বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/২য়
সংখ্যা/১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
অজন্তা
প্রবাহিতা
ভালবাসো? এক আতঙ্কের
জন্মকথা
"গৌরবের চোখে অগাধ তৃষ্ণা, ও শুধুই জানতে চাইল— “ভালবাসো?” সেই চোখের দিকে তাকিয়ে পিঙ্কি যেন কোন অচিন দেশে হারিয়ে গেল!"
পিঙ্কি আর গৌরব—দুটি মন।
পিঙ্কি সবে টিনএজে, আর গৌরব মাধ্যমিক
পেরিয়ে কৈশোরের স্বপ্নিল পথে। দুজনের ঠিকানা দুই শহরে, দেখা হওয়ার সুযোগ খুবই কম। অথচ, অদ্ভুত এক অলীক আকর্ষণ! উৎসবের ভিড়ে, সবার মাঝখানে থেকেও চোখদুটো শুধু একে অপরকেই খুঁজে ফেরে।
মনের ভেতর হাজারো অনুভূতি ডানা ঝাপটায়,
কিন্তু
ঠোঁটের কোণে এসে সব থমকে যায়। একদিন সুযোগ বুঝে গৌরব পিঙ্কিকে হঠাৎ কাছে টেনে নিল।
হৃৎস্পন্দন তখন চরম সীমায়। গৌরবের চোখে অগাধ তৃষ্ণা, ও শুধুই জানতে চাইল— “ভালবাসো?” সেই চোখের দিকে তাকিয়ে পিঙ্কি
যেন কোন অচিন দেশে হারিয়ে গেল! শরীর-মন অসাড়,
এক
অদ্ভুত অবশতা ঘিরে ধরল তাকে। কত কথা বলার ছিল, বুকের ভেতর জমানো অনুভূতির ঢেউ, কিন্তু কিছুই মুখে
ফুটে এল না। তবে গৌরব পিঙ্কির চোখের ভাষা পড়ে নিল।
মায়ের হাত ধরে পিঙ্কি বাড়ি
ফিরে এল বটে, কিন্তু মনটা পড়ে রইল সেই
নির্জনে। পড়ার টেবিলে বই খোলা, অথচ অক্ষরগুলো ঝাপসা।
কানে বারবার বাজতে থাকল সেই জাদুকরী প্রশ্ন— “ভালবাসো?”
ভালবাসার
মায়াবী আচ্ছন্নতার সাথেই মনের কোণে নিঃশব্দে বাসা বাঁধল এক কালনাগিনী—হারিয়ে ফেলার
আতঙ্ক। এই বুঝি কেউ কেড়ে নেয় গৌরবকে! সেই আতঙ্কই ধীরে ধীরে পিঙ্কিকে গ্রাস করতে
শুরু করল। ও ছুটে বেড়াল মন্দির, মসজিদ, গুরুদুয়ারা—সবখানে একটাই আকুল প্রার্থনা, “আমার গৌরবকে কেড়ে নিও না, ঈশ্বর!” মনে মনে গভীর বিশ্বাস—গৌরব আর ঈশ্বর, কেউই তাকে ধোঁকা দেবে না।
সময় আপন গতিতে বয়ে চলে।
পিঙ্কি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে পা দেয়। নানা ব্যস্ততায় গৌরবের সাথে দেখা হওয়ার
সুযোগ কমে আসে। তবু সে বিশ্বাস করে—একদিন ঠিক দেখা হবে, সব কথা হবে। মেঘের কাছে জমে থাকা অভিমান, মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা অব্যক্ত অনুভূতি—সব একদিন বলা হবে।
সেই সোনালী আশাতেই দিনগুলো কাটে। চেনা ছন্দে সময় এগোতে থাকে।
হঠাৎ একদিন একটুকরো কালো মেঘ
নিভিয়ে দিল পিঙ্কির আশার আলো। ভেঙে চুরমার
হয়ে গেল আজন্মের ভরসা। গৌরব এক চূড়ান্ত খবর পাঠাল— “ছোটবেলায় অনেক ধরনের সম্পর্ক
হয়। তার মানে এই নয় যে তার বোঝা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। রূপশ্রী এখন আমার
বর্তমান, আগামী দিনের সাথী। অতীতের
দিকে আর ফিরতে চাই না।”
কথাগুলো যেন তীক্ষ্ম তীরের
মতো পিঙ্কির বুক চিরে দিল! যে আতঙ্ক এতদিন ছায়ার মতো তাড়া করে ফিরেছে, সেটাই হঠাৎ নির্দয় বাস্তব হয়ে সামনে দাঁড়াল। যাকে হারানোর
ভয়ে সে এতদিন ব্যাকুল হয়ে প্রার্থনা করেছে,
সেই
হারানোই আজ নির্মম সত্যি। পিঙ্কির শরীর যেন আর মনের বোঝা বইতে পারল না। তীব্র জ্বর, খাওয়াদাওয়া সব বন্ধ। চোখের নিচে যন্ত্রণার গভীর ছাপ। রক্তের
রিপোর্টে হিমোগ্লোবিন তিনের কাছাকাছি নেমে এল—ডাক্তারদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ।
বাড়ির লোকের চোখে-মুখে চরম আতঙ্ক।
যে ভয় তাকে এতদিন ঘুমোতে দিত
না, সেই ভয়ই এবার বাস্তব হয়ে
বিছানার পাশে বসে আছে। কানে বাজে একটাই প্রশ্ন “ভালবাসো?”
কিন্তু
এবার উত্তর দেওয়ার মতো শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। ডাক্তার আর মৃত্যুদূতের অদৃশ্য
টানাপোড়েনে দুলতে দুলতে পিঙ্কি অবশেষে ফিরল বটে, কিন্তু, আতঙ্কের কালনাগিনীর চূড়ান্ত
বাস্তব রূপের সামনে সেই সহজ সরল মেয়েটা কোথাও হারিয়ে গেল। “ভালবাসো?” প্রশ্নটাই ওর কাছে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার স্মৃতি।
~~000~~
অসাধারণ গভীর বাস্তব কাহিনী মন ছুঁয়ে গেলো।
ReplyDelete