বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
উজ্জ্বল
পায়রা
নতুন
অধ্যায়ের গল্প
"সেঁজুতি জোর করে ঠোঁটে বাঁকা হাসি এনে বলল— বাড়িটা আমার। শ্বশুরের বাড়িও নয়, স্বামীর বাড়িও নয়, বাপের বাড়িও নয়, ছেলের বাড়ি তো নয়ই। এটা আমার বাড়ি। এই বাড়িতে কাকে ঢুকতে দেব আর কাকে দেব না সেটা সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।"
সকাল সাতটা। পূর্ব দিকের
জানালা বেয়ে নরম রোদ এসে পড়েছে সেঁজুতির ডাইনিং টেবিলে। এসময় রোজ চা আর একবাটি
মুড়ি নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের রোদ আর প্রকৃতির সাথে কথা বলতে বসে সেঁজুতি।
সামনে বড় রাস্তায় কত লোকের যাতায়াত চোখে পড়ে। আজ সবে পেয়ালায় চুমুক দিয়েছে
এমন সময় একটা বাইক এসে থামল বড় রাস্তার মোড়ে। বাইক থামাটা এমন নতুন কিছু নয়, কত বাইকই তো থামে,
কত
দরকারে কে কোন বাড়িতে আসে রোজ কিন্তু আজ এই বাইক থেকে যে লোকটা নামল তাকে দেখে
সেঁজুতির বুকের ভিতরটায় ধড়াস করে উঠল।
জীবনের পঁয়তাল্লিশটা বছর
শুধু লড়াই করে কেটেছে তার। কত দুঃসহ চক্রান্ত, কত বড় বড় সমস্যার সাথে লড়াই করে চলেছে সে এই একার জীবনে। কখনো তো ভয়
পায়নি কোন কিছুতে! তবে আজ বুকের ভেতরটা কেন এমন করে উঠল? ভয় নাকি আশঙ্কা যা তার মনের ভিতর অবশ্যম্ভাবী প্রত্যাশিত
আতঙ্ক হয়ে প্রহর গুনছিল?
অতি পরিচিত ওই আগন্তুক
ততক্ষণে নাম ধরে ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছে। সেঁজুতি চায়ের কাপ টেবিলে নামিয়ে
রেখে বাইরে বেরিয়ে গেটের তালা খুলে দিল কিন্তু কোনো কথা বলল না।
সদ্য বাড়ি করেছে সেঁজুতি, নিজের বাড়ি। তবে বাড়ি বলতে যা বোঝায় ঠিক তা নয়। বলা
যেতে পারে মাথা গোঁজার ঠাঁই। এই ঠাঁইটুকুর জন্য এতদিন কী যে লাঞ্ছনা সয়েছে সে!
অভাব অনটনে বাড়ি ভাড়া দিতে না পেরে আপনজনদের বাড়ি বাড়ি ঘুরেছে তবু একটু ঠাঁই
হয়নি কোথাও। এই ঠাঁইটুকু করে উঠতে গোটা জীবনটাকে ব্যয় করতে হয়েছে তার। আজ সে
নিঃস্ব। তাকে নিঃস্ব করেছে নিজের লোকেদেরই বিশ্বাসঘাতকতা।
সেঁজুতি বাড়ির সামনে
বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। লোকটাও। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর লোকটাই বলে উঠল— ঘরে
যেতে বলবে না? সেঁজুতি জোর করে ঠোঁটে বাঁকা
হাসি এনে বলল— বাড়িটা আমার। শ্বশুরের বাড়িও নয়, স্বামীর বাড়িও নয়, বাপের বাড়িও নয়, ছেলের বাড়ি তো নয়ই। এটা আমার বাড়ি। এই বাড়িতে কাকে
ঢুকতে দেব আর কাকে দেব না সেটা সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। বলেই মুখের
উপর দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল।
ঘরে ঢুকে কোনরকমে চেয়ারটা
টেনে বসে পড়ল। সারা শরীর কাঁপছে তার। কতক্ষণ যে এভাবে কেটেছে সে জানে না। বাইরে বাইকে
স্টার্ট দেওয়ার শব্দে চমক ভাঙল। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে চুমুক দিতে গিয়ে দেখল
চা-টা একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে আর
বিশ্রী এক নোনতা স্বাদে ভরে উঠেছে। বোধহয় চোখ বেয়ে অজান্তেই...
~~000~~
No comments:
Post a Comment