বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক/২য় বর্ষ/১০ম সংখ্যা/২৫শে শ্রাবণ, ১৪৩১
ধারাবাহিক গল্প
বড়ো মায়া হে
"হাড়িকাঠে ছাগশিশুর গলা চড়ানো মাত্র ভক্তদের "জয় মা" ধ্বনিতে কেঁপে ওঠে আকাশ বাতাস, চাপা পড়ে ছাগলের ভীত আর্তনাদ। ঘাতকের খড়্গ কোপ নেমে আসছে মুহূর্তে। মাথা ছিন্ন হয় পশুর দেহ থেকে, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে এসে ধুয়ে দিচ্ছে মন্দির চাতাল। মুণ্ডুহীন ধড়টা কিছুক্ষণের জন্য ছটপট করে নিথর হয়ে পড়ে থাকে একপাশে, মৃত্যুর আগে বিধাতার কাছে চার পা ছুঁড়ে নালিশ জানিয়ে যায় যেন পশুটি।"
ছেলের কাণ্ড দেখে পুষ্প
আড়ালে বলে, "পেলু! ন্যাকামি যত দেখতে পারো। ছাগল তো নয় কালো মোষ একটা।" অবশ্য এই কথা
সাধনের সামনে বলবার জো নেই।
সাধনের মেজাজ বুঝে আরতি
মাঝেমধ্যে স্বামীকে বলে, "ছাগল নিয়ে যত সব আদিখ্যেতা!"
বউয়ের কথা শুনে সাধন
হেসে বলে "বড্ড মায়া রে! ওদের ভালবাসা বুঝতে হয়।"
দিনে দিনে পেলুর উপর
সাধনের ভালবাসা বেড়েছে। সেই নিয়ে পাড়া ঘরে কথা শুনতে হয় আরতিকে, পুষ্পকেও।
বিয়ের চার বছর পরেও কোলে সন্তান আসেনি আর সাধনের পেলু-প্রেমে পাগলামি এই দুই
বিষয়কে এক সূত্রে গেঁথে হাজার কথার পাহাড় গড়ে পড়শিরা।
পুষ্প বহুবার ছেলেকে
বলেছে, "মায়ের কাছে মানত-করা পাঁঠা, ওকে বাড়িতে পালতে নেই সাধন, বলি দেবার
ব্যবস্থা কর। নয়তো মায়ের অভিশাপে ছারখার হবে সংসার।"
পুষ্পর কথা কানে নেয়
না সাধন। বলে, "হোক ছারখার। বলি দিয়ে মায়ের আশীর্বাদ পেতে হবে নে
তোদের।"
আরতি কিছু বলতে গেলে
সাধন বলে, "ছেলেপিলে ঠিক হবে। ডাক্তার দেখছে তোকে, বলেছে সবুর করতে, সন্তান
হবে। তার জন্য পেলুকে হাড়িকাঠে গলা দিতে হবে নে, ফের যেন এমন কথা না শুনি।"
আড়ালে আবডালে আরতিকে
বোঝায় পুষ্প। "তুই একটা কিছু কর বউ, সাধনকে বোঝা। এ অনাচার আর সইতে পারিনে।
মায়ের কাছে মানত করেও বলি দেওয়া হলো না, চার বছর চলে গেলো!"
বুড়ি কালীর মাহাত্ম্য-কথা
প্রায় রোজই শোনে আরতি। সবাই বলে মা জাগ্রত। তবে পশু হত্যার কথা ভেবে খারাপ
লাগে আরতির। শাশুড়িকে সে কথা অন্য ভাবে বলে আরতি, "আপনার ছেলে কার কথা শোনে
মা?"
বউমার মুখে এমন কথা
শুনে ভিতরে ভিতরে হতাশ হয়েছে পুষ্প। আরতি কেমন বউ যে স্বামীকে বশে আনতে পারে না!
ঘরেবাইরে নিজের মন কষ্টের কথা বলে পুষ্প।
পাল বাড়ির মেজো বউয়ের
কাছে তেমন কথাই বলেছে পুষ্প। সেই কথার রেশ ধরে আরতি ফুঁসছে আজ, তার কারণ আছে।
নবীন বলে, "তোমার
নিন্দে করবার জন্য তেমন কিছু বলেনি তোমার শাশুড়ি। আজ কত বছর ধরে আশা করে বসে আছি
আমরা…।” চোখের জল মোছে নবীন।
"আমি কী ইচ্ছে করে…।”
কথা সম্পূর্ণ না করে রান্নাচালায় আত্মগোপন করে আরতি। অমানিশার জমাট আঁধারের মতোই
এক করুন নীরবতা নেমে আসে বাড়িতে।
সংসারে আর পাঁচটা
বিবাহিত মেয়ের মতো আরতিও চায় তার কোলে সন্তান আসুক। গর্ভে সন্তান ধারণ করে দশ
মাস দশ দিন তার আসার পথ চেয়ে ব্যাকুল হয়ে বসে থাকতে মন চায়। পাশের বাড়িতে
বাচ্চা কাঁদলে তারও মন কেঁদে ওঠে সবার অলক্ষ্যে, কেন কাঁদে, সে কথা বলে বোঝাতে
পারবে না আরতি।
বাপ আর বউয়ের এমন বাক্বিতণ্ডা
শুনে ভীষণ বিরক্ত হয় সাধন। ঝগড়া, কথা কাটাকাটি এক্কেবারে অসহ্য সাধনের। সংসারে
উত্তপ্ত আবহাওয়া দেখলেই বাপ মা বউ কাউকে রেয়াত না করে সাধন বলে "চললুম আমি,
তোরা যা ইচ্ছে যায় কর। চোখের সামনে খামচাখামচি সহ্য হয় নে আমার।", আর তখনই
শান্ত হয় বাড়ি। আজ সাধনের হুমকি গ্রাহ্য করেনি আরতি, নবীনও। "একে পেলুকে
নিয়ে চিন্তা, তার মধ্যে তোদের ঝগড়া!" হুংকার দেয় সাধন। বলে, "তোরা
থামবি! পেলুকে না পেলে দেখ কী করি। দেশ ছেড়ে পালাব।”
নবীন চুপ করে যায়। তবে
আরতির কান্নার সুর আবহে বাজতে থাকে করুণ হয়ে।
এই সময় উঠোনে পা রাখে পুষ্প। সাধনকে দেখে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ছেলের কাছে আসে।
বলে, "ও সাধন আমাকে যা ইচ্ছে সাজা দে বাপ। আমি আটকাতে পারলুম না। না জানি
এতক্ষণে…।”
পেলুকে বাড়ি আনতে
গিয়ে বিপদে পড়েছে পুষ্প। তাড়া করেছে শেয়ালে। পুষ্পর হাত ফসকে দৌড় লাগিয়েছে
পেলু। পিছন পিছন যেতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে পুষ্প। ভীষণ চোট পেয়েছে পায়ে।
খুঁড়িয়ে হাঁটছে তাই।
মায়ের কথা শুনে মাথায়
আগুন জ্বলে সাধনের। "সময় থাকতে পেলুকে ঘরে আনলি নে, এখন আমার কী সর্বনাশ
হলো...।" কথা না বাড়িয়ে টর্চ নিয়ে দৌড় দেয় মাঠের দিকে।
সাধন চলে গেলে পুষ্প
বলে, "বউ, মনে হয় না সাধন কিছু বুঝছে। মন তার পেলু আর শিয়ালের দিকে।
তাড়াতাড়ি কর। আমি কালুর কাছে পাঁঠা রেখে…।”
নবীন ও আরতির আজকের এই
কলহ পূর্বপরিকল্পিত। কলহের বিষয়, আরতি আর নবীনের অভিব্যক্তি, পুষ্পর প্রবেশ সব
কিছুর রূপরেখা আগে থেকেই ভেবে করা। স্বামী আর বৌমাকে পাখি পড়া করে শিখিয়েছে
পুষ্প। কোলের আঁধার কাটবে বুড়ি মা-কালীর আশীর্বাদে, সে কথা ভেবে পুষ্পর কথায়
সায় দিয়েছে আরতি।
সাধনকে কিছু জানতে না
দিয়ে মানত রক্ষা করতে সবার আড়ালে বাড়ির পিছন রাস্তা দিয়ে হাজরাদের কালুর
বাড়িতে পেলুকে দিয়ে এসেছে পুষ্প। এক্কেবারে বলিদানের সময় পাঁঠা চান করিয়ে
পেলুকে বুড়ি কালীর তলায় হাজির করবে কালু।
নবীন বলে "সাধন
ফিরলে আমি সামলে নেবো ঠিক, তোরা তাড়াতাড়ি যা। ঢাকে কাঠি পড়েছে, পুজো শুরু
হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ হলো।"
শ্বশুর শাশুড়িকে
প্রণাম ঠুকে পুষ্পর সঙ্গে কালিতলায় যায় আরতি। হাজার মানুষের সমাগম সেখানে। ঢাক
কাঁসরের শব্দে মেতে উঠেছে পুজো প্রাঙ্গণ। মাঝেমধ্যেই চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে
পুষ্প, সাধন এসে পৌঁছলে সব পণ্ড হবে।
হাজরাদের কালু পাঁঠা
চান করিয়ে দিয়ে গেছে সময় মতো। বলিদান শুধু সময়ের অপেক্ষা। জোরে জোরে বুড়িমাকে
ডেকে চলেছে পুষ্প। এতদিন পরে মানত রক্ষা হতে চলেছে, দুচোখে ভক্তির অশ্রু বানভাসি
হয়েছে পুষ্পর।
শুরু হয়েছে বলিদান
পর্ব। হাড়িকাঠে ছাগশিশুর গলা চড়ানো মাত্র ভক্তদের "জয় মা" ধ্বনিতে
কেঁপে ওঠে আকাশ বাতাস, চাপা পড়ে ছাগলের ভীত আর্তনাদ। ঘাতকের খড়্গ কোপ নেমে আসছে
মুহূর্তে। মাথা ছিন্ন হয় পশুর দেহ থেকে, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে এসে ধুয়ে
দিচ্ছে মন্দির চাতাল। মুণ্ডুহীন ধড়টা কিছুক্ষণের জন্য ছটপট করে নিথর হয়ে পড়ে
থাকে একপাশে, মৃত্যুর আগে বিধাতার কাছে চার পা ছুঁড়ে নালিশ জানিয়ে যায় যেন
পশুটি। তাই দেখে কষ্ট পায় আরতি। বলিদান যে এমন নৃশংস, আগে এইভাবে মনে হয়নি কখন।
নিজেকে বড্ড নিষ্ঠুর মনে হয় আজ।
আরতির গা ঘেঁসে
দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপে পেলু, মরণের ভয়ে ভীষণ ভীত। মাঝে মাঝেই গুঁতো মারে
আরতিকে, বাড়ি ফিরে যেতে উতলা হয়েছে। পুষ্প বলে, "চেপে ধরে থাক বউ, ব্যাটা
পালাতে চায়। এতদিন বাদে ওর একটা গতি হবে, পশু জনমের মুক্তি…।”
এদিকে একরাশ দুশ্চিন্তা
নিয়ে দুয়ারে বসে সাধন। বিশু বাগদিকে সঙ্গে নিয়ে জমি, বাগান তন্নতন্ন করে খুঁজে
নিরাশ হয়েছে। পেলুকে পাওয়া যায়নি কোথাও। আজ চার বছর গায়ে গায়ে রয়েছে পেলু,
ভীষণ মন খারাপ লাগে সাধনের। নবীন ভয়ে ভয়ে বলে, "চিন্তা করিস নে, সকাল হলে
সব জানা যাবে।" নবীনের কথায় উত্তর দেয় না সাধন। হাজার কুচিন্তা ভিড়
করে আসে মনে। এই সময় আচমকা উঠোনে এসে ডেকে
ওঠে পেলু। দৌড়ে এসে ছাগলটাকে জড়িয়ে ধরে সাধন।
সদর দরজায় দাঁড়িয়ে
আরতি। পুষ্প এসে ফিশফিশ করে বলে "তুই কি পাগল হলি বউ? এমন সুযোগ আর আসবে
ভেবেছিস? এরপর আর বাচ্চাকাচ্চা হবে তোর! পাঁঠা নিয়ে বাড়ি ফিরে এলি! বুড়ি কালীর
রোষে…।”
তাজা রক্ত দেবতাকে ঘুস
দিলে তবেই গর্ভে সন্তান আসবে সে নিষ্ঠুর ভাবনা কষ্ট দেয় আরতিকে। শাশুড়ির
বুদ্ধিতে সায় দেবার জন্য সে লজ্জিত। এক মানবিক বোধ তীক্ষ্ণ ভাবে জাগ্রত হয়েছে
মনে। পেলুকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এসেছে তাই। পাথুরে হৃদয় আপন বুকে নিয়ে মা হতে চায়
না আরতি।
বাড়ির ভিতরে এসে
দাঁড়ায় আরতি। আরতিকে দেখে সাধন লাফিয়ে ওঠে, বলে "দ্যাখ দ্যাখ, পেলু ফিরে
এসেছে। ব্যাটা ভীষণ পাজি, আবার জলে গা ভিজিয়েছে। ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল আমার মনে।
কোথায় ছিল কে জানে! ব্যাটা তোর জন্যে আমি রেগে গিয়ে...।" পেলুকে আদর করতে
করতে হাজার কথা বলে চলে সাধন।
পেলুর গায়ে হাত রাখে
আরতি, সিং দিয়ে আরতিকে হালকা গুঁতো মারে পেলু, প্রাণ বাঁচানোর জন্য কৃতজ্ঞতা
জানাতে চাইছে বুঝি। পেলু গা ঘষে আরতির গায়ে। "আদিখ্যেতা, সর দেখি! ঘরে যেতে দে।"
কপট রাগের সুর আরতির গলায়।
সাধন হাসতে হাসতে বলে,
"তোকে বড্ড ভালবাসে। ওদের ভালবাসা বুঝতে হয় রে।"
ঘরের মধ্যে অন্ধকারে
দাঁড়িয়ে কাঁদে আরতি। কী ভুল করতে চলেছিল আজ! মনে মনে ক্ষমা চায় ঈশ্বরের কাছে।
অন্ধকার ঘরের ভিতর থেকে চেয়ে থাকে দুয়ারের দিকে, শুকনো কাপড় দিয়ে পেলুর গা
মুছিয়ে দিচ্ছে সাধন। ছটপট করছে পেলু আরতির কাছে আসবার জন্য।
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment