প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা

মননশীল কলমকে উৎসাহ দিতে... পড়ুন, পড়ান, আপনার মূল্যবান মতামত দিন।

রং | প্রতিজ্ঞা

  বাতায়ন/ রং /সম্পাদকীয়/২য় বর্ষ/ ৩ ২তম সংখ্যা/ ২৯শে ফাল্গুন ,   ১৪৩১ রং | সম্পাদকীয়   প্রতিজ্ঞা "নির্ভীক একটি ফুলের মতো মেয়েকে চরম লাল...

Monday, June 3, 2024

যুগলবন্দি | সখা— চন্দ্রাবলী বন্দ্যোপাধ্যায় ও সখী— অজয় দেবনাথ



বাতায়ন/ত্রৈসাপ্তাহিক/হলদে খাম/২য় বর্ষ/৩য়/বীথি চট্টোপাধ্যায় সংখ্যা/১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১

হলদে খাম | যুগলবন্দি | সখা— চন্দ্রাবলী বন্দ্যোপাধ্যায় ও সখী— অজয় দেবনাথ

চন্দ্রাবলী বন্দ্যোপাধ্যায়

সখা—


তোমাকে,
 
কেমন যেন এক অলসতার আলুথালু ভাব পেয়ে বসেছে আমাকে। রোজ দিনের রোজনামচার ফাঁকে তোমার মুখোমুখি বসি রাত্রির মধ্যযামে। অনুভূতির ছায়ালোক পেরিয়ে তোমার সে উষ্ণ পরশ পাবার আকাঙ্ক্ষায় মন বড়ই ব্যাকুল থাকে। 
আমার অলস পেলব মনে তোমার সে দয়াল রূপ ধরা পড়ে না আর তেমন করে। বাইরের গাঢ় অন্ধকারের বুক চিরে আর আমার লেখার খেয়ালের পাশে এসে বসো না। আমার কল্পিত মন তোমার মুখে বাণী বসিয়েই দিব্বি আলাপনে মত্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু সে কল্পনার তুমি, আমায় আর চিঠি লিখতে অনুরোধ করো না। আজ আমি আমার সব কল্পনার ঘরে তালা ঝুলিয়ে একান্তে বসেছি আমার খোলা খাতা নিয়ে। লিখতে চাই যে অনেক কথা। কল্পিত মায়ালোকের আলাপচারিতায় যে কথা যায় হারিয়ে, বলতে চাই আজ সেই কথাগুলিই।
 
তোমার এখন বিস্তর কাজের চাপ, কতই না মহাজনের সাথে ঘনিষ্ঠতা, কথার ফুলঝুরি। তার মাঝে আমায় দেবে ঠাঁই, এমন চিন্তাও বড্ড বেশি পর্দার আড়ালের সেকালের রমণীদের মতো। এ যেন খোঁপায় মালা পরে, আতর মেখে, কপালে চন্দ্রটিকা এঁকে সজন-সুজনের পদধ্বনির প্রতীক্ষা করা। না না, সে আমার স্বভাবের আঙিনায় কোনো এক কোণেও অবস্থান করে না। ভাবছ বুঝি, তবে অভিযোগ কেন? তোমার মনে যখন আমার ডাক শুনি, আমার উদাস বাউল মন, খেয়ালি বাতাসে গা ভাসিয়ে দেয়। আমার গেরুয়া মনে যে আর বাতাস হাতছানি দেয় না।
আমার দখিনা জানালার পাশে আজ আমি নিরালায় একা। দোহাই তোমার, একে নিয়ো-না বেদনাক্লিষ্ট অভিযোগ হিসেবে।
অবিরাম বৃষ্টির ধারায় ধরা যে পরিপূর্ণ। ধুয়ে গেছে সব মলিনতা। মুছে গেছে যত ধূলিকণা। অনুভব করলাম আমার ভিতরের জমা কান্নার দাগও ধীরে ধীরে ধুয়ে যাচ্ছে ওই বারিধারায়। সবুজ সবুজ সবুজ- চারিদিকে সবুজের সমাহার। তবু আমার এই অবুঝ মনে কেন সেই রঙের এত অভাব? ভেবো না এ দায় তোমার। তোমার মন আমার মতো চঞ্চল অধীর নয়। বলেছিলাম বুঝি কোন একদিন... হব না বিচলিত। পেয়েছি নতুন পথের দিশা। কথা রাখা হল না আমার। তুচ্ছতা থেকে মুক্তি? এ বড়ই শক্ত। এতদিন তোমার সাথে মনে মনে হাঁটলাম কতই না পথ। কিছু তো তার আভাস রয়ে যাবেই। তাই এই স্বীকারোক্তি নিজের কাছে।
যা পাওয়া যায় সহজেই, তার মূল্য থাকে না বেশিদিন। তাই তুমি থেকো অধরা-অমূল্য হয়েই। নিত্যদিনের কল্পনায় তোমাকে ছোঁওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমার আকুলতা বাড়ালেও তোমার মনকে ভারাক্রান্ত করবে না- এ বোধহয় বলাই যায়।
বেশ লাগে তোমার জীবনযাত্রা। কেমন সুন্দর ছন্দে তালে সুরে মাতোয়ারা তোমার জীবন। ইচ্ছে হলেই ডানা মেলে উড়ে যাও তোমার খুশির আকাশে, কিংবা কোন অজানা পথে।
তোমার আমার কথোপকথনে কতই না আলাপ-বিলাপের সাত সুর ঝংকৃত হয়। তারই রেশ রয়ে যায় আমার বাকি সময়ের কঠিন বাস্তবের ছন্দহীন জীবনে। তোমার একটা কথা বেশ লাগে- “পারলে এসো।” কী করে বোঝাই, মন যে তোমার ডাকে সাড়া দেবার জন্য ব্যাকুল থাকে। মাঝে মাঝে তোমার বক্রোক্তিগুলো কিছু হলেও বেদনা দেয়। কিন্তু মনে হয় তুমি সত্য ভাষণ করো। আর এটা মনে হলেই বেদনা যায় সরে। আর তোমাকে পরম মিত্র মনে করে ক্ষমাসুন্দর ভালবাসায় বেঁধে ফেলি মনে মনে। আমি জানি না তুমি আমার লেখা ঠিক ঠিক পড়ো কি না? ধরে নিই সবটুকু অনুধাবন করো। কিন্তু কী অদ্ভুত! কখনো প্রকাশ করো না তার আভাসটুকু। কেন? তোমার কী মনে হয়? আমি দুর্বল হয়ে পড়ব? না না, এ ধারণা মনে এনো না। শুধু তো কিছু সময় ভাবনার বিনিময়ে কাটানো- এইটুকুই থাক।
তোমার একটা বিষয় মনে দাগ কাটে। সারাদিনের ফাঁকে নিজের ভাবনাটুকু আমার অজান্তেই আমাকে দিয়ে যাও। আর প্রশ্ন রেখে যাও- আমি ভাল আছি কি না। ভাল বোধহয় থাকি না। তবু ভাল থাকতে হয়। ওটাই জীবনের কঠোর নিয়ম। অবলীলায় লিখে রাখি- “ভাল আছি।”
আমি জানি, আমার এই ছোট্ট কথাটুকুর আড়ালের গভীর দীর্ঘশ্বাস তোমার কাছে ধরা পড়ে ঠিকই। কী সুন্দর প্রসঙ্গের পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলে আমার মন ভোলানোর চেষ্টা করো? দু-জনেই দুজনকে আড়াল করলেও দুজনেই ধরা পড়ি দুজনের কাছে। এটাই বোধহয় বিশ্বাস। এটাই ভালবাসার আশ্বাস।
মনে পড়ে তোমার সাথে গভীরতার সূত্রতা। শেষটুকু তো আমাদের হাতে নেই। সময়ের স্রোতে কোথায় ভেসে যাবো, বা তলিয়ে যাব সে ভবিষ্যৎ জানার মতো দ্রষ্টা আমি নই। তাই, থাক আজকে এই মুহূর্তটা সত্যি হয়ে।
তুমি ভাল থেকো। আমি ভাল আছি।
 
ইতি—
সখী


অজয় দেবনাথ 
সখী—

তোমাকে সখী,

মাঝেমধ্যেই তোমার পরশ পাই। যেখানেই যাই না কেন আমার সমস্ত অন্তর জুড়ে শুধু তুমিই বসে থাকো। হ্যাঁ শুধু তুমিই। আমার সমগ্র চেতনা, সমস্ত অনুভূতি শুধু একটা কথাই বলে, তুমিও আমাকে ভেবে অন্তহীনভাবে কাব্যগাথা রচনা করছ তোমার মনে। আমি নিশ্চিত জানি এবং মনে মনে খুশি হই আর অসম্ভব সুখানুভূতির সাগরে অবগাহন করি। যদিও সে-কথা আমাকে বলা বা লেখা তোমার সাধ্যে কুলোয় না। তবুও এ কথা জেনে তৃপ্তি পাই অন্তত একজন সুন্দরী, বিদুষীর হৃদয়াসন অধিকার করেছি আমি।
কেন হঠাৎ এসব কথা লিখছি? তুমি নিজের মতো করে জানো আমি এখন আর তোমাতে বাধ্য নই। কিন্তু সেটা তোমার একান্তই নিজের মনগড়া কথা। আমার কথা কবে আর জানতে চেয়েছ তেমন করে! হয়তো ভাবো, মহাজনের চাপে আমি ফুরসত পাই না। হ্যাঁ, ফুরসত পাই না কাজের চাপে, তৃতীয় কোন ব্যক্তির চাপে নই। শুধু আমিই আমার মনের একচ্ছত্র অধিপতি।
আচ্ছা তোমার মনগড়া ধারণাতেই তুমি অভিযোগ করো না কেন আমার কাছে! কেন দাবি করো না তোমার অধিকার! আমার কথা একবার শুনে দেখো, চোখের জলের বন্যায় সব মলিনতা ধুয়ে সম্পূর্ণ নতুন রূপে দেখবে আমায়। আমি যে সে জন্যেই…
এখন রাত সাড়ে তিনটে, প্রায় ভোর বলাই চলে। একটা স্বপ্ন দেখলাম, তোমাকে। অচেনা একটা জায়গা, নদীর ধার, চারিদিকে সবুজে সবুজ, ঠিক আমাদের বাংলার মনোরম গ্রাম। তুমি এসেছ, আমি এসেছি। বড় বড় গাছ, গাছ থেকে একটা দোলনা ঝুলছে। সেই দোলনায় দোল খাচ্ছি আমরা, কখনো-বা গাছতলায়, গাছের কোলে উঁচু উঁচু শিকড়ের ওপর অনেকটা বেদির মতো, বসে আছি দুজনে। তুমি আমার কোলে চিৎ হয়ে বসে পা ছড়িয়ে গলা জড়িয়ে ধরেছ। আমি দুহাতে তোমার মুখ ধরে অপলক তাকিয়ে তোমাতে। হয়তো-বা আদর করছি, পরম আবেশে, আয়েশে তুমি আমাতে সমর্পিতা।
শুনেছি ভোরের স্বপ্ন সত্যি হয়। সত্যি হয় কিনা জানি না, কিন্তু আবারও সত্যি হলে মন্দ কী? মনে হয় যেন গতজন্মের কথা। ঘুম ভেঙেই লিখতে বসেছি তোমাকে, থুরি ভুল বললাম বিছানায় আধশোয়া হয়ে লিখতে বসেছি ডায়েরি। একদিন নিশ্চয়ই তোমার হাতে পৌঁছবে, কী রূপে তা অবশ্য… হঠাৎ এখনই খোলা জানালা দিয়ে চোখ পড়ল আকাশে, গতকাল পূর্ণিমা ছিল, পূর্ণিমার চাঁদ তার অপরূপ মোহ বিস্তার করে পশ্চিমের দিকে ঢলে পড়েছে। এমন অপরূপা চাঁদের মধ্যে তোমারই মুখ দেখতে পাচ্ছি আমি, আর যত দেখছি অবাক বিস্ময়ে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছি। তুমি কী করে এত সুন্দরী! একটা গানই শুধু মনে আসছে এখন, ‘ওগো চন্দ্রবদনী সুন্দরী ধনী তোমায় দেখে কী ভোলা যায় / সখী চন্দ্রবদনী…’ আচ্ছা সখী, কী বেশে তুমি ধরা দেবে আমার কাছে? এক-একসময় তুমি এক-এক রূপে সাজো। কখনো কৃষ্ণকলি, কখনো রাধিকা, কখনো চিন্তামণি আবার কখনো-বা সুপ্রিয়া। এখন নাহয় কৃষ্ণকলি হয়েই এলে, অবশ্য সব রূপেই তুমি অনন্যা।

হয়তো মনে ভাবছ, টাইমমেশিনে সওয়ারী হয়ে কেন পিছিয়ে যাচ্ছে না বয়স। বিজ্ঞান এতকিছু আবিষ্কার করা সত্ত্বেও কেনই-বা এইবেলা এত কঞ্জুস, এখানেই তার যত সীমাবদ্ধতা। আসলে এরই নাম সময়। সময় আর নদীর স্রোত একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না যে। তবু মন যদি সত্যি চায়, বয়সকে পাঠাও গোল্লায়। বরং সময়কে অস্বীকার না করে একবার ঝাঁপ দিয়েই দেখো, দেখবে বয়সও হেরে যাবে ইচ্ছেশক্তির কাছে। সত্যি কথা বলতে কী, আমারও খুব ইচ্ছে করে তোমায় নিয়ে সত্যি সত্যি হারিয়ে যেতে অজানার দেশে। যদি তোমার সাধ্যে কুলোয়, যদি একটু সাহস সঞ্চয় করতে পারো।
আর কী? ভাল থেকো। পারলে অন্তত একবার এসো।
 
ইতি—
শুধু তোমার সখা, আমি।
 
পুনশ্চঃ— তুমি বিশ্বাস করো আর না-ই করো একটা কথা জেনে রাখো, শুধু তোমারই জন্য বসে আছি। এ কথা আমার অন্তর থেকে বলছি, আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় তোমার যে স্থান, সে স্থান আমি কাউকে দেবো না। চিরটাকাল আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে আগলে রাখব, যতদিন তুমি না আসো। কী গো সখী, আসবে না? 


4 comments:

  1. ভালোই।বেশ হয়েছে।সুশান্ত গঙ্গোপাধ্যায়

    ReplyDelete
    Replies
    1. অজয় দেবনাথJune 10, 2024 at 6:19 AM

      আন্তরিক ধন্যবাদ সুশান্ত-দা। ধৈর্য ধরে পড়া এবং নিজের পরিচিতিসহ মতামত জানানোর জন্য বাতায়ন পরিবারকে কৃতজ্ঞতা পাশে বাঁধলেন। সঙ্গে থাকুন।

      Delete
  2. চলেছে চলবে

    ReplyDelete
    Replies
    1. অজয় দেবনাথJune 10, 2024 at 6:22 AM

      ধন্যবাদ বন্ধু। আপনার পরিচয় পেলে খুব ভাল লাগত, আশা করব নির্দ্বিধায় ভবিষ্যতে নিজের পরিচয় দেবেন। ভাল থাকুন, সঙ্গে থাকুন।

      Delete

মোহিনীমায়া


Popular Top 10 (Last 7 days)