্ছে। এবারে ও, ওর নেওয়া চন্দনটা দেখাল। এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝলাম, ওটা চন্দন এবং ওটা তো লাগাবার জন্যে দিয়েছিল। আমার অফিস
কলিগটি খুব সর্ন্তপনে নিজের হাসিটা লুকালো।
সারা রাস্তা খুব ভয়ে ভয়ে
এসে পৌঁছালাম হোটেলে। গলায় আঙুল ঢুকিয়ে বমি করবার চেষ্টা করলাম। যদি বেরিয়ে
যায় কিন্তু কোন মতেই বমি হলো না। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে, রাত্রে আর কিছুই খেলাম না। ভয় করছিল যদি গলাতে কিছু হয়, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের আশীর্বাদে কিছুই হয়নি কারণ উনি
বুঝেছিলেন যে এরকম অজ্ঞ বোকাকে বেশি কষ্ট দিয়ে কোন লাভ নেই। সেই যাত্রায় উদ্ধার
হয়েছিলাম।
পরের দিন যখন ব্যাপারটা
অফিসের লোকজনকে বললাম, ওরা আমাকে নিয়ে এতই
হাসতে লাগল যে বেশ লজ্জা করতে শুরু করল। বোকামিরও বোধহয় একটা লিমিট থাকে।
~~000~~

No comments:
Post a Comment