বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/২১তম সংখ্যা/২০শে কার্ত্তিক, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
মহাদেব গুড়িয়া
এখনও অন্ধকার
[২য় পর্ব]
নিজেকে পাল্টা। প্রতিবাদ করতে শেখ। মুখ বুজে যত সহ্য করবি, তত বোঝা বাড়বে তোর ওপর। ‘আমার জলখাবার এনে দিয়ে’—তাতে কী হয়েছে? ও কথা বললে আর হবে না। ওখান থেকেই তো শুরু এবং তোকেও ওখান থেকে শুরু করতে হবে—‘কেন নিয়ে যাব?’ ঠিক এইভাবে, বুঝলি?
পূর্বানুবৃত্তি
আমি
যখন বসে বসে এইরকম ভাবছি, তখনই পিংকু আমার জন্য
সকালের জলখাবার নিয়ে এল।
—তোকে কে আনতে বলল আমার এখানে?
ও জানে
‘মা’ বললে আমি মায়ের ওপর গিয়ে রাগ ঝাড়ব, তাই একটু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলল,
—কেন, এতে আর কী হয়েছে?
—তোরটা কে দিয়ে গেছিল?
ও
আশ্চর্য হয়ে বলে,
—কে আবার দিয়ে যাবে? আমি এনেছি।
—তোরটা তুই নিয়ে আসতে পারলে, আমারটা আমি আনতে পারতাম না?
ও আর
কথা না বাড়িয়ে চলে গেল। টিফিন সেরে দেখলাম, সকলের থালা-গ্লাস জড়ো করা হয়েছে এক জায়গায়। আমাকে মা বলল,
—এইখানে রেখে দে।
—কে ধোবে?
—পিংকুর খাওয়া হয়ে গেলে
একসঙ্গে ধুয়ে নিয়ে আসবে ক্ষণ।
—কেন? যে যারটা ধুয়ে নিলে কি হাতে ফোসকা পড়ে যায়?
আমি
ওখানে না রেখে থালা-গ্লাস নিয়ে চললাম কলে। আমি ধুয়ে আসার পর দেখি, ভাইও ওরটা জড়ো করা থালা-গ্লাস
থেকে আলাদা করে ধুয়ে নিয়ে এল। মা ধুয়ে আনল নিজের আর বাবার। পিংকু খাওয়া শেষ করে
নিজের থালা-গ্লাসগুলো এমনভাবে ধুয়ে আনল, যেন ওই একটা বড়সড় কিছু অপরাধ করে ফেলেছে।
উপরের
ঘরে গিয়ে পড়তে বসলে আমি গিয়ে বললাম,
—নিজেকে পাল্টা। প্রতিবাদ করতে
শেখ। মুখ বুজে যত সহ্য করবি,
তত বোঝা
বাড়বে তোর ওপর। ‘আমার জলখাবার এনে দিয়ে’—তাতে কী হয়েছে? ও কথা বললে আর হবে না। ওখান থেকেই তো শুরু এবং তোকেও ওখান
থেকে শুরু করতে হবে—‘কেন নিয়ে যাব?’ ঠিক এইভাবে, বুঝলি?
তিন
এরকম
ছোটখাটো ঘটনা হামেশাই ঘটত তখন। আর একবার হায়ার সেকেন্ডারি পাস করার পর সবাই ওকে
বলতে লাগল নার্সিং পড়তে। ভাল মার্কস আছে, সিনিয়র নার্সিংয়ে চান্স পেয়ে যাবে। পাস করে বেরোলে চাকরি বাঁধা। আমার কাছে এসে
ও মুখ কাঁচুমাচু করে বলল,
—দাদা, তুই কী বলছিস? আমার যে কাঁটাছেঁড়ায় ভীষণ ভয় করে রে।
—আমি আবার কী বলব? তুই যা বলবি তাই হবে। যা তুই
চাস না, তা অন্যে বললে বা জোর
করলেও তুই কেন করবি?
—ঠিক বলেছিস। আমিও এবার থেকে
একথা বলব সবাইকে।
বাস্তবে
অনেক ঘটনাকে সাধারণ বা খুব তুচ্ছ মনে হলেও মানুষের মনের ওপর বোধহয় তার একটা cumulative effect আছে। মাধ্যমিকের
পিংকু আর আজকের পিংকুর মানসিকতায় তাই আকাশপাতাল তফাৎ।
চাকরি
সূত্রে আমার বাসা এখন কলকাতায়। বাড়ি থেকে আমার ঠিকানায় পিংকুর চিঠি এসেছে আজ।
আমাদের ওখানেরই একটা স্কুলে চাকরি পেয়েছে, তার খবর জানিয়েছে চিঠিতে। যে জিনিসটা আমরা এতদিন ধরে চেয়ে
এসেছি ওর কাছ থেকে, তাও আজ হল। অথচ
চিঠিতে অনাবশ্যক কোনও উচ্ছ্বাস নেই—রুচিপূর্ণ, বাহুল্যবর্জিত সংক্ষিপ্ত চিঠি। যার একটা লাইন এইরকম...
“তোর আশা, তোদের সকলের আশা পূরণ করলাম।
খুব ভাল লাগছে। এবার আমি নিজের মতো করে বাঁচতে পারব...”
চার
পিংকু
স্কুলের চাকরি পাবার পর অনেকবার বাড়ি এসেছি-গেছি। তবে এবারে এসে একটা নতুন কথা
শুনলাম। শুনে খুশিও হলাম বেশ।
তমাল
আমার সহপাঠী। ফার্স্ট হতো ক্লাসে। খুব ব্রিলিয়ান্ট ও ভদ্র ছেলে। ফিগারটাও বেশ ভাল। ডাক্তারিতে একগাদা
দেশি-বিদেশি ডিগ্রি পেয়ে এখন কলকাতা, বাঁকুড়া, হলদিয়াতে চেম্বার
খুলেছে। বাঁকুড়ায় মানে আমাদের এখানেই প্রতি রবিবার বসে।
পিংকুর
কাছে কথাটা পাড়তেই দেখি, ও তেলে-বেগুনে জ্বলে
উঠল।
—না, দাদা,
তুই
জানিস না। এলাকায় আমাদের দুজনের নামে কত কথা রটে গেছে। ওর জন্য এখন আমি রাস্তায়
ভাল ভাবে হাঁটাচলা করতে পারি না—নোংরা লোক কোথাকার!
আমি
ঠিক মেনে নিতে পারি না। বলি,
—ওর দোষ কী? ওর তোকে ভাল লেগেছে, সেটা কাউকে দিয়ে তোর কাছে বলে
পাঠিয়েছে। আরে দেখ, এসব ব্যাপার পাবলিকে
মুচমুচে পাঁপড় ভাজার মতো খায়। ওসবে কান দিস না—বিয়েটা হয়ে গেলে সব ট্যাঁ-ফোঁ বন্ধ
হয়ে যাবে।
ইত্যাদি
নানাভাবে আমি যত ওকে বোঝাই যে তমাল কত ভাল ছেলে, ও কিছুতেই মানতে চায় না। একসময় বলে,
—দাদা, তুই না বলেছিলি, ছেলেরা বিয়ে করে আর মেয়েদের বিয়ে হয়। মেয়েরা যতদিন না পর্যন্ত স্বনির্ভর হতে
পারছে, ততদিন তারা মনের মতো
কাউকে বিয়ে করতে পারবে না। তাদের বিয়ে দিতে হবে। তাহলে আমি কেন স্বনির্ভর হওয়া সত্ত্বেও—
ও চুপ
করে যায় হঠাৎ। বুঝতে পারি,
আমি
আমার ভাল লাগাটা ওর ওপর চাপাতে চাইছি। কোনও কারণে তমালকে হয়তো ওর ভাল লাগেনি। সে
স্বাধীনতা নিশ্চয়ই ওর আছে। ওর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা আমার উচিত হবে না। ওর মান
ভাঙাতে বলি,
—ঠিক আছে বাবা, ঘাট হয়েছে। তমাল নয়, তোর জন্য আরও ভাল কেউ আছে, তারই খোঁজ করব।
ও একটু
সময় নিয়ে বলে,
—দেখ, ওই কনে দেখা ব্যাপারটায় মেয়েদের বাজারের পণ্যের মতো করে
দেখানো হয়। ওখানে ছেলেরা বুক ফুলিয়ে নিজেদের মত জানাতে পারে, অথচ মেয়েদের সে অধিকার নেই।
তুইও তো এ নিয়মটাকে অ্যাবলিশ করার কথা বলেছিলি একদিন।
মেয়েরা
কোনও নিয়মনীতি, যা হয়তো আগে তাদের
মধ্যে ছিল না, কোনওরকমে তা একবার
যুক্তিতর্ক দিয়ে বুঝে নিলে,
বোধহয়
সহজে তার বাইরে বেরোতে পারে না। পরিবেশটা হালকা করতে আমি বলি,
—তোর জন্য তো দেখছি তাহলে
স্বয়ম্বর সভা ডাকতে হয়।
—হ্যাঁ, তাই ডাক।
ও হেসে
ওঠে এবার। আমিও হাসি।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment