বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
মনোজ চ্যাটার্জী
আয়লারে সরলা
[১ম পর্ব]
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
মনোজ চ্যাটার্জী
আয়লারে সরলা
[১ম পর্ব]
ডবকা বৌদি শুনে সুন্দরী সরলা একবার বেদো ছোঁড়াগুলোর দিকে না তাকিয়ে থাকতে পারে না। রহস্যময়ীর মতো তাকিয়ে হ্যান্ডসাম ছেলেগুলোকে পটাস করে চোখ মেরে দিয়েই আবার ছুটতে থাকে।
-কী রে মাগী, মরার শখ হয়েছে তো বিষ খা গা না, আমার গাড়ির তলায় মরতে এসছিস কেন? যত শালা উজবুক গাঁইয়া মাল পয়সার জন্য কলকাতায় গতর বেচতে চলে এসেছে।
সরলার বুকের ভেতরটা একবারে ভয়ে গুড়গুড়িয়ে গিয়েছিল। একটু সামলাতেই, শয়তান ড্রাইভারের চোদ্দোগুষ্টি উদ্ধার করতে যাচ্ছিল, ঝট করে নিজেকে সামলে নিয়ে কোনো উত্তর না দিয়ে আবার ছুটতে শুরু করে। সাতটা দশের ট্রেনটা ধরতেই হবে। নাহলে বাবুসোনা না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। প্রায় হাফবেলা না খেয়ে থাকবে। সকালে মায়ের সঙ্গে দেখা হয় না। ভোর সাড়ে চারটেয় সরলাকে বেরোতে হয়, সকাল আটটার থেকে বাইপাসের হসপিটালে আয়ার ডিউটি। রাতে মা’কে না দেখলে পরের দিনও অভিমানে খুব খিদে না পেলে তেমন কিছু খাবে না। আদাড়েবাদাড়ে ঘুরে বেড়াবে। চারবছরের শিশু কোথায় কী হবে, সে খুব ভয়ে ভয়ে থাকে। বিগবাজারের কাছে স্টেশন যাওয়ার টোটো থাকে। তবে এইটুকুর জন্য রোজ কুড়ি টাকা দিলে, বাবুর জন্য আর কী থাকবে। যাইহোক বিগবাজারটা পেরিয়ে কলেজের কাছে ডানদিকে ঘুরতেই সামনে দেখতে পায় কয়েকজন ইয়ং ছেলে ছুটছে। ট্রেন ধরার জন্য। সরলা আরো গতি বাড়িয়ে দেয়।
-দ্যাখ দ্যাখ ডবকা বৌদি, কেমন ছুটছে দ্যাখ। লেবার ছোঁড়াগুলোর আগেই ট্রেন পেয়ে যাবে।
রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে কটা কলেজ স্টুডেন্ট আড্ডা মারছিল।
-এরা যদি সাত-আট বছর থেকে ট্রেন ধরত, ইন্ডিয়া পি টি উষা, হিমা দাসের চেয়ে বড় অ্যাথলিট পেয়ে যেত। নাম হত দোয়ানিয়া সুপারফার্স্ট।
ডবকা বৌদি শুনে সুন্দরী সরলা একবার বেদো ছোঁড়াগুলোর দিকে না তাকিয়ে থাকতে পারে না। রহস্যময়ীর মতো তাকিয়ে হ্যান্ডসাম ছেলেগুলোকে পটাস করে চোখ মেরে দিয়েই আবার ছুটতে থাকে।
-কী ডেন্জারাস বৌদি মাইরি।
কৈশোরিক উচ্ছলতার স্নিগ্ধনবীন সবুজতায় রোমান্সের লাল গোলাপের আভাস লাগে।
যায় এদিকে এলে। বহুদূর বিস্তৃত সবুজ ধানজমি নয়, গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের একেবারে দক্ষিণের এই সব গ্রামে বাতাসে মোহনা ও সমুদ্রের গন্ধ পাওয়া যায়। গ্রাম থেকে মাইল চারেক দূরে নদী মোহনায় বিস্তারিত হতে শুরু করেছে। শক্তিশালী দূরবীন ছাড়া এপার থেকে ওপারের কোন চিহ্ন দেখা যায় না। একঘেয়ে গতানুগতিক জীবনে অবসাদগ্রস্ত শহরের মানুষ এখানে এলে নতুন উদ্দীপনায় পুনর্জাগরিত হয়। কিন্তু এখানের মানুষের কাছে সেই চারপাশে ভেড়ি আর ভেড়ি। ছোট-মাঝারি খাড়ির মাঝে বসবাসের স্বল্পবিস্তীর্ণ ভূমি। বিচ্ছিন্ন কিছু ধানজমি যেন মানুষের কাছে আশাবাদের স্নিগ্ধ ছোঁয়া দেয়। হোগলা, হেঁতাল, খলসী, হরগোজার ঝোপঝাড়ে বিষাক্ত সরীসৃপের আনাগোনা চলে। এই পরিবেশের প্রতিকুলতায় জটিলতা কূটিলতার আবাদ চলে, স্বচ্ছ সরল জীবন হারিয়ে যায় বেঁচে থাকার কাঠিন্যের মাঝে। তবু অনেক চেষ্টার পর মানুষ পায়ের তলার মাটি যখন একটু শক্ত করে, কোথা থেকে ধেয়ে আসে ভয়ংকর ঘুর্ণিঝড়, উথালপাতাল করে দেয় ঘরসংসার, অপ্রত্যাশিত কঠিন সংকটে মানুষের চোখের জলে নদীমোহনা বিস্তারিত হয়।
কিন্তু শ্বশুরমশাই জেদি আত্মবিশ্বাসী মানুষ। তিনি কিছুতেই বাড়ি ছেড়ে যেতে চাইলেন না।
-বৌমা, তোমরা যতই বোঝাও, আমি তো জীবনে কম ঝড় দেখলাম না, অনিল, আকাশ, নার্গিস, বুলবুল। প্রত্যেকবার সাবধান করে, শেষে বাংলাদেশের দিকে চলে যায় বা তার আগেই তেজ কমে যায়। তাছাড়া আশ্রয়শিবিরে থাকা আর নরকে থাকা একই। বাবুসোনাকে যদি বিষাক্ত রোগজীবাণু ধরে, সেটাও কম রিস্ক নয়। আমাদের ঘর অনেক উচুতে, কোনদিন জল ঢোকেনি আমার চারপুরুষে।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment