প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

শারদীয়া | সম্পাদকীয়

বাতায়ন/শারদীয়া/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র , ১৪৩৩ শারদীয়া সম্পাদকীয়   ফকিরের চাল বাঙালির দুর্গা সার্বজনীন , চিরকালীন । ...

Friday, September 18, 2026

সাহিত্য ও কথাসাহিত্য | অনিমা দেবনাথ

বাতায়ন/শারদীয়া/প্রবন্ধ/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
প্রবন্ধ
অনিমা দেবনাথ
সাহিত্য ও কথাসাহিত্য

আসলে এই শেষ হয়ে শেষ না হওয়া বা পাঠকের আরও কিছু চাওয়া এখানেই ছোট গল্পের সার্থকতা। ছোটগল্পে সাধারণত অল্প চরিত্রের মাধ্যমে একটি বা দুটি ঘটনাকে উপজীব্য করে কখনো সংলাপে কখনো বর্ণনায় কাহিনি এগিয়ে যায় এবং একটা অনাকাঙ্ক্ষিত সমাপ্তি ঘটে।

 
মানব মনের ভাবনা-কল্পনা, চিন্তা-চেতনা, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, ভয়, সৌন্দর্য, আদর্শ, গল্প যখন ভাষা ও শব্দের নান্দনিক সৌকর্যে শিল্প মাধুর্যমণ্ডিত হয়ে প্রকাশ পায় তখন সেটা হয়ে ওঠে সাহিত্য। নন্দনতত্ত্ব বা নান্দনিকতা বা সৌন্দর্য তত্ত্ব সাহিত্যের প্রাণ। মানুষের চিরাচরিত কথাবার্তার থেকে সাহিত্যের ভাষা একটু ভিন্ন। এই যে ভিন্ন আঙ্গিকে জীবনের গল্প বলা বা শোনানো এটাই সাহিত্যের মাধুর্য। এখানে একদিকে থাকে সাহিত্যিকের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে থাকে সামাজিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, জীবনের বাস্তবতার বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণধর্মী সত্য যা মানুষের সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনা আশা-নিরাশার দোলাচলে পাঠককে আনন্দ দানের পাশাপাশি জ্ঞান ও নতুন ধারণার সাথে পরিচিত করে। এটি যেমন সমাজের প্রতিচ্ছবি তেমনই মনস্তাত্ত্বিক, আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা দান করে। ১৯৫টি জাতিসংঘ স্বীকৃত দেশের কবি সাহিত্যিকগণ নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমারেখায় বাস করেও বিশ্বায়নের অনুভূতিতে দেদীপ্যমান। তাই তাঁরা বিশ্বজনীন হয়ে ওঠেন সকলের চিন্তাচেতনার সাথে একাত্ম হয়ে।
 
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা আছে। যেমন কবিতা— ছন্দ, অলংকার, উপমা উৎপ্রেক্ষার সমন্বয়ে একটি চিত্রকল্প তৈরি হয়। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, প্রেম-বিরহ আশা-নিরাশা-সহ জীবনের যাবতীয় চিত্র ফুটে ওঠে কবিতার চরণে।

গল্প— কম চরিত্রে স্বল্প পরিসরে পাঠককে বিস্তৃত চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়। অতৃপ্ত পাঠক যেন আরও কিছু পেতে চায় এই গল্প থেকে।
 
উপন্যাস— যা জীবনের বাস্তবতার সাথে সামাজিক প্রেক্ষাপট, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণের মাধ্যমে কখনও সংলাপে আবার কখনও বা বর্ণনার মাধ্যমে লেখক কাহিনিকে একটা পরিণতি দেন।
 
নাটক— এটিতেও বাস্তবকে অবলম্বন করে পাত্রপাত্রীর এবং সমাজের আরও দশজন স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক মানুষের চরিত্র চিত্রণ থাকে। তবে এখানে সংলাপ ও পরিবেশ একটা মুখ্য ভূমিকা পালন করে। দ্বন্দ্ব-সংঘাত, জীবনের টানাপোড়েন অতিক্রম করে সাহসী হয়ে সম্মুখে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ়তা নাটকে প্রাণ পায়। বাস্তব এবং কল্পনা, আদর্শ এবং লোভ, বিবেকের তাড়নায় সতত দগ্ধ হয়। ন্যায়ের মানদণ্ড মানুষকে মানুষ করে তোলে অধিকাংশ নাটকে। এর মধ্যে দুর্দান্ত কারিশমায় নায়ক হয়ে ওঠেন মহানায়ক। এটি সমাজের একটি আদর্শ চিত্র।

নিবন্ধ— যে-কোনো বিষয় সম্পর্কে সাধারণ আলোচনা এখানে ফুটে ওঠে লেখকের পারদর্শী লেখনীর ছোঁওয়ায়। বিষয় বস্তুর সাথে পরিচিত করাই যেন নিবন্ধিকের বড় দায়।
 
প্রবন্ধ— এটি একটি বলিষ্ঠ গদ্য সাহিত্য। সমাজ-সংস্কৃতি, সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য বিষয়সমূহ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, নীতি-দুর্নীতি, ধর্ম-অধর্ম, সামাজিক অবক্ষয়, জীবনী ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ যুক্তনিষ্ঠ আলোচনা প্রাবন্ধিকের কলমের জাদুর স্পর্শে মূর্তিমান হয়ে উঠে।
 
এছাড়া বিভিন্ন ধরনের গবেষণা পত্রিকা, সায়েন্স ফিকশন আরও আরও বিষয় সাহিত্য পদবাচ্য বলে বিবেচিত।
 
কথাসাহিত্য— কথাসাহিত্য বা prose fiction হলো সাহিত্যের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা যা মানুষকে বাস্তবতার ভিত্তিতে কল্পনা ও আদর্শের এক মেলবন্ধনের সেতুতে উপনীত করে, যেখানে মানুষ নিজের জীবনের সাথে পঠিত সাহিত্যের চারিত্রিক আশা ও ঐতিহ্যগত মিল খুঁজে পেয়ে আশ্বস্ত ও উদ্‌বেলিত হয়। জীবনের, ভাবনা, কল্পনা, আবেগ-অনুভূতিকে সুচিন্তিত মতামত দিয়ে বিশ্লেষণধর্মী মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় শৈল্পিক ও নান্দনিক আবহ সৃষ্টি করা একজন গল্পকার ও ঔপন্যাসিকের সার্থকতা। এক্ষেত্রে ব্যক্তি মাত্রই স্বতন্ত্র ধ্যানধারণা, বিশ্লেষণ-সংশ্লেষণ ক্ষমতার অধিকারী। যে দেশে বা যে সমাজে মানুষ জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠে সেই কালের বা সে সমাজের চিন্তা চেতনা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ মানুষকে ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে তোলে। এই ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য বা চেতনা যখন নান্দনিক ও শৈল্পিক প্রকাশে সকলের নিকট গ্রহণীয় হয়ে ওঠে তখন সেই কবি বা সাহিত্যিক, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠেন কালজয়ী বা বিশ্বজয়ী।
 
মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, মিল্টন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, এলিয়ট, শরৎচন্দ্র-সহ বহু বহু জ্ঞানী গুণী লেখক ও কবি সাহিত্যিকগণ আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। মধুসূদনের আধুনিক মানবিক আবেদন, পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য রীতিকে একত্রে স্থাপন, রবীন্দ্রনাথের সীমার মাঝে অসীমের আহ্বান ও আধ্যাত্মিক জীবন দর্শন, নজরুলের সাম্যবাদ ও বিদ্রোহী সত্তা, মিল্টনের নিয়তি বা ঐশ্বরিক বিধান ও ছন্দের শিকল ভাঙা, ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রকৃতি প্রেম, এলিয়টের শূন্য থেকে পূর্ণ করার জন্য স্রষ্টা ও সৃষ্টির একত্ব, শরৎচন্দ্রের নারী শক্তির জয় ইত্যাদি বহু বহু বিষয় সম্পর্কে বৈচিত্র্যময় আয়োজনে সর্বত্র সাহিত্য ভাণ্ডার পূর্ণ।
 
সাহিত্যের অন্যতম শাখা কথাসাহিত্যের মধ্যে সাধারণত ছোটগল্প ও উপন্যাসকে ধরা হয়। আকারে ছোট গল্প হলেই কিন্তু সেটা ছোটগল্প নয় সেটা আমরা সকলেই জানি। ছোটগল্পের স্বতঃসিদ্ধ সংজ্ঞা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ দিয়ে গেছেন।
 
ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা
ছোট ছোট দুঃখ কথা
নিতান্তই সহজ সরল
সহস্র বিস্মৃতি রাশি
প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দু চারিটি অশ্রুজল
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ
অন্তরে অতৃপ্তি রবে
সাঙ্গ করি মনে হবে
শেষ হয়েও হইলো না শেষ।
 
আসলে এই শেষ হয়ে শেষ না হওয়া বা পাঠকের আরও কিছু চাওয়া এখানেই ছোট গল্পের সার্থকতা। ছোটগল্পে সাধারণত অল্প চরিত্রের মাধ্যমে একটি বা দুটি ঘটনাকে উপজীব্য করে কখনো সংলাপে কখনো বর্ণনায় কাহিনি এগিয়ে যায় এবং একটা অনাকাঙ্ক্ষিত সমাপ্তি ঘটে।
 
উপন্যাস— কোনো বাস্তব কাহিনি যখন লেখকের ব্যক্তিগত জীবনদর্শন ও আবেগ অনুভূতির সমন্বয়ে বর্ণনাত্মক শিল্পকর্মে রূপায়িত হয় তখন তাকে উপন্যাস বলে। ঔপন্যাসিক এখানে সুন্দর ও সুরসালো করে গল্পটিকে বর্ণনা করেন যা ক্রমিকভাবে কাহিনির মাধ্যমে এগিয়ে যায়। লেখকের পারদর্শিতায় পাঠক পরের কাহিনি পড়ার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে পড়ে। চারিত্রিক বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণের পার্থক্যে সমাজ সংশ্লিষ্টতায় এবং রাজনৈতিক সমালোচনায় ব্যক্তি চরিত্রগুলি ক্ষুদ্র গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর সীমানায় মানুষের কাছে উপস্থাপিত হয়। এখানে বাস্তবতা একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। চরিত্র চিত্রণ, সংলাপ ও বর্ণনা উপন্যাসের গল্পকে এগিয়ে নেয়। মানুষের জীবনের আদর্শ, আকাঙ্ক্ষা ও আবেগকে নাড়া দিয়ে লেখক পাঠককে উপন্যাসের চরিত্রের সাথে একীভূত করতে সক্ষম হন। তাই উপন্যাস পড়তে অনেকেই কাঁদেন, হাসেন এবং নিজের জীবনের ও আদর্শ অনুধাবন করতে শেখেন। এই পাঠক এবং লেখকের চরিত্র চিত্রণের যে মেলবন্ধন এখানেই উপন্যাসের সার্থকতা। যেমন: শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে শ্রীকান্ত, রাজলক্ষ্মী, বড়দিদি, মেজদিদি, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কপালকুণ্ডলা, বিষবৃক্ষের  কুন্দনন্দিনী, সূর্যমুখী এগুলো আমাদের বাস্তব জীবনেরই চরিত্র।
 
সেই উপন্যাস শুরুর যুগ থেকে দেখলে এসত্য স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে এখানে মানব মনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত, নানা প্রতিকূলতার টানাপোড়ন পেরিয়ে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ফুটিয়ে তুলেছেন বা তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন ঔপন্যাসিকগণ। রবীন্দ্রনাথের অমিত লাবণ্য আমাদের সমাজেরই দর্পণ। নজরুলের মৃত্যুক্ষুধার মেজবউ ও তার দেবর প্যাকালের ক্ষুধার যন্ত্রণায় সপরিবারে ধর্মান্তরিত হওয়ার চিত্র অতি বাস্তব বিষয়। বাঁধনহারা উপন্যাসের নুরু প্রেমের ব্যর্থতায় সেনাবাহিনীতে যোগদান সবই সমাজ জীবনের প্রতিভূ। এজন্যই উপন্যাস পড়ার আগ্রহ আজও কমেনি মানুষের।
 
সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পাঠক সমাদৃত সাহিত্য হলো কথাসাহিত্য— যার মধ্যে আছে ছোটগল্প ও উপন্যাস। ছোটগল্পে কোনো একটি বা দুটি বিশেষ ঘটনা প্রবলভাবে অনুভবে নাড়া দিয়ে আলোড়ন তোলে। উপন্যাসে সেখানে বাস্তব নির্ভর কাহিনি কল্পনা ও আদর্শের মেলবন্ধনের সেতুতে দাঁড়িয়ে মানুষের মন ও মননে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে। এইখানে ঔপন্যাসিকের সার্থকতা। একজন ঔপন্যাসিকের মন ও মনন পাঠককে বিস্তৃত চিন্তা করতে ও সাহিত্য জগতের সবচেয়ে মজার বিষয় উপন্যাস তথা কথাসাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে ভাষার প্রাঞ্জলতা বা সাবলীলতা যেমন প্রয়োজন তেমনই পাঠককে ধাপে ধাপে গল্পের গভীরে নিয়ে যাওয়া লেখকের পারদর্শিতার পরিচায়ক।
 
এই পারদর্শিতাই একজন সাহিত্যিকের কাল থেকে কালান্তরে বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সকল কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক তথা নাট্যকার-সহ যাবতীয় সাহিত্য পদবাচ্য লেখকগণ তেমনই পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখে আপন স্বকীয়তায় দীপ্তিমান হয়ে থাকুন শতাব্দীর পর শতাব্দী এই কামনা রইল সকলের জন্যে!
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)