বাতায়ন/পরকীয়া/ছোটগল্প/১ম
বর্ষ/২৬তম সংখ্যা/২২শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩০
পরকীয়া | ছোটগল্প
সুদামকৃষ্ণ মন্ডল
অভিসন্ধি
ঝড় উঠেছে। বাদল বাতাসে সমুদ্র উত্তাল। জলের শক্তি
কত গুণ বেড়েছে কেউ বলতে পারবে না। পুবের হাওয়ায় উত্তাল উদ্দাম বেপরোয়া।
রাক্ষসীর মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপে বুকের উপর নেচে বেড়ানো যেন সবাইকে গ্রাস করতে চায়।
এ হেন পরিস্থিতিতে সমুদ্রে জেলেদের লোভ সম্বরণ করা উচিত-অনুচিত না ভেবে মাঝি
বাইন্যা অর্থাৎ বেনুবাঁশি ছিল সমুদ্রে।
সমুদ্রের মানিক ইলিশ মাছ ধরার
জন্য বাইন্যার নামডাক আছে। বাংলাদেশে থাকাকালীন মাছ শিকারে সিদ্ধহস্ত। প্রত্যেক
ট্রিপে ভালই মাছ ধরে। কিন্তু এবারের ঝড়জলে পড়ে সবই যেন হতাশার সম্মুখীন। এতগুলো
প্রাণ আর তাদের প্রত্যেকের পরিবার ঝড়ের তান্ডব দেখে খুবই চিন্তিত। সংসারে রোজগেরে
পুরুষের যদি উত্তাল সমুদ্রে অকালমৃত্যু হয় ওই মাঝি তো প্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারবে
না। ভাগীরাও আগাত্তিয়াকে কোনও গুরুত্ব না দিয়ে স্বমহিমায় স্বেচ্ছাচারিতা অবলম্বন
করেছে। একমাত্র কারণ নবাগত কিশোরের জন্য। ওকে মারবেই মারবে। মারতেই হবে সমুদ্রে
কারণ ওখানে আইনের ছাড় পাওয়া যাবে। ভয়ে সবাই পরস্পরের গায়ে গায়ে আছে। মাঝি সোপান
ধরেছে আর শক্তির পরীক্ষায় যদি জিতে যায় তাহলে রেহাই না হলে সলিলসমাধি। সকলেই
কেবিনের বাইরে এসে তৈরি হচ্ছে। বিপদের হাত থেকে বাঁচতে ওয়াটারপ্রুফ জ্যাকেটসহ
লাইফজ্যাকেট গলিয়েছে। কিন্তু কিশোরের বয়স সতেরো হওয়ায় ইউনিয়নের অর্থাৎ
মৎস্যজীবী উন্নয়ন সমিতিতে নাম নথিভুক্ত করায়নি ফলে জ্যাকেট পায়নি। আর এমনিতে
ইচ্ছে করেই কিনে দেয়নি। পরে কিনব বলেছিল। ফলে কিশোর আতঙ্কে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
পাহাড় প্রমাণ ঢেউয়ের ঝাপটা নিতে হাল ঠিক রাখতে পারেনি। ফলে চোদ্দো জনের
মৎস্যজীবী ট্রলারটি এক ঝটকায় উল্টে গেল। পাশাপাশি অপর একটি ট্রলারের মৎস্যজীবীরা
ওদের বাঁচিয়েছে। সবাই বাঁচলেও কিশোর বাঁচেনি।
বাইন্যা মাঝি ফিরে এল কোটি টাকার ফিশিং বডি, জাল,
দড়ি আনুষঙ্গিক সব ফেলে। বাইন্যার উপপত্নীর ছেলে কিশোর। বাইন্যার নিজের ঘর-স্ত্রী-পুত্র-কন্যা
আছে। কিন্তু সম্ভোগের বাসনা প্রবল হওয়ায় কিশোরের মাকে দীর্ঘদিন দেখাশোনা করে।
স্বামী পরিত্যক্তা সুন্দরী লাবণ্যময়ী মলিনার একমাত্র সন্তান কিশোর। নিজের
শারীরিক-মানসিক-সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে পরিকল্পিতভাবে স্বজাতির কাজ শেখানোর
নামে নিজের সাথে রেখেছিল। বাইন্যার মেলামেশার অন্তরায় হত কিশোর। কোথাও নিয়ে যেতে
চাইলেও মলিনা সন্তানের কথা ভেবে যেত না। সন্তানের অজুহাতে এড়িয়ে যেত। মায়ের কোল
খালি করে যে পুরুষ, সেও কি সুখী হতে পারে? মালিক দোষারোপ করছে। কোটি টাকার সম্পদসহ
সারা বছরের ফিশিং বোটের সমুদ্র মানিক ইলিশের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আসার পথ বন্ধ হয়ে
গেল। সারা বছরের জন্য ভাগীদের সংসার রোজগার তছনছ হয়ে গেল। অথচ বাইন্যাকে ধরে
মলিনা বিলাপ করে কাঁদছে। সে বলল, ‘আঁই কী জানি ইতে অ্যান করি মরিব? সবই মা গঙ্গার
কৃপা! আঁ-র সো-নার চাঁ-দ কঁ-অর-ত্যে আই-ব?’ সন্তানহারা মায়ের বিলাপের ক্রন্দন সুর
তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করলেও নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য একটুও ব্যথিত নয়। সে আদর
আবেগে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বোঝায়, ‘আঁই তো আছি। যা চাঅর আঁই উপহার দিউম।’ হ্যাঁ
সে সন্তান উপহার দেবে। সে সন্তান মায়ের কাছে বৈধতা পাবে নিশ্চয়ই!
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment