প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Tuesday, May 5, 2026

দুঃস্বপ্ন | মনোজ চ‍্যাটার্জী

বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
মনোজ চ‍্যাটার্জী
 
দুঃস্বপ্ন

"সে আর কিছু বলে নাতার কাছে কেউ পদানত হলে তার ভাল লাগে নাসে নিজেই এই পৃথিবীতে পদানত হয়ে থাকা এক সামান্য মানুষ। সে নিজের কাজে চলে যায়।"

 
সেই ছোট থেকেই বোধহয় তার মধ্যে সবসময় এই সবকিছুতেই ভয় ভয় ভাবটা ছিল। নাহলে শুভাশিসের বুদ্ধি তো কিছু কম ছিল না, তবু জীবনে বলার মতো কিছু সাফল্য পেল না। স্কুলে তার চেয়ে অনেক কম নাম্বার পেত যারা তারাও সব কোথায় পৌঁছে গেছে অথচ সে কোনরকমে একটা মালের গোডাউনে ইন-আউট খাতা লেখার কাজ করে। সেই খাতা চলে যায় মালিকের কাছে। তিনি তার থেকে পার্সোনাল অডিট করেন মালপত্রের। তবে তার সরলতা ও সততার জন্য বিশেষ খাতির আছে মালিকের কাছে। তেমন কিছু মাইনে না পেলেও প্রত‍্যেকদিন বাবু তার সাথে আধঘণ্টা মতো একান্তে কথা বলেন, তাকে অন্য কর্মচারীরা খুব একটা ঘাঁটাতে সাহস পায় না। সে নিজের মতো আসে, সারাদিন কাজ করে, সন্ধের দিকে বাড়ি চলে যায়। গোডাউনের গেটে সেদিনের মতো তালা পড়ে।
 
এইভাবেই শুভাশিসের সব মোটামুটি ঠিকই চলছিল। স্বচ্ছলতা না থাকলেও অভাব ছিল না। গোডাউনে একটু কষ্ট করে খালি মাল দেখে নিতে হয়। আদ্যোপান্ত না দেখলেই সব টুপি পরানোর জন্য বসে আছে। মাল ঢোকার সময় পার্টিরা টুপি পরাবে আর বেরোনোর সময় সহকর্মীরা। কিছু সহকর্মী তাকে দু-একবার দুপয়সা কামিয়ে নেওয়ার জন্য বলেওছে। খুব সন্তোষজনক মাইনে না পেলেও সে এসব করতে পারে না। এই দুর্বলতা নিয়েই সে চল্লিশটা বছর কাটিয়ে দিল। এইযুগে সে সত্যিই অচল। কিছুতেই সে মিথ্যে বলতে পারে না। একবার দোকানে তাকে একটা পাঁচশো টাকা ও তিনটে কুড়িটাকার বদলে তিনটে পাঁচশো টাকা ও একটা কুড়ি টাকা দিয়েছিল। সে সবজিআলার ভুল ধরিয়ে দেয়। লোকটা কীরকম একটা মুখ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। 'ইয়ে টিকেগা নেহি' অভিব‍্যক্তি নিয়ে।
 
সে যাই হোক, মাসছয়েক হল বাবু দেরাদুন বাসমতী চাল সেকশনে একজন নতুন ম‍্যানেজার নিয়েছেন। লোকটাকে
প্রথম দেখেই তার ভাল লাগেনি। এরকম লোক বাবু কেন এখানে নিল, তার মাথায় ঢোকেনি। সে নিজে সাদাসিধে ইনোসেন্ট হলেও তার একটা অন্য ক্ষমতা আছে। যে-কোনো লোকের চোখ-মুখ অভিব‍্যক্তি দেখলেই সে প্রথম নজরেই বুঝতে পেরে যায় লোকটা খুব শয়তান ধরনের কিনা। খুব শয়তান বুঝলেই সে যেনতেনপ্রকারেণ এড়িয়ে যায়। তার ক্ষতি করার সুযোগ দেয় না। এখন পর্যন্ত যতই সাধুসাধু ভাব দেখাক লোকটাকে তার ভাল লাগে না। জীবনে তার বেশ কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। সিনেমা-সিরিয়ালের অন‍্যের ব‍্যাগে আড়ালে গয়না ঢুকিয়ে দেওয়ার গল্প সে বাস্তবেও দেখেছে।
 
শুভাশিস সেদিন যথারীতি ভোর-ভোর ধর্মকাঁটা পেরিয়ে গেটের দিকে আসছে, হঠাৎ তার ঠিক পিছনেই দড়াম করে একটা বিকট আওয়াজ। পুরো ভয়ে চমকে গেছে সে। পিছন ঘুরে দেখে নতুন ম‍্যানেজার। আর ধর্মকাঁটার মেটাল প্ল‍্যাটফর্মের উপরে একটা বড় পাথর পড়ে আছে। আর সে উৎপল দত্তের মতো মুখ করে ফিকফিক করে হাসছে।
-আরে দাদা, আপনি এত ভয় পেয়ে যাবেন আমি তো ভাবতেই পারিনি, সরি সরি, মাফ করবেন দাদা, আমার খুব ভুল হয়ে গেছে, এই আপনার পায়ে পড়ছি, দয়া করে বাবুকে এই কথা বলবেন না, আমার চাকরিটা চলে যাবে। চারটে ছেলেমেয়ে আর রুগ্ন বউ নিয়ে আমার সংসার। চাকরিটা চলে গেলে ছেলেপিলেগুলো না খেতে পেয়ে মরে যাবে।
-এ আবার কেমন ইয়ার্কি?
-দাদা ভুল হয়ে গেছে, আপনার হাতেপায়ে ধরছি, আমি তো আপনার মতো ভাল ঘরের পড়াশুনা জানা লোক নয়, আমরা অ্যাইসায় ইয়ার্কি করি। দাদা, এবারের মতো মাফ করে দিন, আর কোনদিন এই ভুল হবে না।
সে আর কিছু বলে না, তার কাছে কেউ পদানত হলে তার ভাল লাগে না, সে নিজেই এই পৃথিবীতে পদানত হয়ে থাকা এক সামান্য মানুষ। সে নিজের কাজে চলে যায়।
 
নতুন ম‍্যানেজার ঘনশ‍্যাম কিন্তু তাকে টেস্ট করার জন্যই এই ফালতু ইয়ার্কি করেছিল। এবং টেস্টের রেজাল্ট এটাই বার হল যে, শুভাশিস যতই মালিকের ছত্রছায়ায় থাকুক, সে আসলে খুব ভীতু লোক। আর এই সুযোগটাই তাকে কাজে লাগাতে হবে। সেদিন যথারীতি শুভাশিস ডিউটি শেষ করে গোডাউন থেকে বড় রাস্তায় বাসস্টপের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ পিছন থেকে
-ও দাদা, ও দাদা, দাঁড়ান, দাঁড়ান, আমিও আপনার সঙ্গে যাব।
সে পিছন ঘুরে দেখে ঘনশ‍্যাম ডাকছে তাকে। এ আবার এখন কেন? ওর তো অনেক আগেই ছুটি হয়ে যায়। দু-তিন ঘন্টা কোথায় ছিল? একবার গোডাউন থেকে বেরিয়ে গেলে এখানে তো সময় কাটানোর জন্য একটা চায়ের
দোকানও নেই। মনের ভাবনা সরিয়ে রেখে সে ঘনশ‍্যামের জন্য দাঁড়ায়।
-আরে দাদা, আপনার সঙ্গে একটু ভাল করে আলাপ পরিচয় করব বলেই তো আজ এখনো বাড়ি যানি। আপনি
শুনেছি আমাদের ওদিকেই কাছাকাছি থাকেন। আমি তো শিমুলতলায় থাকি, আপনি ঠিক কোন জায়গায় থাকেন?
-আমি রাধানগরে থাকি, তোমার থেকে খুব কাছে নয়।
-কাছে না হলেও খুব দূরেও নয়। কী দাদা, আমি আলাপ করতে এলাম, আর আপনি পর করে দিচ্ছেন।
-না, না তা নয়, আমি এমনি বললাম।
সে মনে মনে ভাবে এসব ধুরন্ধর লোক সব ধরে ফেলে। যতই সে এড়িয়ে যাক, কথায় কথায় ঘনশ‍্যাম তার অনেক খবর জেনে নেয়। জানার আর কী আছে, বাড়িতে এক বিধবা বয়স্ক মা আর এখনো বিয়ে দিতে না পারা বিয়ের বয়স প্রায় পেরিয়ে যাচ্ছে এমন এক বোন নিয়ে তার কোনরকম দিন গুজরান। তারপর থেকে প্রায়ই ঘনশ‍্যাম তার পিছু ধরে, কম কথার লোক সে, বেশি বকবক করতে পারে না, আবার পছন্দ না হলেও সে তাকে কিছু বলতেও পারে না।
-দাদা, আপনার ঘরে তো ভালই অভাব, তারপর বোনটারও তো বিয়ে দিতে হবে, দিয়ে আপনি যদি বিয়েশাদি না করেন, বয়সকালে আপনাকে দেখবে কে? দুনিয়াটা আপনি চিনলেন না দাদা, বাবু যতক্ষণ আপনার কাছে কাজ পাবে, লাভ পাবে আপনার খাতির করবে। যখন আর খাটতে পারবেন না, তখন বাবুও আপনাকে আস্তে আস্তে সাইড করে দেবে। আমি একটা ভাল আইডিয়া দিচ্ছি শুনুন। বাসমতী চালের পার্টির সঙ্গে আমার কথা হয়, আপনি যদি শুধু এনট্রি খাতায় হাজার বস্তার জায়গায় দুহাজার বস্তা লিখে দেন, তো পার্টি আটশো বস্তা চালের দাম আমাদের দেবে। ওদের দুশো বস্তা প্রফিট, আপনার পাঁচশো বস্তা, আমার তিনশো বস্তার দাম হবে। সে আপনি না-হয় আমাকে দুশো বস্তা দিয়ে ছশো বস্তা নেবেন। ভাবতে পারছেন ছশো বস্তা বাসমতী চালের দাম কত হবে?
আর গোডাউনে লাখ-লাখ বস্তার মধ্যে হাজার বস্তা কেউ চেক করতে পারবে না।
-না, না, আমাকে এসব কথা বলবে না, এসব আমি করতে পারি না।
-অ তাই বুঝি, তাহলে বলে দি, আমি যে এসব বলেছি এটা যেন বাবুর কানে না যা, তাহলে আমার জয়েনের দিন থেকে আপনি একাই যেমন বুঝতে পেরেছিলেন, আমি খুব শয়তান ধরনের লোক, সেটাই সত্যি হয়ে যাবে।
 
ভিতরে ভিতরে এক ভয়ংকর অস্বস্তি নিয়ে সে সেদিন বাড়ি ফেরে। রাতে বিছানায় শুয়েও তার ঘুম আসে না। এপাশ-ওপাশ করে। একসময় সে দেখে, রাত বারোটার পর গোডাউন থেকে হেঁটে হেঁটে ফিরছে। চারপাশে গাঢ় অন্ধকার। একটা ব্রিজের তলা দিয়ে যাচ্ছে, ব্রিজের তলায় হাঁটুসমান বৃষ্টির জল জমেছে, কোনরকমে পেরোচ্ছে, হঠাৎ একটা বড় পাথরের চাঁই খসে পড়ছে তার মাথার উপর। কুমিরের মতো একটা কিছু, তার পা-দুটো আটকে ধরেছে। পাথরটা নেমে আসছে তার মাথার উপর। বাঁচাও, বাঁচাও চিৎকার করারও ক্ষমতা নেই। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে যায়।

~~000~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)