প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Saturday, February 10, 2024

শেষ চিঠি | পারমিতা দে (দাস)

 

বাতায়ন/ধারাবাহিক/১ম বর্ষ/২৯তম সংখ্যা/২৬শে মাঘ, ১৪৩০

ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা দে (দাস)

 

শেষ চিঠি
২য় পর্ব

পূর্বানুবৃত্তি ছুটির দিনে একটানা হয়ে যাওয়া নিম্নচাপের বৃষ্টিতে রেডিয়োতে বেজে চলা রবীন্দ্রসংগীত শুনে আবিরার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ তার মনের কথা কী করে জানলেন। রেডিয়োটা আবিরাই বাবাকে দিয়েছিল মা মারা যাওয়ার পর। কাজের মেয়ে মিনতিদি একটা খাম এনে আবিরাকে দেন। খামের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে আবিরার প্রাক্তন প্রেমিকের চিঠি। তারপর…

যে কারণে আজ তোমার মূল্যবান সময় নষ্ট করা এবার সে কথায় আসি। কাল রাতে আমি বাবার এক ছাত্রীকে বিয়ে করেছি। মেয়েটার যার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল বিয়ের দিন বরের গাড়িটা খাদে পড়ে যায়। মেয়েটা আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল সেসব শুনে এমন করুণ পরিস্থিতি সামাল দিতে আমাকেই বসে পড়তে হল বিয়ের পিঁড়িতে। যদি আমি সেদিন বিয়ের পিঁড়িতে না বসতাম তবে গ্রামের অশিক্ষিত মানুষগুলো লগ্নভ্রষ্টার তকমা লাগিয়ে মেয়েটাকে তিলে তিলে মেরে ফেলত। আমি জানি না এই গোটা ঘটনাটাকে তুমি কীভাবে গ্রহণ করবে?

তুমি নিজের থেকেই আমার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছ তবে আমার বারবার মনে হয়েছে আমার কাজটা তোমাকে আগে জানানো উচিত। জানি না তুমি কোনো সম্পর্কে আছো কিনা! তবে আমার মন জুড়ে তুমিই ছিলে, এখনো আছো। আর ভবিষ্যতেও...

তোমার জায়গাটা আমি কাউকে দিতে পারব না আবিরা। তবে আমারও অভিমান ছিল তোমার ওপর জোর করিনি কখনো তুমি আমার অপেক্ষার মানে বুঝলে না। তোমার মনের যাই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকুক না কেন যদি সেটা তুমি সামনে আনতে খুব সহজেই সমাধান হতে পারত তুমি দীর্ঘদিন আমাকে না বুঝে সম্পর্কটা তেতো করে দিলে। নয়তো আজ এমন ঘটনা আমার সাথে ঘটত না।

আর হ্যাঁ এই ছবিটা তোমার আঁকা। তুমি এই ছবিটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলে এমন একটা ঘর হবে আমাদের। আমি ঘাড় নেড়ে আনন্দের সাথে সম্মতি দিয়েছিলাম। ঘর আর হল না আমাদের! তাই তোমার ছবি তোমাকেই ফিরিয়ে দিলাম। এ যন্ত্রণা গোটা জীবন তাড়া করে বেড়াবে আমাকে। তবুও বর্তমানকে নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। কোনোদিন ভালবাসতে পারব কিনা জানি না। তবু থেকে যাব আর পাঁচটা অসুখী দম্পতির মতো। সব শেষে এটুকু বুঝে গেছি নিজের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার গান গেয়ে যেতে হবে। থামলে চলবে না।

ভাল থেকো আবিরা। সুখে থেকো। পৃথিবীর সব আলোয় আলোকিত হোক তোমার ভবিষ্যত গন্তব্য।


'ইতি'
তোমার প্রাক্তন অনির্বাণ।

চিঠিটা পড়া শেষ করেই আমি তাকিয়ে রইলাম জানলার বাইরে। চোখের জল বাঁধ মানছে না। বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে আর আমার বুকের ভেতর তোলপাড় করে ঝড় উঠেছে। ঝড় এভাবেই ওঠে বোধহয় আকস্মিক। দীর্ঘ দিন জমতে থাকা নিম্নচাপ প্রকাণ্ড শক্তিশালী হয়ে কখন যে সব কিছু তছনছ করে দেয় সেটা আমাদের মতো ঘর পোড়া গোরুরাই বোঝে।


মনে মনে বিড়বিড় করে বললাম-
'ডুবে গেছে পুবের আলো, 
শূন্য দুচোখ মৃত্যুহীন।
যে ছায়া পথ ধরে হেঁটে যাবে তুমি
সেখানেই থেকে যাবে আমার স্মৃতিঋণ।'

কলম নিয়ে ছিলাম হাতে তবু থেমে গেলাম প্রত্যুত্তরে আর একটা চিঠি লিখব ভেবে। থেমে গেলাম মনে মনে, ভাবলাম কিছু গল্প অনির্বাণেরও অজানা থাক। তার নতুন সংসার সুখের হোক। অনির্বাণকে আমি নানান অছিলায় ফিরিয়ে দিয়েছি। আমি জানি এখানে ওর কোনো দোষ নেই। খামতিও নেই। তবে আমার আছে। ভীষণ ভাবে খামতি আছে। কী করে ওর সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলতে পারতাম যে আমি কোনো দিন তোমার সন্তান ধারণ করতে পারব না। কীভাবে বলতাম আমার দুটো ওভারি বাদ দেওয়া গেছে সিস্ট অপারেশনের পর। আসলে আমরা যারা ভালবাসি আমরা মন থেকে চাই কাছের মানুষটা সুখী হোক। বৈবাহিক জীবনে ইন্দ্রিয় সুখের বাইরে আরো এক ধরনের সুখ থাকে সন্তান সুখ। যেটা আমি জেনে বুঝে কেড়ে নিতে চাইনি ওর থেকে। তবে এই বৃষ্টি ভেজা দিনকে সাক্ষী রেখে বলতে পারি আমি এখনো অনির্বাণকে ছাড়া আর কাউকে চাইনি কখনো। আজ আমার এই আত্মবঞ্চনা বড়ই যন্ত্রণা দিচ্ছে আমায় তবে অনির্বাণ এর জন্য ভীষণ গর্ব হচ্ছে। এই ভেজালের পৃথিবীতে অনির্বাণের মতো মানুষকে একদিন আমি ভালবেসেছি। অনির্বাণ হয়তো আমায় ভুল বুঝে অনেকটা দূরে সরে গেছে। যতটা দূরে গেলে সব কিছুই ছোট হয়ে আসে, আবছা হয়ে আসে। যতটা দূরে গেলে মানুষ আর একটা মানুষের ভেতর ক্ষয় হতে শুরু করে। ক্ষয় হতে হতে একদিন নিঃশেষ হয়ে আসে। হয়তো একদিন আমিও তাই...

আমি নিজেই তো চেয়েছিলাম অনির্বাণ আমার থেকে দূরে সরে যাক তবে আজ কেন এত ঝড় উঠছে ভেতরে? কেনই বা দু কূল ছাপিয়ে ফুঁসছে নদী? এই উত্তর আমার জানা নেই।

আমি জানলার ওপারে চেয়ে আছি, অঝোর ধারায় বৃষ্টিতে পথঘাট গাছপালা ধুয়ে যাচ্ছে। চারপাশটা ধোঁয়া ধোঁয়া। ঝড়ে গাছগুলো অসম্ভব দুলছে কত পাখি ভয়ে উড়ে যাচ্ছে। ওরাও বুঝে গেছে আশ্রয়হীন হওয়ার আশঙ্কা। মানুষও বোঝে এমন করেই। শুধু বারবার বাসা বদলাতে পারে না। মৃত্যু আসবে জেনেও মৃত্যুর কাছেই নিজেকে সমর্পণ করে।

অনির্বাণ এখন আমার নয় অন্য এক মানুষের। ওর মন শরীর আত্মার ওপর অন্য এক মানুষের অধিকার। অথচ আমি ওকে এখনো আগের মতোই ভালবাসি। আগের মতো করেই চাই। আজ থেকে পরের স্বামীর প্রতি আমার কোনো অধিকার থাকবে না। থাকতে নেই।

তবু বুকের ওপর পাথর রেখে চাইব, অনির্বাণের দাম্পত্য জীবন সুখের হোক। ভাল থাকুক এই পৃথিবীর সকল অনির্বাণের মতো পুরুষেরা। আর আমরা স্মৃতিচারণ করে দূরে সরে যাওয়া মানুষগুলোকে জাগিয়ে রাখি রাত পাহারার মতো ভালবাসায়, শ্রদ্ধায়।


তবু আজ যা কিছু লেখা বাকি থেকে গেল তা লিখে দিলাম কবিতায়,
"তোমাকে কখনো বলতে পারিনি, তোমার প্রস্থানেই অস্তমিত সূর্য ঝুঁকে পড়েছে আমার বারান্দায়।
আমার আর কোনোদিন আলোর কাছে পৌঁছানো হল না অনির্বাণ!"

 

সমাপ্ত

1 comment:

  1. খুব ভালো লাগলো ম্যাডাম

    ReplyDelete

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)