প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Tuesday, May 5, 2026

গরম ভাত ও একটি তালিকা | অদিতি চ্যাটার্জি

বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
 
গরম ভাত ও একটি তালিকা

"জমির দলিল পাব কোথায় বউদিজমি থাকলে তো! ভাতই জুটত না বলে দেশ থেকে কাকার কাছে এলাম শহরে। তোমার চোখের সামনেই তো বলোপড়াশোনাও তো জানি না মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট বা আসবে কোথা থেকে?"

 
-কাকি আসছি গো।
-সরবতি লেবুগুলো কামাচিটার জন্য নিয়ে যাস, খাবার টেবিলে রেখেছি।
দরজাটা বন্ধ করে সোফায় এসে বসলেন মধুমিতা, সকাল থেকে খবরের কাগজের পাতা ওলটানো হয়নি, অবশ্য খবরের যা ছিরি পড়তে আর ইচ্ছে যায় না। বহুদিন শিখাবউদিকে ফোন করা হয় না, তালিকায় নাম উঠল কিনা কে জানে? বিবেচনাধীন তো শুনেছিলাম, মোবাইলের কললিস্টে শিখাবউদিকে খুঁজতে খুঁজতে ভাবেন মধুমিতা।
-অ্যাই জানো বউদিটা ঝামেলার হাত থেকে বেঁচে গেছে, নাম উঠেছে এই লিস্টে।
বেডরুমে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করতে বসা পলাশবাবুর দিকে কথাগুলো ছুঁড়ে দিলেন মধুমিতা।
-সে তো তুমিও বেঁচে গেছ।
-তা আর বলতে! খুব টেনশনে ছিলাম নাম না থাকলে লিস্টে হলফনামার জন্য আলিপুর কোর্টে ছুটতে হতো।
পলাশবাবু চুপ করে যান, কে জানে হয়তো টিভি, খবরের কাগজে দেখা বয়স্ক, অসুস্থ মানুষ থেকে ছাত্রী, সেলিব্রিটি, বিয়ের বরের সাথে তাঁর গিন্নিও এক হয়ে গিয়েছিল, সেই কথাগুলোই মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে হয়তো! ভুরু কুঁচকে থাকা ওই মুখটা দেখে, এই মুহূর্তে মধুমিতার তো সেই কথাই মনে আসছে। সরে আসেন বেডরুমের দরজা থেকে। সোফায় আবারও খবরের কাগজ খুলে বসেন। যুদ্ধটা একদম ঘরের কাছে এসে পড়েছে, তবে একটা নিশ্চিন্ত যে গ্যাসের সাথে মধুমিতারা ইনডাকশন ব্যবহার করেন, আর সীমিত রান্নাটা হয় তাই এই মুহূর্তে রান্নার জ্বালানি নিয়ে টেনশন নেই কিন্তু অটো ভাড়া বেড়েছে, এইভাবে যদি চলতে থাকে তবে জিনিসপত্রের দাম তো আকাশ ছোঁবে, দুজন রিটায়ার করা মানুষ, সরকারি চাকরিই করতেন, পেনশন, জমানো টাকা থাকলেও শরীর খারাপ, সামান্য হলেও ওষুধ আছে। ধুস্ সত্যি রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগরার প্রাণ যায়। এই যেমন মধুমিতাদের মতো মানুষদের টেনশন যাচ্ছে। বিরক্তি নিয়ে খবরের কাগজটা রেখে স্নানে যান মধুমিতা।
চৈত্রের ঘুঘু ডাকা দুপুর বেলা কিছু সময় আগেই খেয়ে উঠেছেন মধুমিতা-পলাশ। পলাশ এখন মেয়েকে ফোন করছে, বেসরকারি হাসপাতালে স্টাফ নার্স। এখনো বিয়ে করেনি একাই থাকে বেঙ্গালুরুতে। মাইনেপত্র ভাল হলেও ওখানে খরচ বড় বেশি। একটা রুটির দামই নাকি ষোলো টাকা! গল্পের বইটা কাছে টানেন মধুমিতা, বেশ নিশ্চিন্ত লাগছে আজকাল। মন ভাল তো জগত ভালো, আজ দুপুরের খাবারটা বড় তৃপ্তি করে খেয়েছেন, গরম ভাত, আলু-উচ্ছে মাখা, সবজি দিয়ে কাতলা মাছের পাতলা ঝোল আর টকদই। গরমে টকদই ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারেন না। এই খাবারগুলোর স্বাদ কিচ্ছু পাচ্ছিলেন না ইদানীং, স্বাভাবিক পাবেন কী করে! মধুমিতা গঙ্গোপাধ্যায় এই নামটাই তো বিবেচনাধীন ছিল। সরস্বতী পুজোর আগের দিনটা তো ভুলতে পারেন না, স্বামীর পদবি ব্যবহার করেন না, পদবি ভুলের জন্য যেতে হলো শুনানিতে। যাবতীয় ডকুমেন্ট এমনকি বাবার হলুদ হয়ে যাওয়া ডেথ সার্টিফিকেট অবধি নিয়ে গেছেন। রাজ্য সরকারের পদস্থ রিটায়ার কর্মচারী, আর ওনার বাড়িতে কাজ করা আরতি এবং ওর স্বামী কামাচি সেদিন এক হয়ে গিয়েছিলেন, ভয়ে। বিএলও স্যার বলেছিলেন নাম না উঠলে আলিপুর কোর্টে হলফনামা দিতে হবে। উনি তো বলেই খালাস কিন্তু প্রেশার, হাঁটুর সমস্যা নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে কাজ উদ্ধার করার নামেই প্রেশার বেড়ে গেল! তবু ভালো, নামটা উঠেছে। ধুস্ আর ঘুম আসবে না, বরং রাসবিহারীতে মিঠুর বাড়ি থেকে ঘুরে আসা যা
পলাশবাবুকে নিয়ে যাওয়া গেল না, শেয়ার বাজারের নেশা আছে, অনলাইনে এই সংক্রান্ত ছাত্র পড়ান। আরতি রুটি করতে আসবে, তারপর পলাশবাবু পার্কে হাঁটতে যাবেন। ভারী ফুরফুরে মুডে ওরা আছেন এখন। মেঘটা কেটে গেছে তো!
স্টুডিওটার গায়েই কামাচির চা-ওমলেট-কেক-পাউরুটির দোকান। স্টুডিওর ভেতরে কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছদুটো মনের আনন্দে কামাচির চায়ের দোকানটায় পুষ্পবৃষ্টি করেছে। আহা রে এই নরম আদরটা যদি বোকা ছেলেটাকে কেউ করত।
রাজু, কামাচির শালার সাথে চোখাচোখি হয় মধুমিতার। ছেলেটা হালকা হাসল, রিকশাটা এই সময় না চালিয়ে কামাচির দোকানটা খুলেছে, তারপর আবার আরতি আসবে দোকান সামলাতে, ওর নিজের কাজ সামলিয়ে।
ভয় দেখিয়ে মজা পাওয়া মানুষের এক বিকৃত আনন্দ। বোকা কামাচিটা তার বলি হতে যাচ্ছিল আর একটু হলে।
অটোতে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে মধুমিতার, বেচারি নিজের নাম কামেশ্বর রায় দেখতে না পেয়ে খেপে উঠেছিল। সে তো প্রথমে আরতি, রাজু, আমার নিজের, শিখাবউদি এইরকম আরো কত মানুষের ছিল না। তবু অদ্ভুত টেনশন করত ছেলেটা।
নব্বই সালে বিয়ে করে আসার পর থেকে কামাচিকে চেনেন, বছর পনেরোর ছেলেটাকে দেহাত থেকে কাকা নিয়ে আসে। খাটাল দেখাশোনার কাজে। এছাড়া তখন তো ফ্ল্যাট বাড়ি-টাড়ি হয়নি, মালির কাজটাও করত। দুটো ভাত আর কাকার ঠেকানি ছিল বাঁধা
সেই ছেলেরও বিয়ে হয় সেই পাথরপ্রতিমা প্রত্যন্ত অঞ্চলের আরতির সাথে, দু হাজার সালের পরেই হবে। বোকা ছেলে-ভিতু বউটা ধীরে ধীরে নিজেদের একটা ঘর ভাড়া নেয় বস্তিতে। কী অসম্ভব পরিশ্রম করেছে দুজনে। আজ যদিবা একটু সামলাতে পারল, ভোটার লিস্টে নাম ওঠায়...
হাসপাতালটার সামনে অটোটা দাঁড়িয়েছে জ্যামে, সেই হাসপাতাল! ভাগ্যিস আরতি ফিনাইলের মধ্যে জল মিশিয়ে রেখেছিল, আর মেয়েটা ঘরে এসে গিয়েছিল। কী যে বিপদ হতো ভাবতে গিয়েই শিউরে ওঠেন।
কামাচির কাকা-কাকির ভোট বিহারে, ইশ্‌ বোকাটা যদি সেখানেও নামটা তুলে রাখত! বাড়িতে আসার পর গিয়েছিলেন মধুমিতা আর পলাশ দেখা করতে, রোগা ছেলেটা ভয়ে তো রোগা হয়েই গিয়েছিল এখন ভয়ানক কাণ্ডের পর শরীরটা শুকিয়ে গেছে। কথা বলবে যদি কান্নাটা বন্ধ হয়। দু হাত ধরে বলে চলেছে,
-জমির দলিল পাব কোথায় বউদি? জমি থাকলে তো! ভাতই জুটত না বলে দেশ থেকে কাকার কাছে এলাম শহরে। তোমার চোখের সামনেই তো বলো? পড়াশোনাও তো জানি না মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট বা আসবে কোথা থেকে? সেই তো সাত-আট বছর বয়স থেকে খেটে চলেছি। কিন্তু তুমি বলো, আমার আধার কার্ড, রেশন কার্ড আছে। এখানে তো কতবার ভোট দিলাম আমরা বিয়ের পর থেকে। তাহলে আমার নাম থাকবে না কেন বউদি?
যদি আমাকে ক্যাম্প কী বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়? ওই বিল্টুরা বলছিল। কিন্তু বউদি আমি তো হিন্দু বিহারী তবে?
তবের কোনো উত্তর মধুমিতা বা পলাশের কাছে তো সেদিন ছিল না। রাসবিহারীর মোড়ে এসে দাঁড়ায় অটোটা। ভাড়াটা মিটিয়ে গুরুদোয়ারার দিকে হাঁটতে থাকেন মধুমিতা, আকাশের রং পাল্টে যাচ্ছে, ঝড়ের গন্ধ টের পাচ্ছেন।
কালবৈশাখী তো এসেইছে সবার জীবনে, গরম ভাতের জোগাড়ে জীবন কাটানো কামাচি যুক্তি খুঁজে চলেছে বাঙালি না বিহারী ! হিন্দু না মুসলিমের কাছে। হায় রে জীবন!
কালবৈশাখী ঝড়টা উঠেই গেল, মধুমিতা দৌড়ালেন নিশ্চিত কোনো আশ্রয়ের কাছে।
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)