বাতায়ন/শারদীয়া/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ছোটগল্প
অন্বেষা সরকার
স্মৃতি
নাম বলবি না? আমরা কি জানি না? মালবিকা! তুই ওর জন্য রবীন্দ্রনাথের কবিতা মুখস্থ করেছিলি। সবাই একসঙ্গে হেসে উঠল। রমেন বাবুও শেষে হেসে ফেললেন।
চায়ের
ধোঁয়া, হুকোর টান আর চার
বন্ধুর বিকেল। মফস্সল শহরটার নাম ছিল
মধুবনপুর। শহর বললে আজকের দিনের চোখে হয়তো অনেকে হাসবে; বরং তাকে বড়সড় একটা জনপদ বলাই ভাল। লাল কাঁকরের রাস্তা, দু'ধারে কৃষ্ণচূড়া আর
রাধাচূড়ার সারি, শেওলা ধরা
জমিদারবাড়ির ভাঙা বারান্দা,
পুরনো
পোস্ট অফিস, ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়
এমন এক শিবমন্দির, আর একটু দূরেই বয়ে
চলেছে ধীরস্থির কপোতাক্ষ নদ। বিকেলের দিকে নদীর দিক থেকে হালকা বাতাস এসে শহরের
চায়ের দোকানগুলোর ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত ঘ্রাণ তৈরি করত। স্টেশন
রোডের মোড়ে ছিল হরিদাসের বিখ্যাত চায়ের দোকান। বাঁশের বেড়া, টিনের চাল, সামনে লম্বা কাঠের বেঞ্চ, কোণে একটা পুরনো হুকো, কাচের বয়ামে বিস্কুট আর
নিমকি। সন্ধ্যার আগে দোকানটা যেন শহরের ছোট সংসদে পরিণত হতো।
সেই
দোকানের বেঞ্চে আজও পাশাপাশি বসে আছেন চারজন পুরনো বন্ধু—রমেন বাবু, কিশোর বাবু, শাহিদ বাবু আর সামাদ বাবু।
বয়স সত্তরের কাছাকাছি, কিন্তু একসঙ্গে বসলে
যেন আবার স্কুলের ছেলেতে পরিণত হন। রমেন বাবুর হাতে সিগারেট, কিশোর বাবু হুকোয় টান
দিচ্ছেন, শাহিদ বাবু ধোঁয়ার
রিং বানানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছেন আর সামাদ বাবু চায়ের কাপ হাতে মুচকি হেসে সবার
কথা শুনছেন।
হরিদাস
গরম চা এনে বলল,
— দাদারা, আজ আবার শুরু হোক পুরনো দিনের
আদালত!
রমেন
বাবু হেসে বললেন,
— এই আদালতে সবাই দোষী। কেউ প্রেমে
হেরেছে, কেউ পরীক্ষায়, কেউ আবার নিজের সাহসে।
চারজনেই
হো হো করে হেসে উঠলেন।
— মনে আছে আমাদের স্কুলের কথা? সেই সাদা হাফশার্ট, নীল প্যান্ট, কাঁধে ক্যানভাস ব্যাগ।
বর্ষায় হাঁটু পর্যন্ত কাদা মাড়িয়ে স্কুলে যেতাম।
— আর টিফিনের সময় মাঠে ফুটবল!
বল না থাকলে জামা গুটিয়ে বানানো বল দিয়েই খেলা।
— সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে
বটগাছটার কথা। পরীক্ষার আগের দিন সবাই বই খুলে বসতাম, কিন্তু পড়ার থেকে গল্পই বেশি হতো।
রমেন
বাবু সিগারেটে টান দিয়ে একটু দূরে তাকিয়ে বললেন,
— আর মনে আছে আমাদের দল? অমল, নরেশ,
গোপাল, শিবু, নির্মল,
বিমল, আব্বাস, প্রদীপ—কত নাম! আজ কে কোথায়
আছে, কে জানে!
এক
মুহূর্তের জন্য চারজনই চুপ করে গেলেন।
— আচ্ছা, প্রেমের গল্প বলবি?
— এই তো শুরু হলো! রমেনের নাম
আগে লিখে রাখ।
রমেন
বাবু ভান করে রেগে গেলেন।
— আমার কী হয়েছে?
— সবার আগে তোকে দেখেছি
লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন অপেক্ষা করতে।
— মেয়েটার নাম কী যেন?
— নাম বলব না।
শাহিদ
বাবু হেসে উঠলেন।
— নাম বলবি না? আমরা কি জানি না? মালবিকা! তুই ওর জন্য রবীন্দ্রনাথের
কবিতা মুখস্থ করেছিলি।
সবাই
একসঙ্গে হেসে উঠল। রমেন বাবুও শেষে হেসে ফেললেন।
— চিঠি লিখেছিলাম ঠিকই, কিন্তু সাহস করে দিতে পারিনি।
শেষে বইয়ের ভাঁজে রেখে বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম।
— আমার কাহিনি আরও করুণ। সাইকেল
নিয়ে প্রতিদিন একই রাস্তা দিয়ে যেতাম, যদি একবার দেখা হয়! একদিন দেখলাম, ওর বিয়ের শোভাযাত্রা বেরোচ্ছে।
— তুই সেদিন বাড়ি ফিরে তিন দিন
কারও সঙ্গে কথা বলিসনি!
আবার
হাসির রোল উঠল। সামাদ বাবু এবার নিজের গল্প বললেন।
— আমার তো প্রেম শুরুই হয়নি।
বন্ধুরা এত ভয় দেখাত যে, মেয়েদের সামনে
দাঁড়ালেই জিভ আটকে যেত।
— তা এখন?
— এখন নাতনির স্কুলে গিয়ে
শিক্ষিকাদের সঙ্গে দিব্যি গল্প করি!
হাসিতে
দোকানের অন্য খদ্দেররাও তাকিয়ে রইল।
— আমার একটা চিঠি কিন্তু
পৌঁছেছিল।
সবাই
একসঙ্গে অবাক।
— তারপর?
— উত্তরে লেখা ছিল—'তুমি ভাল বন্ধু হয়ে থাকো।'
চারজন
একসঙ্গে হেসে উঠলেন।
— এই কথাটাই পৃথিবীর সবচেয়ে
ভদ্র প্রত্যাখ্যান।
হরিদাস
আরেক দফা চা এনে দিল।
সূর্য
তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। রাস্তার
লাইট একে একে জ্বলছে। দূরে মসজিদের আজান ভেসে এল, কিছুক্ষণ পর মন্দিরের ঘণ্টাও বেজে উঠল। সন্ধ্যার বাতাসে কদম
ফুলের গন্ধ মিশে গেল চায়ের ধোঁয়ার সঙ্গে।
— জানো, আমরা তখন ভাবতাম প্রেমে হারলে জীবন শেষ। আজ মনে হয়, সেই ব্যর্থ প্রেমগুলো না থাকলে
এত সুন্দর স্মৃতিও থাকত না।
সামাদ
বাবু মাথা নাড়লেন।
— ঠিক বলেছ। মানুষ শেষ পর্যন্ত
স্মৃতি নিয়েই বাঁচে।
— আজ যদি আবার সেই মাঠে ফিরতে
পারতাম, আবার যদি স্কুলের
ঘণ্টা বাজত, আবার যদি সবাই
একসঙ্গে দৌড়ে যেতাম...
কিশোর
বাবু মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
— সময় ফিরে আসে না। কিন্তু
বন্ধুত্ব ফিরে আসে—এই চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে।
চারজনেই
শেষবারের মতো চায়ের কাপ তুলে একে অপরের দিকে তাকালেন।
হুকোর
ধোঁয়া ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠতে লাগল। সিগারেটের শেষ আগুনটুকুও নিভে এল। কিন্তু
তাদের হাসির শব্দ যেন মধুবনপুরের পুরনো রাস্তা, বটগাছ,
নদীর
ঘাট আর লাল কাঁকরের পথ জুড়ে বহুদিন ধরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকল।
সেদিনের
বিকেলটা যেন শুধু চার বন্ধুর আড্ডা ছিল না; ছিল একটি পুরো প্রজন্মের স্মৃতির পুনর্মিলন। সময় তাদের
চুলে রুপোলি রং লাগিয়েছে,
মুখে
ভাঁজ এঁকেছে, কিন্তু ছেলেবেলার
দুষ্টুমি, প্রথম ভাল লাগা, ব্যর্থ প্রেম আর অকৃত্রিম
বন্ধুত্বের উষ্ণতা একটুও মুছে দিতে পারেনি। মধুবনপুরের সেই ছোট্ট চায়ের দোকানে
বসে তারা যেন আবার ফিরে পেল হারিয়ে যাওয়া কৈশোরকে—চায়ের ধোঁয়া, সন্ধ্যার বাতাস আর হাসির
ফাঁকে।
~~000~~
No comments:
Post a Comment