বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/২১তম সংখ্যা/২০ই কার্ত্তিক, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
আনোয়ার রশীদ সাগর
রহিমার ঠিকানা
[২য় পর্ব]
মায়ের বুকের নুনে ভাতের সাথে এখন একটু শান্তিও আছে। কারণ মা জানে — কিছু স্বপ্ন রেললাইন পেরিয়ে শহরে চলে যায়। আর কিছু মা, উঠোনে বসে সেই ট্রেনের অপেক্ষা করে। সে অপেক্ষা, রহিমা এবং রমজানের বিয়ের অপেক্ষা।
পূর্বানুবৃত্তি
চিঠি
পড়ে রাহেলার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। মানসম্মানের ভয়ে কাউকে কিছু বলে না। কপালপোড়া
রাহেলা, কিছু বললেই নানান কথা
শোনাবে লোকে। মনে মনে ভাবে,
"রমজান...
ওই বজ্জাতটার সাথে..." রাহেলা উঠোনে বসেই পড়ে। কাঁদল না। পাথরের মতো শক্ত হয়ে
গেলে। দু-একদিন পরেই, গাঁয়ের লোকজন শুনে বলে, "কইছিলাম না? রমজানের সাথে ভাগছে।" “-মার মুখে চুনকালি দিছে।"
রাহেলা কাউকে কিছু বলে না। শুধু রাতে বিড়বিড় করে, "আমার পেটের মেয়ে... পরের ছেলের ঘর করবে?"
অভাবের
সংসার। টাকার দরকার। দুই সপ্তাহ পর রহিমার প্রথম বিকাশ। ৫০০০ টাকা। মেসেজে লেখা —
"মা, ওষুধ কিন। নিজের
খেয়াল রেখ।"
রাহেলা টাকা হাতে নিয়ে কাঁদে। টাকার নোটগুলো যেন কাঁটার মতো বিঁধছে।
ঢাকা।
কামরাঙ্গীরচরের বস্তি। টিনের ঘর গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি হলে চাল দিয়ে
পানি পড়ে। রহিমা সকালে ৭টায় গার্মেন্টসে যায়। রাত ৯টায় ফেরে। আঙুলে সুঁইয়ের খোঁচা।
চোখে ঘুম নাই। কিন্তু মুখে জেদ। রমজান সারাদিন রিকশা চালায়। সন্ধ্যায় দুজন একসাথে
ভাত রাঁধে। আলু-ভর্তা, ডাল। রমজান বলে,
-রহিমা, মা-রে টাকা পাঠাইছ?
-হ্যাঁ।
রহিমার
মনে পড়ে গ্রামের কথা। মায়ের হাঁসমুরগি, পুকুরপাড়ের জোনাকি, ভাদ্রের কাশফুল।
বুকের ভেতর মোচড় দেয়। কিন্তু ফিরে যাওয়ার উপায় নাই। গ্রামে গেলে "পালিয়ে
যাওয়া মেয়ে" তকমা। মা-ও মুখ দেখাবে না।
আরও
তিন মাস পার হয়। রাহেলা একদিন ব্যাগ গোছালে। গরুটা বেচে দিলে। হাঁসমুরগি প্রতিবেশীর কাছে রাখলে। পাশের গ্রামের আব্দুল
চাচাকে বলল "চলেন, ঢাকা যাব। মেয়ের ঠিকানাডা
পাইছি।" বাসে ৬ ঘণ্টা। রাহেলা জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে। মাঠ, নদী, শহর। সব নতুন লাগে। বস্তির সামনে এসে দাঁড়ায়। পচা ড্রেনের
গন্ধ। নোংরা পানি। মানুষে মানুষে গাদাগাদি।
-এইখানে আমার মেয়ে থাকে?
বুক
ফেটে যায়। রাত হয়ে যায়। রহিমা গার্মেন্টস থেকে ফিরছে। গায়ে ঘাম আর ধুলো। সাথে
রমজান। রিকশার হ্যান্ডেল ধরা। গলির মুখে দেখে — মা দাঁড়িয়ে আছে। শীর্ণ, কালো শাড়ি, হাতে একটা পুঁটলি। রহিমার পা আটকে যায়।
-মা...
রাহেলা
এক পাও এগোয় না। শুধু তাকিয়ে থাকে। যেমন গাভী তার হারানো বাছুরকে দেখে। রহিমা কাছে
এসে পা জড়িয়ে ধরে।
-মা, মাফ করে দাও।
রাহেলা
চুপ। অনেকক্ষণ পর বলে,
-ভাত খাইছিস?
এই
একটা কথায় রহিমার সব বাঁধ ভেঙে যায় । হাউমাউ করে কাঁদল। রমজান মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে
থাকে। রাহেলা তার দিকে
একবার তাকাল। কিছু বলল না। সেই রাতে তিনজন একসাথে ভাত খেল। টিনের থালায়। আলু-ভর্তা আর
ডাল। রাহেলা বলল,
-সংসার করলে বিয়ে করে কর।
নাহলে আমার মেয়েকে নিয়ে যাব।
রমজানকে
বলে।
-নাহলে, আমি একা মরব।
রমজান
বলল,
-খালা, আমি কাজ করি। রহিমারে কষ্ট দেব না। কথা দিলাম। বিয়ে করব।
রাহেলা
কিছু বলে না। শুধু মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, পরদিন সকালে রাহেলা আবার
গ্রামে ফিরে আসে। সাথে ১০ হাজার টাকা।
রহিমার দেওয়া। উঠোনে গরু নাই। হাঁসমুরগি আছে। পাড়ার লোক জিজ্ঞেস করে,
-কি খালা, মেয়ে পাইলেন?
রাহেলা
বলে,
-পাইছি। শহরে আছে। ভাল আছে।
রাতের
বেলা একা বসে থাকে। দূরে কোথাও ট্রেনের শব্দ। ভাবে — মেয়েটা বেঁচে আছে। পেটে ভাত
আছে। এটাই অনেক।
ট্র্যাজেডি
শেষ হয়নি। কিন্তু মায়ের বুকের নুনে ভাতের সাথে এখন একটু শান্তিও আছে। কারণ মা জানে
— কিছু স্বপ্ন রেললাইন পেরিয়ে শহরে চলে যায়। আর কিছু মা, উঠোনে বসে সেই ট্রেনের অপেক্ষা করে। সে অপেক্ষা, রহিমা এবং রমজানের বিয়ের
অপেক্ষা।
~~000~~

No comments:
Post a Comment