বাতায়ন/চৈতি
হাওয়া—নববর্ষ/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
ঘরের
মধ্যে ঘর
"জুতোটা রেখে সোজা বাথরুমে চলে যায় ও। সাহসটা কি কম পড়ছে! বোনঝিকে ভয় পাচ্ছে স্বাতী! কেন? এই বাড়িটা তো স্বাতীরও। তবু..."
দক্ষিণের জানলার পর্দা আজ বড়
খুশি, হবে নাই বা কেন চৈতালি হাওয়ায়
তারা খেলছে যে, শুধু স্বাতীর পড়ার টেবিলে, বিছানায় ধুলো, নিমের বাতিল পাতায় ভরে গেছে। সে যাক স্বাতীর তাতে অসুবিধা নেই
ঝাঁট দিয়ে নেবে পরে একবার। সারাদিন তো কত কিছুই ঝাঁট দিয়ে চলল ও...
একবার বারান্দায় আসে স্বাতী, এই পাড়া, এই ঘর, দেওয়ালের রং, পর্দা, বই সব কিছু বড় প্রিয়,
বড় আপন
ওর, তবু যেন মনে হয় সুতো ছিঁড়ে
গেছে। আর জোড়াতালি দিয়ে, গিঁট মেরে চালানো
যাচ্ছে না। বিকেলটা কখন যেন বড় মোহময় হয়ে উঠছে, নীচে বড় রাস্তার কোলাহল, ফুটপাতে রঙিন
প্রজাপতি হয়ে মানুষজনের ঘুরে বেড়ানো দেখে বড় ইচ্ছে করছে চট করে পোশাকটা পালটে ভিড়ে
মিশে যেতে। যাবে একবার?
নিজের ঘরে যায় ও, আলমারি ভর্তি শাড়ি,
ড্রেসিং
টেবিলের সামনে রাখা লিপস্টিক, কাজল, দামী পারমিউম কিচ্ছু আর ব্যবহার করা হয় না। কতদিন বাড়ি
থেকেই ও বের হয় না। পড়ার টেবিলের সামনে হাতের পাতা দুটো মেলে ধরে, এখনো কত নবীন অথচ শক্ত। স্বাতী যাপন করছে এক অথর্ব
মানুষের জীবন। অথর্ব বলা ভুল, খাওয়া-পড়া-থাকা কাজের লোকের জীবন,
এই
বাড়ির পাহারাদার স্বাতী। প্রাক্তন শিক্ষিকা,
যাদবপুরের
ছাত্রী! কী পরিণতি আজ! স্বাতী ভাবে এইবার সাহসটা করতেই হবে।
দেবী টিভির সামনে বসে আছে, অসহ্য লাগছে, তবু যে রাগটা সারা
শরীরে আগুন ধরিয়ে রেখেছে, যদি এই কচকচানি শুনে কমে। ঘড়ি দেখাচ্ছে সাড়ে ন'টা। দেবীর ডিনার টাইম,
মাসিমণি খাবারটা
বেড়ে দেয় আর ও খায়। আজ নতুন নয়
এটাই নিয়ম। দেবীর ঠিক করা আর নিয়ম ভাঙা, দেবীর কথার অমান্য হওয়া একদম পছন্দ নয়। কিন্তু ভেবে
পাচ্ছে না মাসিমণির এত সাহস হয় কী করে
ওকে না বলে বেরিয়ে গেল! কোথা থেকে পাচ্ছে? ‘আজ আসুক হচ্ছে মাসিমণির। ধুততোর ছাতার মাথা টিভি।’ রিমোটটা ছুঁড়ে দিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। গুমোট হয়ে আছে, আকাশটা লাল। কালবৈশাখী আসবে মনে হয়!
এই সময় বেলটা
জোরে বেজে ওঠে...
-কোথায় গেছিলি রে এত সেজেগুজে? একটা ফোন করিসনি? চিন্তা হয়তো! কী রে মাসিমণি কিছু বল।
দেবীকে আজ একটা উত্তরও দেবে
না স্বাতী। জুতোটা রেখে সোজা বাথরুমে চলে যায় ও। সাহসটা কি কম পড়ছে! বোনঝিকে ভয়
পাচ্ছে স্বাতী! কেন? এই বাড়িটা তো
স্বাতীরও। তবু... জল ছেটাতে থাকে চোখে-মুখে স্বাতী।
দরজায় আওয়াজ,
-মাসিমণি হলো তোর?
-তুই যা টেবিলে গিয়ে বস, আমি খাবার বাড়ছি।
বড় চুপচাপ আজ এই বাড়িটা, খাওয়ার টেবিল পরিষ্কার করতে করতে স্বাতী তাকায় দেবীর ঘরের
দিকে থমথমে মুখে ওর পড়ার টেবিলে বসে, একটা কবিতা পাঠের
আসরে গিয়েছিল দেবী, শনিবারের বিকেল শিশির
মঞ্চে সমকালীন কবিদের নিয়ে অনুষ্ঠানটা হয়,
শুনতে
না চাইলেও দেবী শোনাত স্বাতীকে। কিন্তু আজ একটা শব্দ খরচ করছে না, ঝড়ের আগের গুমোট! মরুক গে যাক।
ফোনে ছবিগুলো এসে গেছে, দেবীর কবিতা যথেষ্ট মন জয় করেছে, এটাই তো চায় দেবী,
যেখানে
যেখানে যাবে যাবতীয় আলো দেবীর শরীরে মাখামাখি হয়ে থাকবে। ছোট থেকেই তো এটা হয়ে
আসছে, 'দেবী তুমি সবার সেরা' মা তো এটাই শিখিয়ে গেছে, এখনো। তাহলে মাসিমণি ওকে অমান্য করে কোন সাহসে? কথা বলতে হবে।
-মাসিমণি একবার শোন, তুই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবি? কেন রে? তোকে কী এমন আমি
বলেছি, শুধু জানতে চাইলাম কোথায়
গেছিলি না বলে।
স্বাতী আর ধৈর্য রাখতে পারে
না, বাঁধ ভেঙেছে আজ, কথা তো বলবেই।
-বাড়ির কাজের লোকেদেরও ছুটি পাওনা থাকে দেবী, ধরে নে আমি সেই ছুটিটা নিলাম।
-তুই আমায় অপমান করছিস কিন্তু।
-না রে আমি বহুদিন ধরে নিজেকেই অপমান করছিলাম, যাক শোন আমি আর এই বাড়িতে থাকব না, একটা ছোট্ট এক কামরার ঘর ভাড়া নিলাম।
-মানে? কে তোকে এই বুদ্ধি
দিচ্ছে?
-বুদ্ধি কেউ দেয়নি দেবী, চোখটা বড় দেরি করে খুলল। মনে আছে আমার ছাত্রী রোশনী বিয়ের কার্ড, শাড়ি নিয়ে এসেছিল নেমন্তন্ন করতে। তোর কবি বন্ধুদের নিয়ে পার্টি
চলছিল বলে বাইরে থেকেই বিদায় করে দিলি, সেদিনই ভাবতে শুরু করলাম আমার বাবার বাড়িতে আমার জায়গাটা ঠিক কোথায়? মনে আছে তোর সাথে যেদিন নিউমার্কেটে গেলাম, সাথে অবশ্য সেদিন দিদিও ছিল, বুলবুল ছুটে এসে জড়িয়ে ধরেছিল আন্টি বলে। তুই বলেছিলি, ‘প্লিজ এরা ঠিক আমাদের স্ট্যান্ডার্ডের না।’ দিদিও হেসেছিল।
সেদিন থেকেই ভাবলাম আবার নতুন
করে জীবন শুরু করব, এক্কেবারে নিজের মনের
মতো করে। একটু থামেন স্বাতী! ঠান্ডা একটা হাওয়া দিচ্ছে, বারান্দার পর্দারা বড় দুলছে। তবে কি ঝড় উঠল! বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে
যেন!
দু চোখে বিদ্যুৎ তো ঘরে
চমকাচ্ছে, স্বাতী খেয়ালই করেনি।
দেবীর দিকে চোখটা পড়তেই শিউরে ওঠে স্বাতী! এ যে অগ্নি শিখা স্বাতী তাপটা টের পাচ্ছে। হিসহিসিয়ে বলে দেবী,
-তা এই তেষট্টি বছর বয়সে কি নির্মল মামার গলায় মালা
দিবি?
ঘেন্না! ঘেন্না! কথা বলার
প্রবৃত্তি হয় না। তবু স্বাতী বলে,
-তোর কি কিছু অসুবিধা হবে?
আর দাঁড়ায় না স্বাতী নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় ও, দেবীর সুন্দর মুখের ওপর।
ঝড় উঠেছে, আহ্! জানলার ধারে এসে দাঁড়ায়। কলকাতার এইদিকে এখনো কিছু গাছ আছে, আজ তারা বেজায় খুশি,
কী রকম
নাচ করছে! স্বাতীর মনে হলো আজ গোটা প্রকৃতি ওর জন্য খুশি। এই পরিবারের মানসম্মানকে
মূল্য দিতে গিয়ে চাবি দেওয়া কথা বলা পুতুল হয়ে গিয়েছিল। নির্মলকে ফিরিয়ে দিতে
হয়েছিল দিদি, জামাইবাবু আর মা-র জন্য, সংসারের স্বপ্নকে গলা টিপে মেরে দিয়েছিলেন। আঠারো বছরের ছোট
বোনঝির মধ্যে নিজের সন্তানকে দেখেছিলেন,
কিন্তু
কালে দিনে ও যত খ্যাতি পেতে লাগল মাসিটা যে ওর খেলার পুতুল হয়ে উঠল, সেটা বুঝতেই স্বাতীর দেরি হয়ে গিয়েছিল অনেক। আহ্ বৃষ্টি! জানলার বাইরে হাতদুটো বের করে দিলেন
স্বাতী। ভিজুক সব ভিজুক।
দেবীর ঘরের দরজাটা এখনো বন্ধ, দিদিকে কি একটা ফোন করবে? কী দরকার, ঘুরে এসে সব শুনবে। একটু
অপেক্ষা করছে সবিতা আসার জন্য, তারপর বেরিয়ে যাবে এই
বাড়ি থেকে।
আরো একবার চোখ বোলালেন
দেওয়ালের রং, টবের গাছ, কুশন কভার সবের দিকে।
নাহ্ এই ঘর-দুয়ার থেকে স্বাতীর আর কিচ্ছু পাওয়ারও নেই, দেওয়ারও নেই।
অ্যাপ ক্যাবের জন্য অপেক্ষা
করছে স্বাতী, আসল বলে। সবিতা পরে দেবীকে সব
জানিয়ে দেবে। আপাতত গিয়ে উঠবে দীপমিতার কাছে। সেখানে থেকেই তারপর চলে যাবে নিজের
ঘরে, নতুন বছরে নতুন জীবনে পা
রাখবে স্বাতী। ডান হাতের পাতাটা মেলে দিল রোদে, অনুভব করতে চায় উষ্ণতা। এই সম্পূর্ণ একা জীবনে বড় প্রয়োজন।
~~000~~

No comments:
Post a Comment