প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Saturday, February 10, 2024

আয়না বাবা | নবী হোসেন নবীন

 

বাতায়ন/ছোটগল্প/১ম বর্ষ/২৯তম সংখ্যা/২৬শে মাঘ, ১৪৩০

ছোটগল্প
নবী হোসেন নবীন

আয়না বাবা


দুদিক হতে দুটি রাস্তা এসে গ্রামের মাঝখানে পরস্পরকে অতিক্রম করে দুদিকে চলে গেছে। এ চৌরাস্তার পাশে একটা প্রকাণ্ড পুরাতন বটগাছ। এ বটগাছটার নীচে গড়ে উঠেছে একটা ছোট বাজার। বটগাছটার ডালপালা হতে অসংখ্য শিকড়-বাকড় চতুর্দিকে জটার মতো ছড়িয়ে একটা সন্ন্যাস ভাব ধারণ করে আছে। দিনে অন্তত দুবার আমার বাজারে আসা হয়। কোনো কাজ না থাকলেও আসি চা পানের অছিলায় আড্ডা দিতে। একদিন সকালে এসে দেখি সর্বাঙ্গে লাল সালু জড়ানো এক সন্ন্যাসী

বটগাছের নীচে বসে গাঁজা টানছে। তার মাথার চুলে বটগাছের শিকড়ের মতো লম্বা লম্বা জটা ঝুলছে। গলায় ঝুলছে কাঁঠালের বিচির মতো বড় বড় দানার রংবেরঙের বেশ কয়েকটি মালা। হাতে পরা লোহা ও তামার অসংখ্য বালা। খানিকটা জায়গা পরিষ্কার করে নিয়ে এখানেই সে আস্তানা তৈরি করে নিয়েছে। দিনে দিনে এ আস্তানার যে শ্রীবৃদ্ধি ঘটছে তা এখন সহজেই নজরে পড়ে। চতুর্দিকে ঝুলে থাকা বটগাছের শিকড়ে এখন শোভা পাচ্ছে লাল ও হলুদ রঙের ফিতা এবং ছোট বড় অনেক রকম আয়না। আয়নার আধিক্যের কারণে এক সময় মানুষ তাকে আয়না বাবা বলে ডাকতে শুরু করে। সে নিজেও এ আয়না বাবা সম্বোধনটি বেশ পছন্দ করে।

ক্রমে ক্রমে গ্রামের এক শ্রেণির মানুষের সাথে তার সখ্যতা গড়ে উঠে। গাঁজাখোররা রাতে এসে গাঁজার আড্ডা জমায়। দিনের বেলায় কেউ আসে টোটকা নিতে, কেউ আসে হারানো জিনিস ফিরে পেতে, কেউ আসে ব্যর্থ প্রেমে সফল হতে, কেউ আসে আয়নায় নিজের ভূতভবিষ্যৎ জানতে। এভাবে এক সময় আয়না বাবা নামটা বাঁশিল গ্রাম হতে আসে পাশের আরও আট দশটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।

আয়না বাবা কথা খুব কম বলেন। সব সময় একটা গুরুগম্ভীর ভাব বজায় রাখেন। গাঁজার কলকে ছাড়া আর কোথাও চাঞ্চল্য দেখান না। আয়না বাবা এক দিন বটতলায় বসে কলকে টানছিলেন এমন সময় গ্রামের কয়েকটি যুবক হাবুর বউ মুন্নিকে নিয়ে এল আস্তানায়। মুন্নি বিলাপ করে কাঁদছে। আয়না বাবা মুন্নির দিকে চোখ তুলে তাকাতেই এক যুবক বলতে লাগল, এই বেটির কানের দুল হারিয়ে গেছে। স্বামী তাকে বেজায় মার দিয়েছে, শুধু তাই নয় সে বলে দিয়েছে আজ সন্ধ্যার আগে কানের দুল নিয়ে আসতে  না পারলে তাকে তালাক দিবে। আয়না বাবা গাঁজার কলকেতে কষে আরও দুটা টান দিয়ে কলকেটা বটগাছের গোড়ায় ঠেস দিয়ে রেখে দিল মুন্নি এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল এবার সে ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ে দুহাতে মাটি চাপড়িয়ে আরও বেশি জোরে ও সুরে কান্না শুরু করে দিল। মুন্নির কান্না শুনে ততক্ষণে অনেক লোক বটতলায় এসে জড়ো হল। আয়না বাবা তার সামনে পিছনে ও ডানে বামে অনেক আয়না থাকা সত্ত্বেও বট গাছের গোড়া হতে একটা কালো কাপড়ের থলে এনে তার ভেতর হতে বিশেষ ভাবে ফ্রেম করা একটা আয়না বের করল। আয়নাটি এক নজর দেখার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ল। আয়নার ফ্রেমটি রঙিন কাঠের বাঁধানো হলেও তার পিছনের পারদের প্রলেপ অস্বচ্ছ। এতে স্পষ্ট কিছু দেখা না গেলেও আবছা আবছা সব কিছুই দেখা যায়। কেউ কেউ বলা শুরু করে দিল এটা বিশেষ কুদরতি আয়না। আয়না বাবা আয়নাটি ভাল ভাবে পরখ করে বলল, আপনারা এমন এক জন বাচ্চা ছেলে নিয়ে আসুন যার এখনও গোঁফ-দাড়ি ওঠে নাই।

যেই কথা সেই কাজ। দশ-পনেরো মিনিটের মধ্যে এমন এক জন নাবালক বাচ্চা এনে আয়না বাবার সামনে হাজির করা হল আয়না বাবা ছেলেটির আপাদমস্তক পরখ করে তার বুদ্ধিমত্তা যাচাই করে নিলেন। তারপর ছেলেটিকে তার সামনে বসিয়ে নিজের গলা হতে একটা মালা খুলে ছেলেটির গলায় পরিয়ে দিলেন। তার শরীরে কয়েকবার ফুঁ দিয়ে ছেলেটিকে অলৌকিক আয়নায় গায়েবি দৃশ্য দর্শনের যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করলেন। তারপর সেই কুদরতি আয়নায় নিজের কাছে সংরক্ষিত বোতল হতে জেলির মতো ঘন তেল মেখে আয়নাটিকে ঘষা কাচের মতো অস্বচ্ছ করে ছেলেটির হাতে দিয়ে বললেন, খুব ভাল করে দেখ। যাকে দেখবে সে নারী না পুরুষ, বড় না ছোট, সবার সামনে সবই বলে দিবে। ছেলেটি অস্বচ্ছ পারদের প্রলেপ মাখা আয়নায় নিজের অস্পষ্ট ছবি দেখে নিজেকেই চিনতে পারল না। ততক্ষণে বটতলা লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে।। হাজার প্রশ্ন বাণে জর্জরিত হয়ে সে এমন এক ব্যক্তির বর্ণনা দিল যার সঙ্গে মুন্নির স্বামী হাবুর চেহারা মিলে যায়। চোর ধরার এমন কৌশল উপস্থিত জনতার কাছে চোরের পরিচয় স্পষ্ট না করে বরং আরও অস্পষ্ট করে দিল। সে যাই হউক পরের দিন সকালে বাজারে এসে দেখি বটতলার সব কিছু পুড়ে ছাই। আয়না বাবাও আর নাই।

 

সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)