
বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই
কার্ত্তিক,
১৪৩৩
দেবকুমার মুখোপাধ্যায় | ধারাবাহিক গল্প
মহাদেব গুড়িয়া
এখনও অন্ধকার
[১ম পর্ব]
দেবকুমার মুখোপাধ্যায় | ধারাবাহিক গল্প
মহাদেব গুড়িয়া
এখনও অন্ধকার
[১ম পর্ব]
একই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তুমি স্বনির্ভর হতে শিখবে, আর তোমার বোন শিখবে না—তা কী করে হয়? দোষ আমাদের এই সামাজিক কাঠামোয়। মুখে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বললেও তা শুধু শহরের গুটিকতক মেয়েরাই পেয়েছে।
—হবে না। ওভাবে ভাল রেজাল্ট হবে না। আমার দ্বারা সম্ভব নয়।
মাস্টারমশায় হঠাৎ এমনভাবে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, যেন অনেকদিন আগে থেকেই রেগে আছেন কোনও কিছুর ওপর।
—তুমি যখন হায়ার সেকেন্ডারি পড়তে, তখন তোমাকে মায়ের কাজে সাহায্য করতে হয়েছিল? বাড়ির হাজারো কাজও করতে হবে, আবার ভাল রেজাল্টও চাই—দুটো একসঙ্গে সম্ভব নয়।
আমি কিছু বলতে পারলাম না। কী আর বলব? যে কথা আমি বিশ্বাস করি, যা আমি সত্যি বলে জানি, সেই কথা তুলে কেউ যদি আঙুল উঁচিয়ে কথা বলে, তখন আর কী-ই বা বলার থাকে? আমি বলি,
—হে ছোকরা—
মাস্টারমশায় আমাদের কাউকে বকুনি দেওয়ার সময় এ শব্দটা ব্যবহার করতেন,
অনেকটা হতাশ হয়ে মাস্টারমশায় চুপ করে যান।
কথাটা বলার পরই খিলখিল করা হাসি ওর বুকের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গেল।
—ধ্যাৎ!
আমি বিরক্ত হয়ে বলি,
সেদিন পর্যন্ত জানতাম, বিয়ের কথা শুনলে মেয়েরা খুব লজ্জা পায়। রূপাকে দেখে বুঝেছিলাম, তার চেয়ে কতগুণ বেশি আনন্দ পায় ওরা। বললাম,
রূপার সে বিয়ে মাস্টারমশায় হতে দেননি। তারপর থেকেই অশান্তি। রূপার আজও বিয়ে হয়নি। এমএ পড়ছে এখন। তবে পড়ার মতো নয়। মাস্টারমশায়ের চাপে। ওদিকে পাত্ররাও দেখতে আসছে মায়ের চাপে। মাঝখান থেকে রূপার শরীর, মন দুই-ই ভেঙে গেছে।
আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি, মাস্টারমশায়ের আদর্শ ওর মনে একটুও দাগ কাটতে পারেনি। পরিবর্তে চারপাশে যা দেখছে, ওর মা দিনরাত যা বলছে, তার প্রভাব গভীরভাবে পড়েছে ওর ওপর।
মাস্টারমশায় এবার স্বভাবসিদ্ধভাবে আস্তে আস্তে কেটে কেটে বললেন,
আমি, তুমি, তারপর থেকে পিংকু মাস্টারমশায়ের কাছে পড়তে যাচ্ছিলাম। বাড়িতে বলে দিয়েছিলাম মাস্টারমশায়ের কথাগুলো। মাস্টারমশায়ের সঙ্গে সেদিন আরও অনেক কথা হয়েছিল। আমরা যেন পরস্পরের বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। মত ও আদর্শের মিল হলে বন্ধুত্ব তখন বোধহয় আর বয়সের সীমারেখা মানে না।
আমার কী একটা প্রশ্নের উত্তরে মাস্টারমশায় বলেছিলেন,
—স্বাধীনতা পেলেই যে সব মেয়ে স্বনির্ভর হয়ে যাবে, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই যেমন সব ছেলে জন্মসূত্রে স্বাধীনতা পেলেও অনেকেই স্বনির্ভর হতে পারে না।
অধিকাংশ মেয়েই স্বাধীনতা পায় না। যারা পায়, তাদের মধ্যে অনেকেই এর সঠিক মূল্যায়ন করতে না পেরে অপব্যবহার করে, আবার অনেকে সঠিক মূল্যায়ন করে। কোনও কোনও মহিলা আবার খুব চরমপন্থী। স্বাধীনতা তাদের কাছে আশীর্বাদের মতো। যে কোনও মূল্যে তারা একে রক্ষা করে। এদের জীবনটা একটু জটিল।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment