বাতায়ন/নাসির ওয়াদেন
সংখ্যা/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/২রা আষাঢ়, ১৪৩৩
নাসির ওয়াদেন সংখ্যা
| ছোটগল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
বসন্ত
চলে গেছে
"জান না আমার হাই ব্লাড প্রেশার উনুনের তাতে যেতে ডাক্তার বারণ করেছেন। আমার মেয়েটা এসেছে তাই একটু বেশি রান্না হয়েছে। তাতেই একেবারে শ্বশুরের দরদ উথলে যাচ্ছে কই আমার বেলা তোমার এত দরদ কোথায় ছিল?"
চিত্রাদেবী লিখতে বসেছেন
জীবনের ফেলে আসা কিছু কথা, যা হয়তো অনেকবার
বলতে চেয়েও বলতে পারেননি তার স্বামীর মুখের দিকে চেয়ে। মানুষটা বড় ভাল ছিলেন, আর ভাল ছিলেন তার
শ্বশুরমশাই। প্রতিদিন জলখাবারের টেবিলে ছোটখাটো খণ্ডযুদ্ধ বাধাবেই আর এই যুদ্ধটা
বাধাতেন তার শাশুড়ি মনোরমাদেবী।
চিত্রাদেবী বেশির ভাগ দিন
সকালে ডিম-টোস্ট রাখতেন, মাঝেমধ্যে লুচিও
করতেন, প্রত্যেক রবিবার তো লুচি নয়
পরোটা নানারকমের কচুরি ইত্যাদি কারণ শনি-রবিবার তার ছুটি ছিল তাই রান্নাঘরে একটু
বেশি সময় দিতেন। কারণ অন্যদিনগুলোয় তার স্কুল থাকত, তিনি একটি সরকারি হাই স্কুলে পড়াতেন, ১১টার সময় বেরিয়ে যেতেন। তাই সকালের জলখাবার আর রান্না একটু
সংক্ষেপে করতে চাইতেন। তারজন্য যতরকমভাবে প্রেশার দেওয়া যায়
চেষ্টা করতেন। শ্বশুরমশাই বলতেন,
-আরে আর কতক্ষণ রান্নাঘরে সময় দেবে মেয়েটা ও তো তৈরি হয়ে
স্কুলে যাবে! এবার ছাড় ওকে বাকি যা আছে তোমরা করে নাও।
শাশুড়ি চিৎকার করে উঠতেন,
-জান না আমার হাই ব্লাড প্রেশার উনুনের তাতে যেতে ডাক্তার বারণ
করেছেন। আমার মেয়েটা এসেছে তাই একটু বেশি রান্না হয়েছে। তাতেই একেবারে শ্বশুরের
দরদ উথলে যাচ্ছে কই আমার বেলা তোমার এত দরদ কোথায় ছিল?
-তোমার বেলা আমার যতদুর মনে পড়ে আমার মা তোমাকে নিয়ে একসাথে
জলখাবার খেতে বসতেন কলা-দুধ ভালবাসতে নিয়ম করে জলখাবারের সময় দুধ আর কলা দিতেন, আর তুমি ফিরেও দেখ না মেয়েটা কী খায়! অর্ধেক
দিন তার খাওয়া হয় না।
-তা খায় না কেন? আমি কি খেতে বারণ
করেছি?
-না বারণ করনি
কিন্তু সমানে এটা কর সেটা কর করে হুকুম চালিয়ে যাও, ওর সরকারি স্কুলে চাকরি, সময় মতন না যেতে পারলে ওর কতটা ক্ষতি হবে।
-তবে চাকরি
ছেড়ে দিক, আমার মেয়ে তো চাকরি
করে না।
-তোমার মেয়ের
চাকরি করার যোগ্যতা নেই, বিএ ফেল, গান শেখাবার এত চেষ্টা করলাম তাও শিখল না। শুধু বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা
দিয়ে আর স্টাইল করে সিনেমা দেখে জীবন কাটাচ্ছে। শ্বশুরবাড়িতেও কোনরকম কাজ জানে না
বলে প্রায় অভিযোগ শুনতে হয়, ওকে শাসন করতে গেলে হইচই শুরু করে
দিতে, যেন আমার সৎ মেয়ে। আর এখন
তুমি খুব ভাল করে জান দোতলাটা ছেলেটা সম্পূর্ণ নিজের টাকায় করেছে, আমার সামান্য পেনশন,
বউমার
চাকরির মোটা অংশ সংসারে খরচ হয় সে হিসেব রাখ?
আগের দিন তার ননদ এসেছিল, মনোরমাদেবী সব ভুলে বউমাকে অর্ডার করলেন,
-আজ জলখাবারে
লুচি বানাও বউমা মিঠুটা এসেছে অনেকদিন পর।
হঠাৎ অবাক হয়ে স্বামী রঞ্জন
প্রশ্ন করল,
-অনেকদিন পর? আমার তো মনে পড়ছে মাত্র পনেরো দিন আগে ও শ্বশুরবাড়ি গেল
প্রায় একমাস থেকে, মা ওকে এভাবে
প্রশ্রয় দিও না, মন দিয়ে শ্বশুর ঘরটা
অন্তত করতে বল, জীবনে তো কিছুই শিখল না, এরকম হুট করে চলে এলে যদি অনন্ত ডিভোর্স ফাইল করে? এখানে বসিয়ে দিয়ে যায়?
তখন কী হবে একবার
ভেবে দেখেছ? আর লুচি হবে না, দুদিন অন্তর তোমার মেয়ে আসবে আর চিত্রাকে দিয়ে এতরকম রান্না
করাও এ আর আমি মেনে নিতে পারছি না, কাল সারারাত ও মাথার
যন্ত্রণায় ছটপট করেছে আর বমি করেছে তাই ওকে আমি আর বাবা কড়া করে বলে দিয়েছি যে
সকালে হয় দুধ-চিঁড়ে-কলা নয় টোস্ট আর ডিমসেদ্ধ আর দুপুরে ডাল সেদ্ধ
আর মাছের ঝোল হবে এর চেয়ে আর একটা বেশি কিছু হলে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না আমি বলে দিলাম।
অনেক অভিমান ছিল স্বামীর ওপর
যে কখনও কোন প্রতিবাদ করে না, সারাদিন ক্লান্তিতে
চিত্রা শারীরিক মিলনেও ভাল করে সারা দিতে পারে না তবু তার মধ্যেও চিত্রা
অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে ফলে গতকাল রাতের অত অসুস্থতা। মেয়ের ঘরে এখনও কোন সুখবর কানে
আসেনি, আসবে কী করে অর্ধেক
দিন বাপের বাড়ি পড়ে থাকলে বাচ্চাটা আসবে কী করে? চিত্রার ভাল খবর শুনে খুব খুশি হলেন। একটা রান্নার লোকও আনা
হল। রাতের বেলায় রঞ্জন চিত্রাকে কাছে টেনে এনে আদরে ভরিয়ে দিয়ে বলছিল,
-নিজের প্রতিবাদটা নিজেকেই করতে হয়ে বুঝেছ, আমি অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করেছিলাম তোমার প্রতিবাদের, কিন্তু কোথায় কী, যত রাগ আমার ওপর রাতে
শুতে এসে। পিছন দিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়লেন। এই যে রান্নার লোক বহাল হল তা থাকবে, বাচ্চা হবার পরও তো অনেক কাজ থাকবে নবজাতকের জন্য সব
সামলাবে কী করে? আমারও একটা প্রমোশন
হওয়ার কথা আছে সেটা হলে মাইনেটা অনেকটা বাড়বে বুঝেছ?
-হ্যাঁ তা নাহয়
বুঝলাম, তাতে কী হল?
-তাতে? তুমি বেশ কিছুদিন স্কুলে যাবে না? আর ক্লান্ত হয়েও পড়বে না।
-তারপর?
-তারপর কী দেখবে? দাঁড়াও দেখাচ্ছি।
রঞ্জন দুহাতের আলিঙ্গনে
চিত্রাকে কাছে টেনে নেয়।
-উফ্ তুমি না।
-আমি না কী?
-ভীষণ দুষ্টু।
-যে কদিন
পুচকেটা না আসে, একটু দুষ্টুমি করে নিই তারপর তিনি
এলে তো সব মনযোগ সেই দিকেই পড়বে। তখন তো ভুলেই যাবে যে আসল অবদানটা আমার।
-না বাবা ভুলব না, ভুললে তো আর আমার রক্ষা থাকবে না।
-মনে থাকে যেন।
-মনে না থেকে
আর উপায় আছে!
বহুদিন পর একটা সুন্দর মিষ্টি
রাত কাটিয়েছিলেন রঞ্জন আর চিত্রা। তাদের একমাত্র সন্তান নবাংশু বাবার আদর বেশিদিন পায়নি। ওর যখন
১২ বছর বয়স রঞ্জন চলে যায় না ফেরার দেশে। কিডনি ফেল করেছিল, মাত্র একমাসের মধ্যেই সব শেষ। ধরতে পারেননি ডাক্তার, যখন ধরা পড়ল তখন আর কিছু করার ছিল না। চিত্রার দু চোখে জলের
ধারা। আজ তার মৃত্যুদিন, মনে মনে খুব বকছে
তাকে, খুব স্বার্থপর তুমি, কেমন আমাকে একা করে দিয়ে সব বোঝা চাপিয়ে চলে গেলে! মনে পড়ল
একবার জন্মদিনে এই ভাল ডায়েরিটা আর ভাল পেন দিয়ে বলেছিল,
-তুমি যখন একা থাকবে তখন লিখবে, দেখবে একদিন তুমি অনেক নাম করা লেখিকা হবে, লেখা জীবনের অনেক না পাওয়াকে ভুলিয়ে দেয়, তুমিও লেখার মধ্যে দিয়ে জীবনের প্রথম লগ্নে না পাওয়াকে ভুলে
যাবে, তোমার ডায়েরির পাতায় শুধু
আমার নাম জ্বলজ্বল করবে, ‘রঞ্জন'।
-সত্যি রঞ্জন, তোমার নাম শুধু ডায়েরির পাতায় না আমার বুকের মাঝেও জ্বলজ্বল
করছে। তুমি চলে গিয়েছিলে এই বসন্তকালে,
আমার
বসন্ত সেদিনই চলে গেছে তোমার সাথে জীবনের সব রং মুছে দিয়ে। তোমার স্বপ্ন সার্থক
হয়েছে রঞ্জন, তুমি আমার লেখা দেখে বারবার
বলতে,
-দেখ তুমি একদিন অনেক বড় লেখিকা হবে।
-হ্যাঁ রঞ্জন
আমি তোমার স্বপ্ন সফল করতে পেরেছি। এই বসন্তকালে আমার জীবনের সব রং মুছে দিয়ে
আমাকে একলা নিঃস্ব করে দিয়ে চলে গিয়েছিলে আর এই বসন্তকালেই
প্রকাশিত হল আমার প্রথম বই, ‘রঞ্জন ও রঞ্জনা’, তোমার ইচ্ছের হাত ধরেই আমার বই প্রকাশ পাচ্ছে। বসন্ত চলে
গিয়েও ফিরে আসছে তোমার হাত ধরে। আমাকে একা করে দিয়েও তোমার ইচ্ছের জয় হল। তোমার
ইচ্ছেকে আমি মর্যাদা দিতে পেরেছি। এখন থেকে শুধু এইটুকু পাওনা নিয়ে দিন কাটাব, এ পাওনাটা তুমি আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।
~~000~~
No comments:
Post a Comment