বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/২১তম সংখ্যা/২০শে কার্ত্তিক, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
বিবেক ও বিজ্ঞাপন
[২য় পর্ব]
বাবার দুটো চোখ ঝাপসা। মুখটা দেখে মনে হচ্ছে, বাবাকে কেউ নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছে। কেউ শুধুমাত্র লেখার জন্য বা নিজের ভালবাসার জন্য লিখতে চায়—তাও আজকের প্রচারসর্বস্ব পৃথিবীতে! জয় এবার বোঝে, ভিড়ের মধ্যে তার বাবা মানুষটা সত্যি অন্যরকম।
পূর্বানুবৃত্তি
সকাল
থেকে একটা চিন্তা অস্থির করছে—‘বাবা’ বলে কতদিন ডাকা হয় না! ভাববাচ্যে একটা-দুটো
কথা সারা হয়। ছি ছি! ইদানীং বাবাকে বুঝতে খুব ইচ্ছে করে। বাবা কেন বাড়িতে, আত্মীয়মহলে উদাসীন? লাইব্রেরি-কাকুর সঙ্গে তো বেশ
গল্প করে। গতকাল বাড়ি ফেরার সময় রানাঘাট স্টেশনের বুকস্টল থেকে দুটো পূজা বার্ষিকী
কিনে এনেছে। বইগুলো এখনও দেখা হয়নি। ছোটবেলায় লাইব্রেরিতে নিয়ে গেলে বাবা নিজের
মতো বই খুঁজতে চলে যেতেন। কিছু বই থেকে আবার ওখানে বসে খাতায় লিখতেন। জয়কে বাবা
বলতেন, “তুই তোর মতো করে বই
দ্যাখ, আমার পাশে বসে পড়।”
কত বই!
জয় ঠিক করেছিল, একদিন লাইব্রেরিটার
সব বই পড়ে ফেলবে। বাবাকে বাড়ি ফেরার সময় জানিয়েছিল, হাতে ছিল ‘কাকাবাবু সমগ্র দ্বিতীয় খণ্ড’। বাবা মাথার চুলটা
ঘেঁটে দিয়ে বলেছিলেন, “ভেরি গুড। জানিস, তোর নামে একজন সাহিত্যিক
রানাঘাটে থাকতেন একসময়। তুই যে লাইব্রেরিতে বই ঘাঁটছিস, উনিও আসতেন এখানে। কত পুরস্কার পেয়েছেন, আমার প্রিয় কবি। তোর নামটা
আমি বলতে পারিস, ওঁনার নাম থেকেই ধার
করেছি।”
বাবা
জোরে জোরে হাসছিলেন। আর ওই রকম ‘দিলখোলা’ হাসি হাসেনি বোধহয় বাবা। জয় বইয়ের
আলমারিটার দিকে তাকায়। পাশাপাশি রয়েছে ‘কবিতা সমগ্র’ থেকে ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল’
অবধি। বাবার প্রিয় সাহিত্যিক,
এখন
জয়েরও প্রিয়। ‘খোলা হাওয়া’ শারদ
সংখ্যাটা তুলে নেয় জয়। চকচকে নতুন পাতা নাকের কাছে নিয়ে আসে, গন্ধ শুঁকবে বলে। ছোটবেলায়
পূজা বার্ষিকীগুলো হাতে তুলে দিয়ে বাবা বলত, “দ্যাখ,
কী
সুন্দর গন্ধ।” জয়ের এখনও নতুন বইয়ের গন্ধ শোঁকার অভ্যাসটা রয়ে গেছে। সূচিপত্রের
পাতাটা চোখের সামনেই ছিল। কবিতা বিভাগে একটা নামের দিকে চোখ যায়—‘অলক দত্তগুপ্ত’।
বাবা নাকি! দ্রুত হাতে খোলে ‘মোহনা’ শারদ সংখ্যাটা। সূচিপত্রের ছোটগল্প বিভাগে
রয়েছে অলক দত্তগুপ্তের নাম।
—বাবা কি তবে সিরিয়াসলি
লেখালেখি করছে? বলেনি তো!
এক্ষুনি
জানতে হবে। দুটো বই হাতে নিয়ে বাবা, বাবা ডাকতে ডাকতে সিঁড়ি ভাঙতে থাকে জয়।
অলকবাবু
ছিলেন ছোট থেকেই পড়ুয়া ধরনের। শান্ত মানুষটার মনের ভেতরে দীঘির পরিষ্কার জল ছিল এককালে।
অবস্থার গতিতে সেই পরিষ্কার জলে এত ঢেউ উঠল! তারপর একদিন কচুরিপানায় ভরে গেল। গত
চার-পাঁচ বছরের চেষ্টায় দীঘির জল আবার আগের মতো টলটলে হয়ে উঠেছে। অলকবাবু নিজেকে
পড়াশোনা, একলা ভ্রমণ আর
লেখালেখির মধ্যে ডুবিয়ে শান্তি খুঁজে পেয়েছেন।
মোবাইল
ফোনের গ্যালারিটা খোলেন। গত সোমবার গিয়েছিলেন হুগলি জেলার পান্ডুয়ায়। বাইশ
খিলানযুক্ত বড়ি মসজিদ, মিনার, জাফর খান গাজীর মাজার
দেখেছেন। তবে প্রবেশ করতে পারেননি, বলা ভাল, দেননি। কিন্তু গোটা
মাঘ মাস ধরে চলা মেলাটার কথা শুনেছেন, যেখানে হিন্দু-মুসলিম দুই ধর্মের মানুষ যোগদান করেন—কী অদ্ভুত! এই বিষয়ে কিছু
লেখার ইচ্ছে আছে।
প্রাথমিক
খসড়া সবসময় কাগজে করতে ভালবাসেন,
তারপর
তো ল্যাপটপ থাকল। সবে তথ্যগুলো লিখতে শুরু করছেন।
—বাবা, বাবা...
করে
হাঁফাতে হাঁফাতে জয়। পেছনে,
—কী হল রে?
বলতে বলতে
তমালিকা। থতমত খেয়ে কলমটা বন্ধ করেন অলকবাবু।
টেবিলের
ওপর রাখা দুটো শারদীয়া সংখ্যা। খোলা সূচিপত্রের একটা নামের ওপর আঙুল রেখে জয়
জিজ্ঞেস করে,
—বাবা, এটা তুমি?
‘বাবা’ ডাকটা কতদিন পর শুনলেন!
জয় বই পড়ে, তবে! তমালিকা
উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন বাবার থেকে জয়কে একটু দূরেই রাখতে চেয়েছিল। অলকবাবু জানেন, সংসারটা প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয়, তবু আজ আনন্দ হচ্ছে, কোথাও গিয়ে তমালিকাকে হারিয়ে
দিয়েছেন বলে।
—বাবা, তুমি কি লেখালেখি কর? বাবা...
ঝাপসা
চোখটা লুকিয়ে ঘাড় নেড়ে অস্ফুটে বলেন,
—হ্যাঁ রে।
এই
ঘরটা বড্ড খোলামেলা। রোদটা মুখের প্রতিটা রেখার ভাষা তুলে ধরছে। নিজেকে লুকানোর
জন্য বইয়ের আলমারির গা ঘেঁষে মুখ নীচু করে থাকেন তমালিকা। করুণা করতেন অলক
দত্তগুপ্তকে। বেচারি লেখে হয়তো কেউ ছাপে না। কাজের জায়গায় গুরুত্বহীন ছিলেন, লেখালেখিতেও ব্যর্থ। তমালিকা
কী করবে? কেন বিদ্বেষ জন্মাবে
না? ঘুরতে ভালবাসতেন, কোনোদিনও কোথাও ঘোরাননি।
সংসার-রান্নাঘর রোজ রোজ ভাল লাগে?
জোরে
ধাক্কা দিয়ে নিজের আর ছেলের জীবন থেকে ‘অপদার্থ’ লোকটাকে বের করে দিয়েছিলেন
বাউন্ডারির বাইরে। লজ্জা লাগছে এখন।
—বাবা, তোমার কোথায় কোথায় আর লেখাপত্র বের হয়েছে, আমাকে সেগুলো সব দাও। আমি
এক্ষুনি সব ফেসবুকে আপলোড করি। তোমার বোধহয় কোনো অ্যাকাউন্ট নেই, না? আচ্ছা,
খুলে
দিচ্ছি। এবার সব পোস্ট, শেয়ার করতে হবে। সবাই
জানুক, আমার বাবা এলেবেলে
না।
জয়ের
আজ গোবেচারা বাবার জন্য গর্বে বুক ভরে উঠছে। কত লোক বাবার লেখা পড়বে! ভাবা যায়!
এই
জন্যই কি মানুষ সন্তানের মধ্যে নিজের চিন্তা, রুচিকে রোপন করে? চলে যাওয়ার পরও তার চিন্তার তরঙ্গ কিছুটা হলেও পৃথিবীতে থেকে যাবে—এই লোভে? জয়ের আলো-ঝলমলে মুখটার দিকে
তাকিয়ে উত্তরটা পেয়ে যান অলকবাবু।
বহুদিন
আগে সংসারের চাপে নিজের লেখক হওয়ার ইচ্ছেটাকে নষ্ট করে চাকরি নিতে বাধ্য হন। জয়কে
পেয়ে ভেবেছিলেন, আবার নতুন করে সব
শুরু করবেন। ছেলের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার সঙ্গে নিজেও অল্পবিস্তর লিখতে শুরু
করেন। জীবন চলছিল। তবে এখন আর বোঝা মনে হচ্ছিল না। সেই ভাল লাগাটাও তমালিকা ঘষে
ঘষে মুছে দিল। এখনও রবিবার সন্ধ্যাটা চোখের সামনে দেখতে পান। লাইব্রেরি থেকে
দু’জনে গল্প করতে করতে বাড়িতে ফিরেছেন, তখনও পৈতৃক বাড়িতে। ঘর ভরা লোক। তমালিকা সবার সামনে ছেলের হাত থেকে বইটা নিয়ে
ছুড়ে দেয় খাটের ওপর। ক্লাস ফাইভের জয়ের সামনে মুখটা নীচু হয়ে যায়। ধীরে ধীরে ছেলে
সরে যেতে থাকে দূরে। ততদিনে শরতের নীলাকাশের মতো মনের আকাশটা দখল করে নেয় ধূসর
মেঘ। অলকবাবু নিজেকে গুটিয়ে নেন।
এত কথা
কি জয়কে বলা যায়? কিন্তু অভিমানগুলো
বেরিয়ে আসতে চাইছে। অলকবাবুর জমে থাকা নালিশগুলো জয়কে জানাতে মন চাইছে, যেন অলকবাবু ছোট ছেলে, জয় এখন বাবা। গল্প, কবিতা, লেখার খসড়া—সব কিছু এক্ষুনি
দেখাতে ইচ্ছে করছে। এ কী বিড়ম্বনা! জয়, জয় আমার জয়—আবেগের স্রোতটাকে অতিকষ্টে আটকান। জয়কে কীভাবে ছেড়ে যাওয়া লেখাকে
অনেক সাধ্যসাধনায় ফিরিয়ে এনেছেন,
এসব
কিছুই বলা হয় না। শুধু একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন।
—বাবা, আর কী কী লেখা প্রকাশ হয়েছে দাও। বাবা, কী হল?
সম্বিত
ফেরে অলকবাবুর। হাসতে হাসতে বলেন,
—ওরে পাগল, তোর বাপ কি সেই দরের লেখক, যে যার কথা দুনিয়াকে জানাতে
হবে? ঐসব করতে যাস না
বাবা। বহু কষ্টে লেখাটাকে জীবনে ফিরিয়ে এনেছি। এই হট্টগোলের ভয়ে সে বেটি যদি আমার
হাত ছেড়ে বরাবরের মতো চলে যায়,
তবে আমি
কী নিয়ে থাকব বল?
বাবার
দুটো চোখ ঝাপসা। মুখটা দেখে মনে হচ্ছে, বাবাকে কেউ নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছে। কেউ শুধুমাত্র লেখার জন্য বা
নিজের ভালবাসার জন্য লিখতে চায়—তাও আজকের প্রচারসর্বস্ব পৃথিবীতে! জয় এবার বোঝে, ভিড়ের মধ্যে তার বাবা মানুষটা
সত্যি অন্যরকম।
~~000~~
No comments:
Post a Comment