প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Saturday, December 9, 2023

পরকীয়া | এ মন | জয়িতা ঘোষ হালদার

বাতায়ন/পরকীয়া/ছোটগল্প/১ম বর্ষ/২৬তম সংখ্যা/২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩০

পরকীয়া | ছোটগল্প
জয়িতা ঘোষ হালদার

এ মন


- আজকাল বড় একলা লাগে জানো আনন্দ।
- নন্দিনী, তোমাকে বলেছিলাম, আমার কাছে চলে এসো।
- বাঃ, তোমার সংসার, তার কী হবে?
- থাকবে সেটা তার মতো। চলবে, যেমন চলছে।
- আর আমি কোথায় থাকব? 
- জায়গার কী অভাব আছে? অন্য কোথাও আর একটা সংসার গুছিয়ে নেবো আমরা।

- আর তোমার স্ত্রী, সন্তান ওদের কাছে তুমি থাকবে না?
- হ্যাঁ, ভাগ করে নেব সময়টা। কখনো তোমার জন্য কখনো তাদের জন্য। তবে তো চিন্তাই নেই। 
- তোমার জন্য কোন সময়ই থাকবে না। নিজেকে বিকিয়ে দেবে আমাদের চাহিদা মেটাতে। আর আমার তোমাকে নিয়ে দেখা স্বপ্নগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে তছনছ হয়ে যাবে।
- উঁহু। তা কেন? আমার কাজ তো আমি করবই।
- ও আচ্ছা। তোমার কাজ কী বলো তো আনন্দ?
- এই তো কিছু ছবি আঁকা, কিছু গান গাওয়া, আর কিছু এলোমেলো ভাবনা নিয়ে লেখালিখি করা।
- হ্যাঁ, মশাই। এই নিয়েই তো আমার আনন্দের জীবন। এর মধ্যে নন্দিনী, আরো কিছু মানুষের আনাগোনা হলেই তা কী আর আমার আনন্দকে সুযোগ দেবে ওর সৃষ্টিশীলতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে!
 
এইসব নানাকথার বাঁধনে জড়িয়ে রাখে নন্দিনী।
আনন্দ বলে,
- এই যে আকাশ দেখছ ওরই মতো বিশাল আমার মন, আমার শক্তি। তোমার অনুপ্রবেশে সেখানে এতটুকু জায়গা দখল হবে না।
কিন্তু, নন্দিনীর এক কথা,
- এইই বেশ আছি। তুমি সুযোগ পেলে এসো, আমার শূন্য পেয়ালা ভরিয়ে দাও সুধায় সুধায়।
- আর আমার?
আনন্দ বলে ওঠে।
- আমার যে পেয়ালা ভরে না কখনো। একটু ছুঁতে পর্যন্ত দাও না তুমি। অনেক দিন আশা করেছি, দুবছরের সম্পর্ক আমাদের, এবার হয়তো তোমাকে স্পর্শের অধিকার এসেছে আমার। তবু প্রথমদিনের মতোই একটা অদৃশ্য ওড়নায় ঢেকে রেখেছ তুমি। তোমার গোলাপি নখের আভা, তোমার চোখের সম্মোহনী চাউনি আর তোমার গ্রিক ভাস্কর্যের মতো আবেশ জড়ানো মোহময় শরীরী ভাঁজ, আমাকে মধুলোভী ভোমরার মতো আকর্ষণ করে। তবু তোমায় ছুঁতে পারি না। কারণ তুমি চাও না। তোমাকে ভালবাসি তাই তোমার আবদার তোমার আদেশ সবই আমাকে মেনে নিতে হয়।
আজ একটা বিশেষ দিন আমার জীবনে, জানো আজকের এই দিনে তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম, সেই সবুজ পথের বাঁকে চলতে চলতে। মনে পড়ে, সেটা ছিল সদ্যভোরের আলো মাখা ভিজে ভিজে পাহাড়ি জংলা পথ। এক ধারে গভীর খাদ আর এক ধারে সবুজ বনানী, তার বুকে রাশি রাশি বুনো ফুলের সম্ভার নিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করছিল। তুমি চলছিলে একাই। আমি স্ত্রী-পুত্রের দায়িত্ব নিয়ে। একসময় পায়ে পা বেঁধে পড়ে গেলে তুমি, ঠিক আমারই সামনে। আর সেই মুহূর্তে তৈরি হোলো এক নতুন প্রেমের তাজমহল। সেই একদেখাই হোলো কাল, অভিসম্পাত। তোমার ওই ভ্রমর কালো চোখের অতলে আমি হারিয়ে গেলাম। তোমার হাতটা সেই প্রথম ও শেষ বারের মতো স্পর্শ করলাম, তুলে ধরলাম তোমাকে পাহাড়ি রুক্ষতার আঘাত থেকে।
- এই তো বলছ আমাকে রক্ষা করলে আঘাত থেকে। আবার বলছ অভিসম্পাত। এ কেমন কথা হোলো!
নন্দিনীর প্রশ্নে একটুও বিব্রত না হয়ে আনন্দ বলল,
- বাহ্‌-রে, তোমাকে উদ্ধার করে তোমাকে ভালবেসে তোমার জীবনে এলো সমুদ্রের জোয়ার। আর আমি যে তোমাকে কোনদিন পরিপূর্ণভাবে পেলাম না এ তো আমার অভিসম্পাতই বটে।
নন্দিনীর গালদুটো সোনালি আভায় রক্তিম হয়ে উঠল, বলল,
- আমাকে পাওয়ার এত আকাঙ্ক্ষা তোমার? কেন? এই যে মনে মনে মিলন আমাদের, তা কি অশেষ নয়? কেন পঞ্চরতির এত প্রভাব তোমার ওপর! তার চেয়ে চলো নদীর ওই পাড়ে একদল কচিকাঁচা বড় সুন্দর জলকেলিতে মগ্ন তাই দেখি। আর ওই যে গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে অস্তাচলের সূর্য আল্পনা আঁকছে তা দিয়ে মনকে সাজাই। এত কিছু ছড়িয়ে আছে তোমার আমার চারপাশে, সেদিকে কেন মন যাবে না তোমার? তোমার ছবির, তোমার লেখার রসদ নাও কুড়িয়ে এই প্রকৃতির চিত্রলিপি থেকে।’
- নন্দিনী, তুমি এমনভাবে কথা বলো যেন আমি এসব আগে দেখিনি। অথবা আমাকে তুমি ঊনবিংশ শতাব্দীর এক শিল্পী মনে করো। মনে রেখো, এ হলো বিংশ শতাব্দীর শেষ অঙ্ক। এত উন্নত আধুনিক যুগে শুধু প্রকৃতি নয় মানুষই কিন্তু শিল্পীর মূল প্রেরণার উৎস। তুমি কী কিছুই বোঝো না!’
- আনন্দ, এবার বোধহয় ফেরার সময় হয়েছে। পাখিরা সব ফিরে এসেছে গাছগুলো ভরে উঠেছে ওদের সারাদিনের ওড়াউড়ির সবিস্তার বর্ণণায়। কানে যেন আসছে পূরবীর বাঁশি নদীর ও পাড় থেকে। ওই ওই তো এক প্রবীণ, ওপারের ওই কদমতলায় বসে বাজাচ্ছে। চলো এবার দিনের ছুটির বাঁশির সুরে ঘরের পথে হাঁটি।’
- মনটা খুব ভার লাগছে নন্দিনী। আবার আসবে তো তুমি! কেন যেন মনে হচ্ছে, এই শেষ দেখা।’
মৃদু নিঃশব্দ হাসিতে ভরে উঠল নন্দিনীর মুখ।
- আসব আসব বার বার আসব, যতদিন ডাকবে আমাকে ততদিন আসব এভাবে। শহরের কোলাহল ছেড়ে, নির্জনে পৌঁছে যাব দুজনে মায়াবী ইতিহাসের পাতায়। পাখির ডানায় ভর দিয়ে উড়ব নদীর তীর ঘেঁষে। দেখব কচি কচি সবুজ শাখা আর নতুন আলো দেখা শিশুদের মুখ। খুব ইচ্ছে করে জানো, ওদের কাছে গিয়ে ভালবাসার গান শোনাই, যে গানের সুর ওদের এই স্বার্থসর্বস্ব দুনিয়ায় থেকেও মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখাবে।’
আনন্দ বলল,
- তবে তাই হোক। আগামীদিন আমরা আসব, ওদের কাছে যাব, আর ওদের নিয়ে নতুন কিছু করব যা আগে কখনো করিনি। বেশ নন্দিনী, আমরা আমাদের প্রেমের স্বাক্ষর রাখব ওই পথে পড়ে থাকা শিশুগুলোকে মানুষ করে গড়ে তুলে।’
 
দীর্ঘ দুটি বছরের প্রচেষ্টা আজ সার্থক। নন্দিনী আজ খুব খুব খুশি। মনটা পাহাড়ি ঝরনা হয়ে আনন্দে ঝলমল করছে। সে কোনদিন পারবে না সংসার করতে, সে কোনদিন পারবে না, মা হতে। অথচ, আনন্দকে দেখার পর থেকে তার এ ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠেছিল। আজ যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে তাতে আনন্দের সংসারও যেমন ছিল তেমনই থাকবে আবার তার আশাও পূর্ণ হবে। তার মতো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের কাছে এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে!

 

 

সমাপ্ত

1 comment:

  1. দারুণ লাগলো জয়ী 👌❤❤

    ReplyDelete

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)