প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা | সম্পাদকীয় | রাজতন্ত্র

বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই কার্ত্তিক , ১৪৩৩ দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা সম্পাদকীয়   রাজতন্ত্র ...

Saturday, October 24, 2026

এখনও অন্ধকার [১ম পর্ব] | মহাদেব গুড়িয়া

বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই কার্ত্তিক, ১৪৩৩
দেবকুমার মুখোপাধ্যায় | ধারাবাহিক গল্প
মহাদেব গুড়িয়া
এখনও অন্ধকার
[১ম পর্ব]

একই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তুমি স্বনির্ভর হতে শিখবে, আর তোমার বোন শিখবে না—তা কী করে হয়? দোষ আমাদের এই সামাজিক কাঠামোয়। মুখে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বললেও তা শুধু শহরের গুটিকতক মেয়েরাই পেয়েছে।

 
এখান থেকে পিংকুকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওর হাতে বই, আধখোলা। দোতলার বারান্দায় রোদের দিকে পেছন ফিরে আরামকেদারায় বসে আছে। আমি একতলার এই ঘরটাতে বাড়িতে এলেই থাকি। বাবলুর চিঠি পেয়ে আজ সকালে এসেছি। কেমন যেন ওলট-পালট হয়ে গেল সব। খাওয়াদাওয়া সেরে শুয়ে আছি জানালার ধারে। মাথার ভেতর ঘুরঘুরে পোকার মতো অজস্র চিন্তা ঘুরে ফিরে যাচ্ছে।
 
সেদিন পিংকুর জন্য আমিই গিয়েছিলাম মাস্টারমশায়ের কাছে। আমাকে দেখতে পেয়ে ওঁর স্ত্রী ঘরের ভেতর বসালেন। মাস্টারমশায় বোধহয় সবেমাত্র স্কুল থেকে ফিরেছিলেন। জলযোগ করছিলেন কিছু। মাস্টারমশায়ের কাছে টিউশনি পড়ে আমি হায়ার সেকেন্ডারিতে ভাল রেজাল্ট করেছিলাম। বোনকেও যদি মাস্টারমশায়ের কাছে টিউশনি দেওয়া যায়, সে কথা বাবা কদিন থেকেই বলছিলেন আমার কাছে। মাস্টারমশায় বেরিয়ে এসে গামছায় হাত মুছতে মুছতে বললেন,
—তোমার বাবার সঙ্গে আজ সকালে দেখা হয়েছিল, বিমল। তোমার বোন এ বছর মাধ্যমিক দিয়েছে?
—হ্যাঁ। মাধ্যমিকটা বোধহয় আশানুরূপ হবে না। এইচএস যাতে ভাল হয়, সেজন্য প্রথম থেকেই আপনার কাছে,
—হবে না। ওভাবে ভাল রেজাল্ট হবে না। আমার দ্বারা সম্ভব নয়।
মাস্টারমশায় হঠাৎ এমনভাবে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, যেন অনেকদিন আগে থেকেই রেগে আছেন কোনও কিছুর ওপর।
—তুমি যখন হায়ার সেকেন্ডারি পড়তে, তখন তোমাকে মায়ের কাজে সাহায্য করতে হয়েছিল? বাড়ির হাজারো কাজও করতে হবে, আবার ভাল রেজাল্টও চাই—দুটো একসঙ্গে সম্ভব নয়।
আমি কিছু বলতে পারলাম না। কী আর বলব? যে কথা আমি বিশ্বাস করি, যা আমি সত্যি বলে জানি, সেই কথা তুলে কেউ যদি আঙুল উঁচিয়ে কথা বলে, তখন আর কী-ই বা বলার থাকে? আমি বলি,
—ঠিক আছে, ওইদিকটা আমি দেখব, যাতে করে ও পারবে না।
—হে ছোকরা—
মাস্টারমশায় আমাদের কাউকে বকুনি দেওয়ার সময় এ শব্দটা ব্যবহার করতেন,
—আমার বুড়ো হাড়ে কালি পড়ে গেল একই কথা বলতে বলতে। এ কারও একার কম্ম নয়।
অনেকটা হতাশ হয়ে মাস্টারমশায় চুপ করে যান।
 
ওঁর এক মেয়ে আছে, রূপা। আমার সঙ্গেই পড়ত। মাস্টারমশায়ের অনেক সাধ ছিল, ওকে নিজের পায়ে দাঁড় করাবেন। ওঁর স্ত্রী ঠিক মাস্টারমশায়ের উল্টোটি। কিছুতেই মতের মিল হতো না দুজনের মধ্যে। রূপা যখন ক্লাস টেনে পড়ে, তখন একদিন স্কুল ছুটির পর আমাকে হঠাৎ বলেছিল,
—জানিস, আমার না বিয়ে হবে।
কথাটা বলার পরই খিলখিল করা হাসি ওর বুকের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গেল।
—ধ্যাৎ!
আমি বিরক্ত হয়ে বলি,
—কে বলেছে তোকে?
—মা, আজ সকালে।
সেদিন পর্যন্ত জানতাম, বিয়ের কথা শুনলে মেয়েরা খুব লজ্জা পায়। রূপাকে দেখে বুঝেছিলাম, তার চেয়ে কতগুণ বেশি আনন্দ পায় ওরা। বললাম,
—এ কথা মাস্টারমশায় জানে?
—না, বাবাকে মা এখনও বলেনি। রাঙামাসি এসেছিল কাল। মাকে চুপি চুপি বলে গেছে।
রূপার সে বিয়ে মাস্টারমশায় হতে দেননি। তারপর থেকেই অশান্তি। রূপার আজও বিয়ে হয়নি। এমএ পড়ছে এখন। তবে পড়ার মতো নয়। মাস্টারমশায়ের চাপে। ওদিকে পাত্ররাও দেখতে আসছে মায়ের চাপে। মাঝখান থেকে রূপার শরীর, মন দুই-ই ভেঙে গেছে।
 
পিংকু মাঝে মাঝে বলে শুনি,
—দূর, আর পড়তে ভাল লাগে না। কী হবে পড়ে? আমাকে আর কেউ বিয়ে করবে না। মাঝে মাঝে তোদের মতো ছোট হয়ে যেতে ইচ্ছে করে রে।
আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি, মাস্টারমশায়ের আদর্শ ওর মনে একটুও দাগ কাটতে পারেনি। পরিবর্তে চারপাশে যা দেখছে, ওর মা দিনরাত যা বলছে, তার প্রভাব গভীরভাবে পড়েছে ওর ওপর।
 
আমি মাস্টারমশায়ের নীরবতা ভাঙাতে একটু সাহস সঞ্চয় করে বলি,
—আসলে নারী-শিক্ষাব্যবস্থাটাই পাল্টে ফেলা দরকার। যে শিক্ষা মেয়েদের স্বনির্ভর হতে শেখায় না, সে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে কী লাভ মেয়েদের?
—না। দোষ শিক্ষাব্যবস্থার নয়।
মাস্টারমশায় এবার স্বভাবসিদ্ধভাবে আস্তে আস্তে কেটে কেটে বললেন,
—একই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তুমি স্বনির্ভর হতে শিখবে, আর তোমার বোন শিখবে না—তা কী করে হয়? দোষ আমাদের এই সামাজিক কাঠামোয়। মুখে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বললেও তা শুধু শহরের গুটিকতক মেয়েরাই পেয়েছে। গ্রামের বা মফস্‌সলের অধিকাংশ মেয়েই এখনও বিয়ে হওয়ার মধ্যে নারীজীবনের সার্থকতা খুঁজে পায়। এজন্য তাদের দায়ী করা যায় না। তারা একটা ব্যবস্থার শিকার মাত্র।
আমি, তুমি, তারপর থেকে পিংকু মাস্টারমশায়ের কাছে পড়তে যাচ্ছিলাম। বাড়িতে বলে দিয়েছিলাম মাস্টারমশায়ের কথাগুলো। মাস্টারমশায়ের সঙ্গে সেদিন আরও অনেক কথা হয়েছিল। আমরা যেন পরস্পরের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। মত ও আদর্শের মিল হলে বন্ধুত্ব তখন বোধহয় আর বয়সের সীমারেখা মানে না।
আমার কী একটা প্রশ্নের উত্তরে মাস্টারমশায় বলেছিলেন,
—স্বাধীনতা পেলেই যে সব মেয়ে স্বনির্ভর হয়ে যাবে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই যেমন সব ছেলে জন্মসূত্রে স্বাধীনতা পেলেও অনেকেই স্বনির্ভর হতে পারে না।
অধিকাংশ মেয়েই স্বাধীনতা পায় না। যারা পায়, তাদের মধ্যে অনেকেই এর সঠিক মূল্যায়ন করতে না পেরে অপব্যবহার করে, আবার অনেকে সঠিক মূল্যায়ন করে। কোনও কোনও মহিলা আবার খুব চরমপন্থী। স্বাধীনতা তাদের কাছে আশীর্বাদের মতো। যে কোনও মূল্যে তারা একে রক্ষা করে। এদের জীবনটা একটু জটিল।
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)