বাতায়ন/শারদীয়া/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৫তম সংখ্যা/৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩
শারদীয়া
ধারাবাহিক গল্প
অমিত পাল
বে-তাল
[১ম পর্ব]
মাত্র একশো বছর তিন মাস পনেরো দিনে পদার্পণ করে বুড়ি চলে গেলেন মিওির পরিবারের সকলের মুখে হাসি ফুটিয়ে। এই তো দিন কয়েক আগেও মিওির পরিবারে দুঃখের ঘন কালো মেঘ নেমে এসেছিল, কী অভিশপ্ত ছিল সেই দিনটি।
খগেন
চক্রবর্তী, বাড়ি নবদ্বীপ বেনে
পাড়া, পেশা যজমানি। ছিপছিপে
অষ্টবক্র গড়ন, মুখশ্রী কালশিটে
তুবড়ানো ভাতের হাঁড়ির পিছনটা যেমন। দৃষ্টি শকুনের চেয়েও দৃঢ়। যখন শিকার খুঁজতে বের
হন, ঠোঁটের কোনে মিনষে হাসিটা
গতিজাড্যেই রাখেন। মাত্র পাঁচশো টাকার বিনিময়ে পিণ্ড খান। এক কথায় অগ্রদানী
ব্রাহ্মণ অর্থাৎ প্রেতোদ্দিষ্ট দান গ্রহণকারী পতিত ব্রাহ্মণ। লোকাল শ্মশানে
অগ্রদানী ব্রাহ্মণদের খাতায় নিজের নামটাও ঢুকিয়েছেন সরকারি ভাতার জন্য। পাড়ার
ছেলেপুলেরা পিণ্ডিখেকো ব্রাহ্মণ বলে টিটকিরিও মারে, যদিও তাতে ওনার কিচ্ছুটি যায় আসে না। ব্রাহ্মণ ঠিকই, তবে ব্রহ্মজ্ঞান শূন্য।
ছেলেবেলা থেকেই বখাটে। লেখাপড়া টেনেটুনে ওই মাধ্যমিক। গাঁয়ের লোকে ভক্তিভরে
ঠাকুরমশাইকে সচরাচর ডাকে না,
নেহাত
পুরোহিতের ক্রাইসিস না হ’লে। এখন বয়স বাহাত্তর, দিব্যি ফাজলামো করেই জীবনটা কাটিয়ে দিলেন। তবে ইনি যে সে
পুরোহিত নয় বাপু, গাঁয়ে তিন-তিনটি শনি মন্দির
প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর ওই তিনটি মন্দিরেরই ম্যানেজিং ডিরেক্টর স্বয়ং নিজে। স্বামী-স্ত্রীর এক ফালি
সংসার। নিজেই ঘটকালি ক’রে একমাত্র মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন কৃষ্ণনগর নেদের পাড়ায়।
স্ত্রী কমলাদেবী কেবল যে ঘর সংসারই করেন তা নয়, তিনি একজন নামী পেশাদার রুদালী। এমন শব্দ দূষিত মরাকান্না
কাঁদবেন, বিদেহী আত্মা সাত
প্রজন্মে ভুলেও ফ্ল্যাশব্যাকে আসবে না। আজ বিকেলেই সুদূর কলকাতার একটা বড় অর্ডার
পেয়েছেন। শিয়ালদা শার্পেনটাইন লেনের সম্ভ্রান্ত কঞ্জুষ আড়তদার বিশু মিওিরের মা
গতকাল মধ্যরাতে পরলোকের গাড়িতে চেপেছেন। বুড়ির শেষ ইচ্ছে ছিল, তাঁর এ দেহ যেন নবদ্বীপ
মহাশ্মশানে দাহ করা হয়। মাত্র একশো বছর তিন মাস পনেরো দিনে পদার্পণ করে বুড়ি চলে
গেলেন মিওির পরিবারের সকলের মুখে হাসি ফুটিয়ে। এই তো দিন কয়েক আগেও মিওির পরিবারে
দুঃখের ঘন কালো মেঘ নেমে এসেছিল,
কী
অভিশপ্ত ছিল সেই দিনটি। সেদিন বুড়ি প্রায় যায় যায়, সকলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায়, নাতিপুতিরা সকলে মিলে প্রায় শ’দেড়েক শেলফি তোলা হয়ে গেছে, সেগুলো একের পর এক ফেসবুক, ইনষ্টাগ্রামে আপলোড চলছে।
বড়দের মধ্যেও টানটান উত্তেজনা। ডাক্তার নৃপেন শীল বলেই গেছেন ম্যাক্সিমাম আর ঘণ্টা
পাঁচেক। ভিজিট নেননি, ডেথ সার্টিফিকেট লিখে
একবারে নেবেন। স্বর্গরথও এসে গেছে তাও ঘণ্টা দুয়েক হতে চলল। অপেক্ষার ধাক্কায় আর
মশা মারতে মারতে ড্রাইভারের হাফ প্যাকেট বিড়িও প্রায় শেষ। একটা গুমোট ওয়েদার বাড়ির
উঠোনে। হঠাৎ বুড়ি তাঁর এক নাতিকে চোখের ইশারায় কাছে ডাকল। নাতি ছুটে এসে বুড়ির
কানের গোড়ায় মুখটা নামিয়ে অসহায় জিজ্ঞাসা, হ্যাঁ ঠাকুমা বলো। অ্যা, কী বললে?
মাখা
সন্দেশ খাবে? সকলের দিকে চেয়ে
কান্না জড়ানো গলায় নাতি বলে,
কেলো
করেছে, ঠাকুমা তো এখন মাখা
সন্দেশ খেতে চাইছে। ড্রাইভার স্বর্গরথের জানলা থেকে মুখটা ঈষৎ বাড়িয়ে বলে, বুড়ির শেষ ইচ্ছেটা চটজলদি
মিটিয়ে দিন, তবে ওই জল চাইলে
দেবেন না যেন, তাহলেই খেল খতম। অথচ
কী সাংঘাতিক কাণ্ড, দেখতে দেখতে প্রায়
ঘণ্টা ছ’য়েক তো হয়েই গেল, বুড়ি এবার জল চাইছে।
চোখের সামনে মুখে জল না দিয়ে কি সে দৃশ্য চোখে দেখা যায়? সন্দেশ ও জল খেয়ে বুড়ি এখন দিব্য পিটপিট করে চোখ নাচাচ্ছে।
স্বর্গরথ জলপানির টাকা নিয়ে বুড়িকে মুখ খিস্তি করে ফিরে গেছে, ক্লান্ত আগাম শ্মশান
যাত্রীরাও যে যার ঘরে ফিরেছে,
যারা ফ্রি-তে
ইসকন মন্দির দেখবে বলে কিলবিল করছিল তারাও। সেদিনের মতো গেম পোস্টপণ্ড। শেষে কিনা
ক্যাওড়াতলার এক অগ্রদানী ব্রাহ্মণ নিদেন দিলেন, এ বুড়ির জীবদ্দশায় শ্রাদ্ধশান্তির আয়োজন করতে হবে, খরচ প্যাকেজে মাত্র কুড়ি
হাজার। রেটিনা স্থির রেখে বিশু মিওির এক কথায় রাজি। চটজলদি আয়োজন, ইনভেস্টমেন্ট বিফলে যায়নি, যেমন কর্ম তেমন ফল। শ্রাদ্ধের
মাত্র তিন দিনের মাথায় খেল খতম। সেদিন মধ্যরাত, সবার চোখে-মুখে হাসির ঝলক, চারিদিকে ফোনাফোনি, মিওির বাড়িতে আজ যেন
মহোৎসব। ক্যাওড়াতলার ব্রাহ্মণের দিব্যদৃষ্টির তারিফ করতেই হয়। আর তাঁরই আদেশে
প্রেতাত্মা চিরতরে ভ্যানিস করতে কন্ট্রাক্ট করা হয় নবদ্বীপের স্বনামধন্য রুদালি
শ্রীমতী কমলাদেবীর সাথে।
সেদিন
পাড়ার চায়ের দোকানের উদ্দেশ্যেই সবেমাত্র বেরিয়েছেন খগেনবাবু। সারাটা দিন চায়ের
ঠেকগুলোয় আড্ডা দিয়েই খুচরো পুজো-আছছার কাজ জোগাড় করেন, ফ্রিতে চা-টাও জুটিয়ে নেন। তবে ওই শনিবার করে তিনি যেন কোন
মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর। পাড়ায় ওনার শনি পুজোয় একশো শতাংশ
আস্থা। সেদিনের উঠতি সেয়ানা ইয়াং পুরোহিত নব শিকদার ছুটতে ছুটতে এসে একটা থলে হাতে
এগিয়ে বলে, এটা ধরুন ঠাকুরমশাই, মা আপনাকে দিতে বলেছেন। চোখ
গোল পাকিয়ে বকের মতো সরু গলাটা বাড়িয়ে খগেনবাবুর বিস্ময়ের জিজ্ঞাসা, তা এতে আছেটা কী? সাদাসিধে নব উত্তর দেয়, পুকুর বাগানের গাছের তাল, খুব মিষ্টি, কেটে শাঁস খাবেন। এ কী কাণ্ড, সাত সকালেই প্রাপ্তিযোগ।
খগেনবাবুর চোখ থেকে যেন এক মুঠো অভ্র ঝরে পড়ল। ঝিকিমিকি দৃষ্টিতে নব বলে, আপনার আশীর্বাদেই গোপালের
বাবার শ্রাদ্ধের কাজটা পেয়েছি ঠাকুরমশাই। অমনি খগেনবাবুর চোখ দু’টো নুইয়ে যায়।
বিড়ির ধোঁয়া ঢোক গিলে বলেন,
প্রথমে
আমাকেই বলেছিল গোপাল। খুব হাতটান ওদের, তাই ফিরিয়ে দিয়েছি। থলের হ্যান্ডেল দু’টো দু’হাতে ফাঁক করে দেখলেন ভেতরে দু’টো
প্রমাণ সাইজের তাল। মনে মনে বলেন,
শালা
অনামুখো শিকদার, কেসটা ঠিক হাতিয়ে
নিয়েছে। আমাকে কী তালকানা ভেবেছে?
এ দেখছি
বাপেরও এককাঠি বাড়া। থলেটা হাতে নিয়ে
ফুলকি হেসে বিড়িতে একটা ধর্মটান মেরে সামনের পথ ধরলেন। তখনই পাশের বাড়ির উচ্চিংড়ে
পল্টন ছুটতে ছুটতে এসে বলে,
ঠাকুরমশাই
শিগগির বাড়ি যান ঠাকুমা আপনাকে গরু খোঁজা খুঁজছে, কলকাতার কেস। পুরুত অমনি ইউ টার্ন। পল্টন পথ আটকে বলে, ভাল খবরটা দিলাম দু’টো টাকা
দাও।
এই যে
অনামুখো, আমি একটু গোবর আনতে
বেরিয়েছি কী এসে দেখি তুমি হাওয়া। বলি শোনো, কলকাতার এক বুড়ি মরেছে, নবদ্বীপ ঘাটে আনছে। টাকার কথাটা ফাইনাল হোলো না, যা একখান মরণদশা ফোন। আজ এক
হপ্তা হতে চলল, কোন কাজ জোটাতে
পারোনি, অকম্মার ঢেঁকি একটা।
গোপালের বাবার কাজটা তো নব হাতিয়ে নিয়েছে, বলি সে খবর কি রাখো? আ-মরণ,
এ
ব্যাগে আবার কী? কলকাতার কেস শুনে
খগেনবাবুর চোখ থেকে এবার সোনা ঝরছে। কালো কোদালের মতো দাঁত ক’খান বার করে বলেন, ওহে গিন্নি সে খবরটা পেলাম
বলেই তো নবর থেকে এই ভেট। এবার এই তাল দু’খান কাটার ব্যবস্থা করো দিকি। বিস্ময়ে
কমলাদেবীর চোখ কপালে, ও মা, নব দিলো? কিন্তু তাল কাটার মতো তেমন
ধারালো দা-কাটারি আমাদের নেই গো। ও তুমি যা পারো করো। পঞ্চাশ বছর বয়সি দাও-টা নিয়ে
বুড়ো নিজেই ময়দানে নামলেন। একটা তালকে কুপিয়ে কুপিয়ে থেঁতো করে বেতাল বানিয়ে
ছাড়লেন। খত খত শব্দ শুনে গিন্নি ছুটে এসে বলে, এই ভোঁতা দাও আর থেঁতো বুদ্ধি নিয়ে কি সুষ্ট ভাবে কোন কাম
সম্ভব? আমি না দেখলে তো ওই
তালটারও একই হাল করে ছাড়তে। বলি,
যদি
শাঁস খেতেই হয় তো ওটাকে নিয়ে গিয়ে বাজার থেকে কাটিয়ে আনো। আর শোনো তোমার কিছু কাজও
আছে, ব্রাহ্মণ ভাতার পেছনে
এবার একটু ছোটাছুটি করো বুঝলে। মাসে হাজার টাকা বলে কথা। দু-খান পাসপোর্ট ছবি
চেয়েছে শ্মশানে। আগে গজেনের দোকানে ছবি তুলে তারপর তাল কাটিয়ে বাড়ি ফিরবে। ও হ্যাঁ, শ্মশান থেকে বলেছে কী একটা
ফরম ফিলাপ করতে হবে, ওই যে সাইবাবার
ক্যাফে না কি বলে, ওখানে গিয়ে। কী হোলো, এমন ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছ
যে, কথাগুলো কানে গেল কি?
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment