প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

কে রবে পরবাসে | অদিতি চ্যাটার্জি

বাতায়ন/শারদীয়া/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
কে রবে পরবাসে

অনুরাধা বোঝাতে পারেননি বছরকার দিনে ভিটে অন্ধকার থাকবে, ঠাকুরের আসনে ধূপ-জল পড়বে না এই ভাবনাটা অস্থির করে তুলছে।

 
বেলা বারোটা পঁয়তাল্লিশের লালগোলা প্যাসেঞ্জারে জানলার ধারের সিটে গুছিয়ে বসলেন অনুরাধা, ছেলে ছোট ট্রলি ব্যাগটা বাঙ্কে তুলে দিল আর সিটের তলায় রাখল বড় ট্রলিটা। আড়চোখে শুভকে দেখছেন অনুরাধা, ছেলের মুখটা রাগে-অভিমানে থমথম করছে, বুকের ভেতরে ছোট্ট একটা পিঁপড়ের কামড় অনুভব করলেন বটে, তবুও অনুরাধার মনে ছেলের অভিমান বিশেষ রেখাপাত করল না। আশ্চর্য মানুষের মন।
 
-মা তোমার জিনিস সব সেট করে দিলাম, জলের বোতল আর হাতের ব্যাগটা সামলে রেখ, খিদে পেলে বিস্কুটটা খেও, আর রঞ্জনকে ফোন করে দিয়েছি স্টেশনে চলে আসবে, ওই এইসব লাগেজ নামাবে।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে যায় শুভ।
-তুই এইবার নাম, হর্ণ দিচ্ছে গাড়ি। নবমীতে আসবি তো?
মা-র গলায় কি আকুতি? কে জানে।
-দেখি।
এককথায় উত্তর দিয়ে নেমে যায়  শুভ।
 
ট্রেন চলছে ঝড়ের গতিতে, গাড়ির দুলুনি আর ঝমাঝম আওয়াজ অনুরাধাকে নিয়ে যাচ্ছে ছোটবেলায়। বর্ষার জলে ভরা মাঠ, সবুজ গাছপালা ছাপিয়ে অনেক দূরে তাকিয়ে অনুরাধা, নীল আকাশে থলোথলো সাদা মেঘ, মাঝে একটু ঘন কালো। এইরকম আকাশটা দেখতেন দাদামশাই-এর বাড়িতে যাওয়ার সময়। পুজোর ছুটিতে যখন দেবীপুর যেতেন। রেলগাড়ি চেপে লালগোলা, সেখান থেকে ভ্যানে ভৈরবের ঘাট। তারপর নৌকাতে চেপে বসা। নৌকায় চড়ে অনুরাধা, তাঁর ভাই আর দিদির সঙ্গে আকাশের দিকে থোপাথোপা সাদা মেঘের মধ্যে হিমালয় পর্বতকে দেখতেন। তবে ভাই খুঁজত ভাল্লুক কি শূর তোলা হাতি। নদীর পাড়ে, চড়ায় কাশের বন, তখনও পথের পাঁচালী সিনেমাটা দেখা হয়নি অনুরাধার। পরে সিনেমাটা দেখার সময় শুভর বাবাকে বলেছিলেন,
-এইরকম কাশের বন দেবীপুরে যাওয়ার সময় দেখেছি।
-আরে কাশ মা...
কিশোরী সহযাত্রীর ছোট্ট চিৎকারে ঘোর কাটে অনুরাধার, জানলা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখেন রেললাইনের ধারেও শরতের প্রকৃতি তার মণিমুক্তো ছড়িয়ে রেখেছে।
 
অনুরাধা চটিজোড়া খুলে সিটে জমিয়ে বসেন, কামরার দরজা বন্ধ, ওরা সবাই সিট রিজার্ভ করে যাচ্ছেন, তাই ফালতু ভিড় মোটেও কাম্য নয়। সবে নৈহাটি ছাড়ল ট্রেন, এখনো অনেকটা সময়। অনুরাধা চোখ বুজে হিসাব করতে থাকেন বাড়িতে গিয়ে কোন কোন কাজ সবার আগে করতে হবে। তিন দিন পর মহালয়া, ভট্টাচার্য-দাকে একটা খবর দিতে হবে। প্রতিবার নিজের বাড়িতেই তর্পণ করেন অনুরাধা। নিয়ম করে বাপের এবং শ্বশুরবাড়ির পূর্বপুরুষদের জল দেন, এর সঙ্গে অবশ্য সীমাকেও জল দিচ্ছেন, করোনা কালে ছেড়ে চলে গিয়েছিল অনুরাধার সই। শুভর তর্পণ করার সময় হয় না, ভবিষ্যতে অনুরাধা কি উত্তরপুরুষের কাছ থেকে জল পাবেন? ইদানীং এই কথাটা খুব মনে হয়। ধুস কী সব ভাবনা, বিস্কুটের প্যাকেটটা বের করেন ব্যাগ থেকে। খিদে পেয়ে গেছে, দশ'টার সময় দুমুঠো ভাত খেয়েছেন। জলের বোতলটা ব্যাগে রেখে আবারও অনুরাধা ভাবতে বসেন কী কী কাজ আছে। সবার আগে পাঁচ-ছ'টা বড় বড় নারকেল জোগাড় করতে হবে, দুধ একটু বেশি করে নিতে হবে। রিঙ্কিকে বলে রাখতে হবে বেলপাতা একশো আটটি জোগাড় করে রাখতে, এইবারও সন্ধিপুজোর সময় বেলপাতার মালা নিজে হাতে গেঁথে  মা-কে দেবেন, আর হ্যাঁ পদ্ম লাগবে, মা-র শাড়িটা কিনতে হবে। সন্ধিপুজোয় প্রতিবার মা-কে শাড়ি দেন অনুরাধা।
 
ফোনের গ্যালারিতে মা দুর্গার গতবারের ছবিটা বের করেন, মন খারাপ কী আনন্দে এই মুখটা দেখা চাই, তপ্ত কাঞ্চন বর্ণ, ডাকের সাজ, একচালার মধ্যে পুরো পরিবার নিয়ে ছোট্ট মা। ওই চারফুট হয়তো হবে উচ্চতায়। কী ভীষণ মা মা, দেবী বলে মনেই হয় না। কীকরে পাড়ার পুজো ছেড়ে অনুরাধা কলকাতায় বসে থাকবেন?
অনুরাধার বাড়িতে ঠাকুরের সব বাসনপত্র থাকে, ষষ্ঠীর সকালেই সব সোনার মতো চকচকে করে দুর্গা মণ্ডপে দিয়ে আসেন, এইবার যেহেতু কলকাতায় থাকবেন বলে ঠিক ছিল তাই ঠাকুরের যাবতীয় বাসন, সন্ধিপুজোর বিশেষ প্রদীপ সব রঞ্জনদের বাড়িতে দিয়ে এসেছেন।
 
কল্যাণীতে আসার আগেই রঞ্জনের ফোন, জেঠিমা ঠিক আছে কিনা, একবার জেনে নিল ছোঁড়া। কলকাতায় ছেলের ফ্ল্যাটে ভালই ছিলেন অনুরাধা। ঠাম্মাকে নিয়ে নাতির কত প্ল্যান। কলকাতার ঠাকুর দেখাবে, ওদের কমিউনিটি হলে চারজনে মাচিং জামায় সেজে অঞ্জলি দিতে যাবে অষ্টমীতে। সবই ছিল কিন্তু শরতের আকাশ ছিল না, জানলা কি বারান্দায় দাঁড়িয়ে টুকরো টুকরো করে আকাশ দেখতেন। শিউলি ফুলের একটা গাছ নেই! অনুরাধার দম আটকে আসতে লাগল। পাপিয়া চলে আসার আগে হাত ধরে অনুরোধ করেছে, "মা, আমাদের কমিউনিটি হলে নিষ্ঠা সহকারে পুজো হয়। আপনি নারকেল নাড়ু, চন্দ্রপুলি আমাদের জন্য বানান। কলকাতার পুজো দেখেননি মা, থাকুন-না।"
 
অনুরাধা বোঝাতে পারেননি বছরকার দিনে ভিটে অন্ধকার থাকবে, ঠাকুরের আসনে ধূপ-জল পড়বে না এই ভাবনাটা অস্থির করে তুলছে। সেই কোন কাল থেকে নিজেদের গাছের নারকেল দিয়ে নাড়ু করেন, তাঁর দিদিশাশুড়ির চন্দ্রপুলির ছাঁচ এখনও কয়েকটা অবশিষ্ট আছে, সেগুলো বছরে একবারই বের করেন, এইসব গৃহস্থালি জিনিসপত্রের মধ্যে বছরকার দিনে চলে যাওয়া মানুষগুলো ফিরে আসেন, এটা টের পান অনুরাধা। মা-দুর্গার একটা পট আছে ঠাকুরঘরে শ্বশুরমশাই বেনারস থেকে নিয়ে এসেছিলেন, ষষ্ঠীর দিন থেকে শুরু করে রোজ শিউলি ফুলের মালা গেঁথে মা’কে পরিয়ে থাকেন। নাড়ু, চন্দ্রপুলি ঘরের ঠাকুরকে নিবেদন করে, অষ্টমীর দিন সকালে নিয়ে যান দুর্গা মন্ডপে। সেগুলো কি কলকাতায় থাকলে হবে?
 
"ঠাম্মা তোমার জন্য না আমরা পুজোয় কোথাও ঘুরতে যেতে পারি না, কলকাতায় আনন্দ করতে পারি, সেই এক গ্রামে যেতে হয়। বিচ্ছিরি।" নাতি যখন অভিযোগ করছিল, পাপিয়া, শুভ চুপ ছিল। অনুরাধা বোঝেন এটা হয়তো ওদেরও মনের কথা। "নবমীর দিন আসিস-না তোরা, কিন্তু আমি ধুবুলিয়া আমার নিজের বাড়িতেই পুজো কাটাব।" বাচ্চাদের মতো করে বলেন অনুরাধা।
 
ট্রেন রানাঘাট ছাড়ল, আর বেশিক্ষণ লাগবে না। শুভ এমনিতেই কম কথা বলে, একটা কথাই বলেছিল, "বেশ তোমার জেদটাই থাকুক।" ছেলের মুখের দিকে তাকায়নি, আপন মনেই বলেন, "নিজের দালান, ঘর ছেড়ে থাকা বছরকার দিনে বাইরে থাকা বড় কষ্ট রে। নিজেকে কেমন বন্দি বলে মনে হয়। আমার গাছ, আমার ঠাকুরের আসন, সন্ধিপুজোর সময় প্রদীপের আলোয় মা-র মুখ দেখার শিহরণ, দুর্গা মণ্ডপে সবার সঙ্গে মিলে ঠাকুরের কাজ করার যে আনন্দ শুভ আমি তোদের এখানে পাব না। আমায় ফিরতেই হবে ধুবুলিয়াতে।"
 
রঞ্জন একটা টোটো রিজার্ভ করে এসেছে। জেঠিমাকে আগে টোটোতে বসিয়ে, লাগেজগুলো তুলে দেয়, তারপর নিজে বসে। অনুরাধা দেখেন শেষ দুপুরের রোদে গোটা রাস্তা, ঘরবাড়ি, গাছপালা সোনার মতো চকচক করছে... “আহ নিজের চেনা জীবন, চেনা গন্ডিতে কী শান্তি"।
রঞ্জন হাসতে হাসতে বলে, "আমি তো ভেবেছিলাম এবার দশমীতে তোমার হাতের কুচো নিমকি, নাড়ু, চন্দ্রপুলি, ঘুগনি সব খাওয়া মিস হয়ে গেল"।
 "পেটুক কোথাকারের। শোন রিঙ্কিকে একটা খবর দিতে হবে, আর আমার গাছগুলোয় জল দিয়েছিলি?"
"হ্যাঁ গো। বাড়ি বাড়ি করেই গেলে তুমি।"
অনুরাধা হাসতে হাসতে বলেন "মার খাবি। শোন-না কাল অথবা পরশু তোর মা আর আমাকে নিয়ে নদীর ধারে যাবি, কাশবন দেখব আর পটুয়া পাড়াতেও নিয়ে যাস একবার, ঠাকুরের সাজ দেখার বড় সাধ হয়েছে।"
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)