প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Sunday, April 26, 2026

সাহস | দীপ্তি নন্দন

বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/২য় সংখ্যা/১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
দীপ্তি নন্দন
 
সাহস

"কোনোমতে সে তাদের হস্টেল বাড়িটির সামনে এসে পৌঁছে দেখল দরজার ওপরে একটা টিমটিমে কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। ঝোপজঙ্গলে ঢাকা আশপাশ।"

 
-হ্যাঁরে পিয়ালী, নবীনা, টিয়া তোরা এখন হস্টেলে ফিরবি তো?
-না না, এখন তো আমরা একটু কিছু খেতে ক্যান্টিনে যাব। সেই কোন সকাল থেকে ক্লাস করছি, খিদে পেয়ে গেছে। তু্ইও চল-না।
-না রে, আমি আগে একটু স্নান করে নিই। তারপর ক্যান্টিনে আসছি। তোরা ততক্ষণ শুরু কর। আমি এখনই চলে আসব।
মুখে এইকথা বললেও মনে মনে কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ করে সে, একা হস্টেলের দিকে যেতে। কিন্তু বরাবরের অভ্যেস মতো এই সন্ধেবেলায় তার স্নানটাও খুব দরকার। গ্রামে থাকতে সন্ধ্যা প্রদীপ দেওয়ার আগে খেলাধুলো সেরে এসে রোজ পুকুরে ডুব দিয়ে পরিষ্কার পোশাক পরে সন্ধে দিত ঘরে আর তুলসী তলায়। বয়সের কারণে তার ঠাকুরমা ওই কাজগুলো আর পারতেন না বলে। সেই অভ্যেসটাই তার রয়ে গেছে আজও। তাই এই শহরে এসেও সন্ধেয় সে স্নান না করে পারে না। তাই সব চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে সে সামনে এগুলো।
মাত্র কদিন আগেই তাদের নার্সিং-এর ট্রেনিং শুরু হয়েছে। আর দেবযানী তাদের গ্রাম থেকে এই বড় শহরের বিরাট হাসপাতালে এসেছে নার্সিং ট্রেনিং নিতে। তাদের নার্সিং স্টুডেন্টস হস্টেলটা এই বিরাট বড় হাসপাতালের একেবারে পেছনের কম্পাউন্ড ওয়ালের পাশে! আর সে এবং আরও মেয়েরা ট্রেনিং নিতে এসে এখানেই সবাই উঠেছে।
প্রথম দর্শনেই জায়গাটা তার ভাল লাগেনি। একেবারে বাউণ্ডারি ওয়ালের গা ঘেঁষে ভীষণ নির্জন ঝোপঝাড়ে ঢাকা জায়গাটার পাশে বাড়িটা! সন্ধে হলেই কেমন যেন একটা আলো-আঁধারের খেলা শুরু হয়ে যায় সেখানে। তাই সব ক্লাস শেষ করে সন্ধে পেরিয়ে এখানে এলেই গা ছমছম করে ওঠে তার, যদিও জোর করে সে সেটা অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করে কারণ, তাদের এক বছরের সিনিয়র, ভীষণ গুণ্ডা প্রকৃতির কাকলি। সে যদি তার এই দুর্বলতার কথাটা একবার জেনে ফ্যালে তাহলে তার টিটকিরির হাত থেকে রেহাই মিলবে না সহজে। আর গ্রামের চিরকালের সাহসী তকমা পাওয়া মেয়ে হয়ে এ লজ্জা সে রাখবে কোথায়?
দেবযানী এমনিতে যথেষ্ট সাহসী। এক প্রত্যন্ত গ্রামে তার বাড়ি। আর সেখানেই কেটেছে তার এই উনিশটি বছর। তাদের বাড়ির আশেপাশের ময়না, রেখা, মিনতি, ভানু ইত্যাদি তার সব বন্ধুর দল একটু অন্ধকার হলেই যখন ভূতের ভয়ে জড়সড় হয়ে ঘর থেকে বাইরের ঝুপসি অন্ধকারে যেতে ভয় পায়, তখন সে অবলীলায় তেঁতুলতলা থেকে পাকা তেঁতুল তুলে আনে, ঝড়ে আম পড়লে রাতেই বাগানে গিয়ে আম কুড়িয়ে আনে একঝুড়ি।
ঠাকুমা নিভাননী বলেন, এই দস্যি মেয়েটাকে নিয়ে কী যে করি। মনে মনে কিন্তু তার সাহস দেখে খুশি হন।
ঠাকুরদা হরিমোহন রায় একজন স্মার্ট পণ্ডিত মানুষ। সারাদিন বিভিন্ন ছাত্রের আনাগোনা তাঁর কাছে। তিনিও খুশি হন তাঁর অকালমৃত ছেলে-বৌমার মতোই সাহসী নাতনিটিকে দেখে।
একমাত্র সন্তান চন্দ্রমোহন ছিলেন ভারতের সেনাবাহিনীর একজন বড় অফিসার। বৌমা আরতিকে নিয়ে একটা জায়গায় যাবার সময় রাস্তায় পোঁতা মাইন বিস্ফোরণের ফলে মৃত্যু হয় দুজনের। তাঁদের বিপজ্জনক জীবনে তাদের সন্তানকে নিয়ে যেতে চাননি তাঁরা। তাই ছোট থেকেই দেবযানী মানে দেবী এই গ্রামের বাড়িতে দাদু-ঠাম্মার কাছে বড় হচ্ছে। বাবার আর দাদুর মতোই সাহসী আর মুক্ত চিন্তার অধিকারী অকুতোভয় মেয়েটির ইচ্ছে সে কোনো বড় শহরে গিয়ে কোনো নামী মেডিকেল কলেজ থেকে নার্সিং ট্রেনিং নেবে। তাই বারোক্লাস পাশ করে সে নার্সিং-এর প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে শহরের এই বিখ্যাত হাসপাতালে এসেছে দিনকতক আগে।
কোনোমতে সে তাদের হস্টেল বাড়িটির সামনে এসে পৌঁছে দেখল দরজার ওপরে একটা টিমটিমে কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। ঝোপজঙ্গলে ঢাকা আশপাশ। তাই ওই কম পাওয়ারের মিটমিটে আলোয় একটা আলো-আঁধারি হয়ে আছে জায়গাটা।
তারপরে ও শুনেছে পাশেই নাকি মর্গ! কেমন যেন গা ছমছমে পরিবেশ। দেবযানীর গা-টা যেন শিরশির করে উঠল এই অজানা, অচেনা পরিবেশে এসে। এই সাহসী মেয়েটির সব সাহস যেন এক ফু্ঁতেই কেউ উড়িয়ে দিয়েছে। আতঙ্কে বিহ্বল হয়ে যখন সে ভাবছে আবার ফিরে গিয়ে ক্যান্টিনে নতুন পাওয়া বন্ধুদের সঙ্গে যোগ দিয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসবে কিনা, তখন পেছন থেকে একটা গলা পেয়ে ভীষণ চমকে গেল সে!
-কী রে, এখানে হাঁদার মতন দাঁড়িয়ে করছিসটা কী? ভেতরে ঢুকবি না বাইরে আসবি বুঝতে পারছিস না নাকি!
সঙ্গে সঙ্গে পিঠে একটা জোর থাপ্পড়। ফিরে দেবযানী দ্যাখে, কাকলি! যাকে তার পুরুষালি হাবভাবের জন্য একদম পছন্দ করতে পারেনি এই কদিনের মধ্যে। আজ তাকেই এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল সে। বলল,
-এইতো তোর জন্যই তো অপেক্ষা করছিলাম। চল ভেতরে যাই।
এখন সে উপলব্ধি করল, সময় বিশেষে ঘোরতর অপছন্দের মানুষকেও দরকার হয়। এখন যেমন কাকলিকে সামনে পেয়ে একটু আগেই সে জড়িয়ে ধরেছিল অহেতুক ভীষণ ভয় পেয়ে! গ্রামে থাকতে আশৈশব পরিচিত তেঁতুলতলা কি আম বাগানে যেতে তার ভয় করেনি আর শহরে এসে এত আলো আর লোকজনের মধ্যে সে শুধু নিস্তব্ধতার কারণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। একা এই হস্টেলে ঢোকার মতন সাহসটাও জোটাতে পারেনি, অন্যের কাছে তো বটেই নিজের কাছেও মুখ দেখাতে তার লজ্জা হচ্ছে। এই লজ্জা সে রাখবে কোথায়!
গ্রামের নামকরা সাহসী মেয়ে এত ভীতু, এই লজ্জা ঢাকতে সে জোর গলায় হেসে কাকলির সঙ্গেই হস্টেলে ঢোকে!
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)