প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

অতল তল | তাপসকিরণ রায়

বাতায়ন/শারদীয়া/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ছোটগল্প
তাপসকিরণ রায়
অতল তল

হঠাৎই ঘরের বাতাসটা ভারী হয়ে এল। সমস্ত স্মৃতি দূরে সরে গেল। রমাকান্ত অনুভব করলেন তাঁর ডান হাতে একটি পরিচিত, উষ্ণ স্পর্শ। মাধবী কাছেই বসে আছে, তাঁর হাতটি নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরে।

 
জীবনপ্রদীপের শিখাটা যখন নিভে আসার উপক্রম হয়, মানুষ তখন আর বর্তমানে বাঁচে না। আজ আশি ছুঁই-ছুঁই রমাকান্তবাবুও শুয়ে আছেন, মৃত্যুর একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। তাঁর শরীরের শিরা-উপশিরায় চলাচলের গতি শ্লথ, বুকটার ওঠানামা ভারী। ঘরের বাতাসজুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। কিন্তু তাঁর বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠছে স্মৃতির অনন্ত সমুদ্র। সময়ের স্রোত থমকে গিয়ে তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক অটল, অলৌকিক তলের দিকে।

শৈশবের দিনগুলো এক অদ্ভুত মায়াবী আলোয় রমাকান্তের মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই ছোটবেলার গাঁয়ের মেঠো পথ, বর্ষার দিনে নতুন জল ওঠা ডোবায় বন্ধুদের সাথে ঝাঁপিয়ে পড়া, আর মায়ের আঁচলের চেনা সুবাস। মনে পড়ে যাচ্ছে পকেটে দুটো ভাঙা মার্বেল আর কাঁচা আম নিয়ে বৈকালের রোদে দিগন্তজোড়া মাঠে ছুটে চলার দিনগুলোর কথা। কী নিষ্পাপ, কী নিশ্চিত ছিল সেই সময়গুলো! দারিদ্র্য হয়তো ছিল, কিন্তু কোনো ক্লান্তি ছিল না, হারানোর ভয় ছিল না। মনে হচ্ছে, এই তো সেদিনের কথা—মা যেন দূর থেকে তাঁর নাম ধরে ডাকছেন, “রমা, ও রমা! ঘরে আয়, সন্ধ্যা নামল!” জীবনের সমস্ত প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির ভিড়ে সেই পুতুলখেলার মতো শৈশবটাই যেন রমাকান্তের একমাত্র খাঁটি সঞ্চয় হয়ে রয়ে গেল।
 
স্মৃতির নদী আরও কিছুটা এগিয়ে এসে থামল মাধবীর হাসিতে। মাধবী—তাঁর জীবনের আলো, তাঁর অর্ধাঙ্গিনী। নতুন বিয়ের পর সেই ফুটফুটে মাধবীর কথা মনে পড়তেই জীর্ণ রমাকান্তের ঠোঁটের কোণে মৃদু এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
-শুনছ, তোমার ওই মোটা চশমার কাচ দিয়ে জগতটাকে না দেখে আমার দিকে একটু তাকাও তো!
মাধবী প্রায়ই অভিমানী সুরে বলত। রমাকান্ত চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে গম্ভীর গলায় উত্তর দিতেন,
-বইয়ের পাতায় যে জ্ঞান আছে মাধবী, তা তোমার এই অবুঝ চোখে কোথায় পাব?
মাধবী তখন রেগে গিয়ে এক গ্লাস চা সামনে ঠক করে নামিয়ে রেখে বলত,
-বেশ, তবে বইয়ের সঙ্গেই চা-টা খাও! আজ আর তোমার সাথে কোনো কথা নেই।
কিন্তু তিন মিনিটের বেশি সেই মৌনব্রত টিকত না। খানিক পরেই মাধবী এসে চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলত,
-সত্যি, তুমি একেবারে নিরস একটা কাঠখোট্টা মানুষ!
পান থেকে চুন খসলেই স্ত্রীর সেই খুনসুটি, কৃত্রিম রাগ, আর পরক্ষণেই একবুক ভালবাসা দিয়ে সবকিছু ভুলিয়ে দেওয়া—আজও কতটা জীবন্ত! সেই রঙিন দিনগুলোর স্মৃতি যেন বৃদ্ধ রমাকান্তের হৃদয়ে এক মিষ্টি ব্যথা জাগিয়ে তোলে।
 
হঠাৎই ঘরের বাতাসটা ভারী হয়ে এল। সমস্ত স্মৃতি দূরে সরে গেল। রমাকান্ত অনুভব করলেন তাঁর ডান হাতে একটি পরিচিত, উষ্ণ স্পর্শ। মাধবী কাছেই বসে আছে, তাঁর হাতটি নিজের দুই হাতের মুঠোয় চেপে ধরে। মাধবীর চোখে জল, কিন্তু সেই স্পর্শে লুকিয়ে আছে জীবনের শেষ অঙ্গীকার। মাধবীর এই শেষ স্পর্শটুকুই রমাকান্তকে এই মর্ত্যভূমির সাথে বেঁধে রেখেছিল। তিনি একবার শেষ চেষ্টা করলেন চোখ দুটো খোলার, কিন্তু চোখের পাতা দুটো ভীষণ ভারী হয়ে এসেছে। মাধবীর হাত থেকে ধীরে ধীরে নিজের আঙুলগুলো আলগা হয়ে যেতে লাগল।
 
ঠিক তখনই ঘরের এক কোণে ছায়ার মতো অন্ধকার ঘনীভূত হলো। রমাকান্ত দেখতে পেলেন, এক বিশাল, গম্ভীর আকৃতি—মৃত্যুর দূত বা যমদূত এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর শিয়রে। ভয়ে নয়, এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে তাঁর ভেতরটা ভরে উঠল। আর তাঁর চারপাশ ঘিরে ফুটতে শুরু করল অজস্র অচেনা-চেনা অবয়ব। বহু বিদেহী আত্মা, যাঁরা হয়তো অনেক আগেই পার হয়ে গেছেন এই জীবনের সীমা, তাঁরা উঁকি মেরে দেখছেন রমাকান্তের এই শেষ যাত্রা। তাঁদের চোখে কোনো হিংসা নেই, আছে এক গভীর ব্যাকুলতা আর অভ্যর্থনার আমন্ত্রণ। রমাকান্ত বুঝলেন, মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে এবার তাঁকে পাড়ি দিতে হবে সেই অচিন অটল তলে। পৃথিবীর সমস্ত আলো ধীরে ধীরে নিভে গেল, রয়ে গেল শুধু এক অনন্ত শান্তির নীরবতা।
 
মৃত্যুর ওপারে পাড়ি দিয়েও যেন পুরোপুরি শেষ হওয়া হলো না রমাকান্তের। বৈদিক তত্ত্ব কিংবা স্বামী অভেদানন্দের ‘মরণের পার’ বইটিতে যা পড়েছিলেন, আজ তার মুখোমুখি তিনি। শরীর নিথর হলেও এক সূক্ষ্ম চৈতন্য নিয়ে তিনি এসে পৌঁছেছেন এক অদ্ভুত কল্পলোকে—যেখানে তিনি নিজেই এক রূপান্তরহীন আত্মা।
 
এ এক একাকী কিন্তু স্পন্দনশীল জগৎ। ভেবেছিলেন মৃত্যুর পর সব কামনা-বাসনা শান্ত হয়ে যাবে, কিন্তু আশ্চর্য! পৃথিবীর মতোই এখানেও তীব্র হয়ে বেঁচে আছে রাগ, ঈর্ষা, একাকীত্ব, কান্না আর অনুভূতির সূক্ষ্মতম ছোঁয়া। সবটাই অবয়বহীন, অথচ হৃদয়ের গভীরে প্রগাঢ়।
 
এই রূপ অরূপের মাঝে, নিজের মনের এক গভীর নির্জনতায় তিনি গড়ে তুললেন মায়াবতীকে—তাঁর কল্পনার এক মানসপ্রতিমাকে। এক মায়াবী সন্ধ্যায় কল্পলোকের মেঘলা আলোয় মায়াবতীর আঙুল এসে ছুঁয়ে গেল রমাকান্তের অশরীরী হাত। মায়াবতী মৃদু হেসে বলল,
-এখানেও তুমি একা রমাকান্ত? আমাকে তবে কেন সৃষ্টি করলে?
রমাকান্ত অনুভবে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
-পৃথিবীর মায়া কাটলেও, ভালবাসার তৃষ্ণা তো মেটেনি!
দুজনে মিলে সেখানে এক অলৌকিক প্রেমের মেলায় ভেসে গেলেন—যেখানে কোনো পার্থিব বাধা নেই, শুধু রয়েছে দুটি আত্মার নিবিড় শিহরণ।
 
কিন্তু এই ক্ষণিকের ফ্যান্টাসিও রমাকান্তকে বেশিদিন বেঁধে রাখতে পারে না। পৃথিবীর মায়া আর এই কল্পলোকের বাসনার টানাপোড়েনে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝতে পারেন—আত্মা হওয়া সত্ত্বেও মানুষের চিরাচরিত আশা-আকাঙ্ক্ষা তাঁকে আজও তাড়া করে ফিরছে। এক অটল তল থেকে আরেক অজানার অভিমুখে তাঁর এই অনন্ত যাত্রা চলতেই থাকে।
 
জীবনের ওপারে পাড়ি দিয়েও যেন পুরোপুরি শেষ হওয়া হলো না রমাকান্তের। মৃত্যুর অটল তল থেকে এক অদ্ভুত টানে তিনি আবার মর্ত্যে—অর্থাৎ পৃথিবীর মতো এক চেতনার জগতে ফিরে এলেন। না, রক্তমাংসের শরীরে নয়, আর না সাধারণ প্রেতাত্মা হয়ে। স্বামী অভেদানন্দের ‘মরণের পরে’ বইতে পড়েছিলেন যে মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায় না, আজও যেন সেই পরম সত্যের মুখোমুখি তিনি। এ এক মায়াবী কল্পলোক। ভেবেছিলেন দেহ ছাড়লে সব মিটে যাবে, কিন্তু আশ্চর্য! মর্ত্যের মতোই এখানেও প্রগাঢ় হয়ে বেঁচে আছে মানুষের চিরন্তন রাগ, হিংসা, কান্না, আশা আর অবাধ্য বাসনা।
 
কিন্তু এই ক্ষণিকের ফ্যান্টাসিও তাঁকে ধরে রাখতে পারল না। মর্ত্যের চেনা অনুভূতি আর কল্পলোকের মায়াজালে দাঁড়িয়ে রমাকান্ত বুঝলেন—দেহহীন হয়েও বাসনার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ নয়। এক অনন্ত চেতনার টানে আবার শুরু হলো তাঁর অলৌকিক পথচলা। ভাসতে ভাসতে একদিন রমাকান্ত নিজের সেই চেনা ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। কিন্তু দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢুকতেই তাঁর অশরীরী বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।
 
সামনে রাখা তাঁর প্রিয় কাঠের বইয়ের আলমারিটা একবারে ফাঁকা! একটা বইও নেই সেখানে। কোথায় গেল তাঁর বহু বছরের প্রিয় সঙ্গীগুলো? পরম মমতায় জমিয়ে রাখা সেই সাহিত্য, দর্শন, কাব্যগ্রন্থ? গভীর এক হাহাকার এসে বিঁধল তাঁর চেতনায়। তিনি অনুধাবন করলেন, এই দ্রুতগতির যুগে পুরনো কাগজের বই পড়ার লোক আর কে-ই বা আছে! বর্তমান প্রজন্ম তো বাংলা ভাষার চর্চা ও রস আস্বাদন করতেই ভুলে গেছে। তাই হয়তো অব্যবহার আর অবহেলায় সেই পরিত্যক্ত বইগুলো আজ সময়ের পেটে চলে গেছে, পরিণত হয়েছে ধূলিকণায়। রেডিয়োটাও সময়ের ব্যবধানে অযত্নে ধুলো জমে, ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে রয়েছে ঘরের এক কোণে।
 
এক গভীর দুঃখের ঢেউ আছড়ে পড়ল তাঁর মনে। একসময় এই ঘরটাতেই বসে তিনি কত রাত জেগে লেখালেখির কাজ করতেন! টেবিলল্যাম্পের হালকা আলোয় তাঁর ভেতরের জগতে তৈরি হতো কত শত চরিত্র, হাজারো গল্পের রূপরেখা। সেইসব সৃষ্টিশীল মুহূর্তে রমাকান্ত নিজেই যেন হয়ে উঠতেন তাঁর নিজেরই তৈরি কাল্পনিক জগতের এক বীর নায়ক—কখনও বিরহী প্রেমিক, কখনও বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রতিবাদী যোদ্ধা। কালির প্রতিটি আঁচড়ে তিনি নিজের আত্মাকে ঢেলে দিতেন, শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে জীবনকে নতুন রূপ দিতেন। আজ সেই চেনা লেখার টেবিলটা খাঁ খাঁ করছে, স্মৃতির পাতায় জমেছে শুধুই বিষাদের ধুলো।
 
শুধু বই বা রেডিয়ো নয়, তাঁর ব্যবহৃত প্রায় প্রতিটি জিনিসই ঘর থেকে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। স্ত্রীর স্পর্শ, সন্তানের কোল, সংসারের কোলাহল—সব যেন ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা এক একটা লাইন। শূন্য ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে অশরীরী রমাকান্ত মনে মনে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নিজেকেই সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “এমনটাই তো হওয়ার কথা ছিল। যা কিছু নশ্বর, তা একদিন মুছে যাবেই। মর্ত্যের মায়াজালে তো চিরদিন কিছু আটকে থাকে না।”
 
পৃথিবীর ছাঁচ থেকে বেরিয়ে এসে রমাকান্ত বুঝলেন, এই জগতে সুখ, দুঃখ কিংবা গভীর ব্যথা—সবই তো আসলে মনেরই সৃষ্টি। কিন্তু জীবদ্দশার জমে থাকা মায়া আর মনের সংস্কার মুছে গিয়ে রূপান্তর ঘটতে যে কতটা সময় লাগে!
 
অবশেষে আসে সেই মুহূর্ত—সব কিছুর বিনাশ, সব বাসনার সম্পূর্ণ বিলয়। পুরনো চেতনার লয় ঘটিয়ে ফুটতে শুরু করে এক নতুন জীবনের নবাংকুর। পরম শান্তির সেই ক্ষণে মাতৃগর্ভের অন্ধকারে ঘনিয়ে আসে এক দীর্ঘ, নিশ্চিন্ত জ্ঞানশূন্যতা। মুছে যায় রমাকান্ত নামটা, মুছে যায় পুরনো জীবনের সমস্ত স্মৃতির ধূলিকণা।
 
তারপর... এক অজানা আলোয় চোখ মেলে নতুন আরেকটা জীবন, নতুন আরেকটা পথচলা। জন্ম আর মৃত্যুর এই চিরন্তন খেলা, এই অটল তলের ঘূর্ণলয় এভাবেই অনবরত চলতে থাকে—অবিরাম, অনন্তকাল ধরে।
 
~~000~~
 

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)