প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Saturday, December 9, 2023

পরকীয়া | প্রেমরোগ | অপর্ণা শীল ভট্টাচার্য

বাতায়ন/পরকীয়া/ছোটগল্প/১ম বর্ষ/২৬তম সংখ্যা/২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩০

পরকীয়া | ছোটগল্প
অপর্ণা শীল ভট্টাচার্য

প্রেমরোগ


উফ্ যেমন জামাকাপড়ই পড়া যাক না কেন মধ্যপ্রদেশটি ঠিক জানান দেবে যে আমি আছি... নাহ্‌ এবার একটু-আধটু ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে হবে দেখছি, কিন্তু করব কখন, সকাল হতে না হতেই তো নাকেমুখে গুঁজে বেরিয়ে পড়ি, ফিরতে সেই রাত্তির। তখন শুধু বিছানার টানটাই প্রবল হয়ে ওঠে।

বিভাস মনে মনেই গুমড়ে ওঠে। চারদিকে কেমন রঙিন জীবন... আর তারটাই এমন সাদাকালো। বউ আছে বটে একটা, কিন্তু সে ছেলে মানুষ করতে এত ব্যস্ত যে আর কোনদিকে তাকানোর ফুরসতই পায় না। ইদানিং মনে হয় একটাই তো জীবন, কবে যে ফস্ করে হাত থেকে বেড়িয়ে যাবে কে বলতে পারে... আজকাল তাই নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে সে... যে দিন গেছে তা গেছে... আগামী দিনগুলো নতুন করে বাঁচতে হবে... এই নামটাও যে কী মারাত্মক সেকেলে, কেন দুনিয়ায় আর কোন নাম ছিল না নাকি। নাম, চেহারা, নিজের কোন কিছুই বিভাসের পছন্দ নয়।

মা-বাবা তো গত হয়েছেন কবেই সুতরাং তাদের ডেকে যে অভিযোগের ঝুলি খুলে বসবেন সে সুযোগ নেই। বউকে এসব বলতে গেলেই হিহি করে হাসবে, বুঝবেই না কত মনের দুঃখে আছে সে। মনের দুঃখ মনে চেপেই কাটছে দিন... সত্যিই রক্তপাত যা হচ্ছে তা একমাত্র সে নিজেই জানে। একচল্লিশ বছর বয়স হয়ে গেল অথচ একটা জম্পেশ প্রেম হল না। কলেজবেলায় বেশ কয়েকটি মেয়েকে মনে ধরেছিল, কিন্তু কেউ পাত্তা দিল না যে... চাকরিজীবনের শুরুতে অফিসে একজনকে প্রপোজ করবে বলে মনে মনে তৈরি হচ্ছে তখনই জানতে পারল তার স্টেডি বয়ফ্রেন্ডের খবর। তাঁর এই মনমরা অবস্থা দেখে মা-বাবা আর দেরি করেননি তিরিশ হতে-না-হতেই সুশীলা একটি মেয়ে দেখে ছেলের বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। বিয়ের পর পর দিনগুলো বেশ রঙিন হয়ে গেছিল, কিন্তু বছর দুয়েক যেতে-না-যেতেই ছেলের বাবা হয়ে গেল বিভাস, আর বউ তার পর থেকেই ছেলের মা হতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল আর বিভাস তার রাগ আর বিরক্তি ফেলার ডাস্টবিন। স্বল্পভাষী বিভাস চুপচাপই থাকে নিজের মনে গুমড়ে... তবে ইদানিং একটা রোগ হয়েছে বিভাসের রাস্তাঘাটে কোন কমবয়সি প্রেমিকপ্রেমিকা দেখলেই মনটা কেমন ছটফট করে ওঠে, নিজেকে একজন ব্যর্থ মানুষ বলে মনে হয়। তেতো মনটা নিয়ে সারাটাক্ষণ খিটখিট করতে থাকে সে। সেদিন এক অফিস কলিগের বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে জানতে পারল তাদের ঘটকালি করেছে স্বয়ং মার্ক জুকারবার্গ মানে ফেসবুকের বন্ধুতা থেকেই প্রেম ও অবশেষে পরিণয়। হঠাৎ যেন একটা দরজা খুলে গেল, আজন্ম মুখচোরা, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনভ্যস্ত বিভাস একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে বসল। প্রোফাইল ফটো দিতে গিয়ে সমস্যা, নিজের এই মাথাজোড়া টাক আর স্ফীত মধ্যপ্রদেশ নিয়ে ছবি দিলে কে আর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবে? 'মুখের বই'এ বন্ধু হবার প্রথম ক্রায়টেরিয়া তো মুখই... অনেক ভেবে উপায় পাওয়া গেল নীল আকাশের ছবি দিয়ে তার প্রোফাইল নেম দিল আকাশনীল, আর চিন্তা কী কোন সত্যান্বেষীও আসল মানুষ খুঁজে পাবে না।

দেখে দেখে সুন্দরীদের সাথে বন্ধুত্ব পাতানোর কাজও হয়ে গেল। এখন সময় পেলেই সুন্দরীদের ছবিতে লাইক কমেন্ট করে বেশ দিন কেটে যাচ্ছে। তাদের সৌন্দর্যের প্রশংসা করে ছড়া কেটে, রোমান্টিক বার্তায় তার প্রেমিক মন কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পাচ্ছিল। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো আর কী...

কয়েকজনের সাথে মেসেঞ্জারে বেশ মিষ্টি মধুর আলাপের নামে প্রলাপও চলছিল বেশ। এর মাঝে গোল বাধল একদিন, অপরূপা নামে একটি মেয়ে ভিডিও কল করে বসল... বিভাস তখন অফিসফেরতা বাসে। কলটা রিসিভ করার জন্য হাত নিশপিশ করলেও ভয়ের চোটে ডেটা অফ করে দিল সে। অপরূপা রাগ করে তাকে ব্লক করে দিল। তারপর একটু সতর্ক হয়ে গেল বিভাস, রূপা, নীপা, সুইটি ইত্যাদি সুন্দরীদের সাথে আলাপ প্রলাপে কিছুটা বাঁধ দিল। তবে সে আর কতদিন, কথায় বলে বলা মুখ আর চলা পা আটকানো দায়, আর এ তো হল আটকে রাখা প্রেমের জোয়ার। বিভাসের কেমন নেশা ধরে গেছে, সবসময় মুঠোয় ফোন আর আঙুল ব্যস্ত। ইদানিং বউও খেয়াল করতে পেরেছে তার এই সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিকশন, বাঁকা চোখে তাকাতেও শুরু করেছে। সেদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে তাকে ফোন হাতে দেখে তো সে ফোন কেড়ে নিতে আসছিল, সঙ্গে বাক্যবাণ। বউয়ের এই রণংদেহী মূর্তিকে বিভাস বেশ ভয়ই পায়। সে যাত্রা বুঝিয়েবাঝিয়ে কোন মতে রেহাই পেলেও শেষরক্ষা হল না।

ইদানিং রূপসা নামে এক সুন্দরীর সাথে বিভাসের গভীর বন্ধুত্ব হয়েছে। রূপসা বিভাসের মিষ্টি কথার রসে ভিজে একাকার, আর বিভাস রূপসার রং রূপের সাগরে বিমোহিত, নিমজ্জিত। বিভাস এবারে একাধারে দুঃসাহসিক ও মরিয়া হয়ে উঠেছে... তায় আবার  রূপসা কথায় কথায় জানায় বাইরের রূপের থেকে অন্তরের রূপটাই আসল, মনের সৌন্দর্য মুখে ফুটে ওঠে ইত্যাদি... আর যায় কোথায়, বাঁধ ভাঙা বন্যায় ভেসে গেল বিভাস। অনেক চিন্তাভাবনার পর অবশেষে ডিসিশনটা নিয়েই নিল রূপসার সাথে প্রথমে ভিডিও কলে কথা বলবে, তারপর সাক্ষাতও করবে... যা হয় হবে, হয় এসপার নয় ওসপার।

ঠিক হল রাতের দিকে দুজনে ভিডিও কলে সাক্ষাৎ হবে। ছেলের মর্নিং স্কুল তাই বউ তাকে নিয়ে এগারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে, তাই এই রাতের সময়টাই বেছে নিয়েছে বিভাস। সিগারেট খাওয়ার নাম করে ছাদে উঠে এসেছে, বুকের ভেতরটা কেমন ধকধক করছে। সাড়ে এগারোটা নাগাদ মেসেঞ্জারে টুং করে শব্দ হতেই হৃৎপিণ্ডটা যেন লাফিয়ে উঠল। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা অন করে দেখল রূপসা লিখছে সে এখন ফ্রি, সুতরাং কল করা যাবে এবার...

বারদুয়েক রিং হতেই প্রোফাইল ছবি সরে গিয়ে স্ক্রিনে দেখা গেল আধো অন্ধকারে রূপসার মুখ... 'ও কী দেখতে পাচ্ছি না যে' বিভাসের কাতর কণ্ঠ। খিলখিল হাসির পর উত্তর এলো 'আমিও তো দেখতে পাচ্ছি না, দুজনেই ছাদের অন্ধকার যে...' বিভাস খুব চমকে গেল, এ কণ্ঠ তো তার চেনা, মাথার মধ্যে চেনা মানুষগুলোর ছবি হাতড়াতে হাতড়াতে সে বলল, 'তুমি আলোর কাছে এসো আমিও আসছি...' কিছুটা পরিষ্কার দেখা যেতেই চমক লাগল, আরে এ তো তার বউয়ের মাসতুতো বোন রেখা... যেমন রং তেমনই তার আকৃতি... তাই তো এখনো বিবাহযোগ্যা পাত্রী হয়েই আছে বিবাহিত হওয়া আর হয়ে ওঠেনি। ওই প্রান্তেও তখন একই অবস্থা ফেসবুকে বর খুঁজতে গিয়ে মিলল কিনা সাত চড়ে রা না কাড়া জামাইবাবু... দুপক্ষেরই একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। ঠিক তখনই কে যেন বিভাসের মুঠোফোনটি নিজের মুঠোয় ছিনিয়ে নিল... মহা সর্বনাশ, হে ধরণী দ্বিধা হও, বউ কখন পা টিপে টিপে ছাদে এসে হাজির হয়েছে তা বিভাস টেরই পায়নি। তারপর যথারীতি মহাপ্রলয়... ভূমিকম্প, অগ্ন্যুদগিরন... সে বর্ণনায় গিয়ে কাজ নেই, মহাভারত হয়ে যাবে।‌ তবে এই ঘটনার পর থেকে বিভাসের প্রেমরোগ ঘুচে গেছে, বউও তার কত্তার দিকে কড়া নজর দিচ্ছে।

শুধু বিভাস নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে মাঝেমধ্যেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

 

সমাপ্ত

3 comments:

  1. লঘুরসের গল্প, ভালো হয়েছে।

    ReplyDelete
  2. বেশ বেশ ।

    ReplyDelete
  3. সুধাংশু চক্রবর্তীDecember 23, 2023 at 12:12 PM

    বেশ -বেশ ।

    ReplyDelete

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)