প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

তূয়া নূর সংখ্যা | জিরাফের গলা

বাতায়ন/ তূয়া নূর সংখ্যা/ সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/ ৪০ তম সংখ্যা/ ২৪শে মাঘ,   ১৪৩২ তূয়া নূর সংখ্যা | সম্পাদকীয়   জিরাফের গলা "সম্পূর্ণ ভাবে ...

Wednesday, January 22, 2025

স্বর্গ [২য় পর্ব] | ডরোথী ভট্টাচার্য

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক গল্প/২য় বর্ষ/২তম সংখ্যা/১৮ই মাঘ, ১৪৩১
ধারাবাহিক গল্প
ডরোথী ভট্টাচার্য

স্বর্গ

[২য় পর্ব]

"সেই সুউচ্চ গিরিকার গায়ে বসেসমাজ সংসার থেকে দূরে চলে এসে সুগতর হাত ধরে অরুন্ধতির মনে হলো সে যেন কোন অতীন্দ্রিয় জগতে চলে গেছেএই পরস্পরের কাছে আসাদুজনের হাত ধরে নিবিড়ভাবে বসে থাকা পৃথিবীতে স্বর্গ  বলে যদি কিছু থাকে তা বোধ হয় এইখানেএইখানেই।"


পূর্বানুবৃত্তি অরুন্ধতি আর সুগতর দেখা হয়েছে সেই কলেজ জীবনের পর। পাহাড়ে বেড়াতে এসেছে ওরা। অনুপম, অরুন্ধতির স্বামী কোল্ড অ্যালার্জির ভয়ে জিপ থেকে নামেনি। ঝরনা খুব প্রিয় হওয়ায় অরুন্ধতি ঝরনার খুব কাছে না গিয়ে পারে না। কিন্তু এবারে ব্যাপারটা অন্যরকম। সুগত তাকে ঝরনার কাছে নিয়ে যেতে চায়। তারপর…
 
একসময় সুগত অনেকদিন কলেজে আসত না। তারপর শোনা গেল ও নাকি কোন গ্রাম থেকে অ্যারেস্ট হয়েছে। সঙ্গে অনেক রাজনৈতিক কাগজপত্রও ছিল। তারপর থেকে ওর সঙ্গে আর কোনদিন দেখা হয়নি। ওদের বাড়িও চিনত না অরুন্ধতি। ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে বেরোনোর পর মা-বাবা জোর করতে লাগলেন বিয়ের জন্য।
 
প্রথম প্রথম অরুন্ধতি রাজি হয়নি। কেউ দেখতে আসলে কাউকেই জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নিতে পারত না। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাড়ির চাপও বাড়তে লাগল। তাই একরকম মনের বিরুদ্ধেই কাকার আনা সম্বন্ধটাতে
মত দিয়েছিল। অনুপম ইঞ্জিনিয়ার, বড় পরিবারের ছেলে, আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল, যতদূর শুনেছে মানুষ হিসেবেও ভাল তাই আর ও আপত্তি করেনি।
 
সারারাত ছটফট করতে করতে ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়ল অরুন্ধতি। পরের দিন জিপ এসে ছাড়তে ছাড়তে নটা বেজে গেল। এবার ওরা লাচুংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। অনুপম বরাবরই ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে। তার সাথে গল্প করতে করতে যায়। পেছনে অরুন্ধতি জানালার ধারে গিয়ে বসল অন্য সঙ্গী, সঙ্গিনীদের সাথে।
 
রাস্তার দুধারে শুধু পাহাড়, তার গায়ে অসংখ্য নাম না জানা গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবতে অবাক লাগে ওই পাথুরে জমিতে গাছগুলো তাদের প্রাণশক্তি পায় কোথা থেকে? নীচে বহমান তিস্তা কখনও শান্ত, কখনও খরস্রোতা, চপলা কিশোরীর মতো। কখন-বা অসংখ্য নুড়িপাথরের বাধা ডিঙোতে ডিঙোতে ক্লান্ত। মাঝে মাঝে রাস্তার ধারে বড় বড় পাথরের চাঁই বিপজ্জনকভাবে পড়ে আছে। সেই সব বাধা কাটিয়ে খুব বিপজ্জনকভাবে এগোতে হচ্ছে। দুপুরে একটা হোটেলে নেমে খাওয়াদাওয়া সারা হলো। যাত্রীদের খাওয়া শেষ হলে জিপ আবার চলতে শুরু করল।
 
আসতে আসতে বিকেল গড়িয়ে এল। সবাই সোয়েটার মাফলার পরে নিল। গাড়ি এসে থামল লাচুংয়ে। পরপর অনেক গাড়ি হোটেলের সামনে এসে দাঁড়াল। অরুন্ধতিদের গাড়িটা যে হোটেলের সামনে এসে দাঁড়াল তার কাছেই একটা ঝরনা থেকে তীব্র গতিতে আওয়াজ করে জল ওপর থেকে পড়ছে।
 
রাতের খাওয়াদাওয়ার পর আগুন জ্বালিয়ে উঠোনে গানবাজনার আসর বসল। একটা নেপালি ছেলে আর একটা মেয়ে সারেঙ্গি হাতে মিষ্টি গলায় ওদের ভাষায় গান গাইল। রাত এগারোটা। খেয়েদেয়ে এবার যার যার ঘরে ঘুমিয়ে পড়ার পালা।
 
অনুপম তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল। অরুন্ধতির চোখে ঘুম আসছে না। বারবার সুগতর কথা মনে পড়ছে। এই হোটেলের আশেপাশে কোন হোটেলে নিশ্চয়ই সে উঠেছে। প্রকৃতিকে একটু নিবিড়ভাবে পেয়েও এক বিষন্নতা যেন অরুন্ধতিকে সবসময় তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কাল সকালবেলা সব যাত্রীদের গাড়িতে করে কাটাও যাবার কথা।
জায়গাটাকে নাকি ভারতের সুইজারল্যান্ড বলা হয়। অনুপম এত ঠান্ডায় যেতে রাজি হলো না। অরুন্ধতির এত দূরে এসে সব কিছু না দেখে ফিরে যেতে মন চাইল না। তাই অনুপমের মত নিয়েই অন্য যাত্রীদের সঙ্গে সে জিপে এসে বসল। আবার চড়াই উৎরাই পথ। গাড়ি অনেক উঁচুতে উঠে যাচ্ছে। অনেক নাম না জানা গাছ, মাঝে মাঝে ঝরনা। লোকবসতি প্রায় নেই বললেই চলে। গাড়ি এসে দাঁড়াল বরফাবৃত পাহাড়ের একেবারে সামনে। অরুন্ধতি বরফে ঢাকা পাহাড়ের এত সুন্দর রূপ আগে কোনদিন এত কাছ থেকে দেখেনি। কী সুন্দর তার রূপ! সুউচ্চ হিমাদ্রীশিখর, তার পাদদেশ পর্যন্ত রুপোলি আস্তরণে মোড়া। অনেকে গামবুট পরে তরতর করে পাহাড়ের উপরে উঠতে লাগল। অরুন্ধতির এক ছুটে পাহাড়ের উপর উঠে যেতে ইচ্ছা করছে কিন্তু বারবার পা পিছলে যাচ্ছে।
দূর থেকে কে যেন এগিয়ে আসছে এদিকে। কাছে আসতেই বুঝল সুগত। "আরে ফ্যানি, তুমি একা একা উঠতে পারছ না? এসো আমার হাত শক্ত করে ধরো" বলে হাত এগিয়ে দিল। সুগত এখনও স্মার্ট আর চটপটে আছে। অরুন্ধতি ওর হাত ধরল, ওর উপর যেন ভরসা করা যায়।
 
আজ অনুপম আসেনি, আশেপাশে সেই রকম পরিচিতজনেরা কেউ নেই। মনে মনে ও যেন ওর অল্পবয়সে ফিরে গেছে যে বয়সে কোন বাধাকেই ও বাধা বলে মানত না।
"তোমার শরীরটা ভীষণ কাঁপছে ফ্যানি, তুমি পড়ে যাবে। এইখানে বসে পড়ো।"
হাত ধরে দুজনে বসে পড়ল বরফের উপর।
"এখানে তো তেমন কেউ নেই সুগত, সত্যি করে বল তো এখনো আমাকে তুমি আগের মতোই ভালবাস? কত বছর তো যোগাযোগ নেই।"
"সত্যিই তোমাকে ভুলতে পারিনি ফ্যানি, আর পারিনি বলেই হয়তো কাউকে জীবনসঙ্গিনী করতে পারিনি। আর তুমি? তুমি তো বিবাহিতা।"
"হ্যাঁ, অনুপম আমাকে সব দিয়েছে, তার ভালবাসায় কোন খাদ নেই কিন্তু এত বছর ধরে তোমাকে অনেক ভোলবার চেষ্টা করেও কিছুতেই ভুলতে পারিনি।"
"এটা কি পাপ সুগত?"
না, প্রেম কোন পাপ নয়, এই যে ভালবাসার অনুভূতি, এ বড় পবিত্র। অনুপম তোমার স্বামী, তাকে কোনদিন অবহেলা করবে না, আমাকে যদি সত্যিই ভালবাস, আমি থাকব তোমার স্মৃতির মণিকোঠায়, তোমার হৃদয় ছুঁয়ে, তাতে দোষের কী আছে?”
 
সেইদিন সেই সুউচ্চ গিরিকার গায়ে বসে, সমাজ সংসার থেকে দূরে চলে এসে সুগতর হাত ধরে অরুন্ধতি
মনে হলো সে যেন কোন অতীন্দ্রিয় জগতে চলে গেছে, এই পরস্পরের কাছে আসা, দুজনের হাত ধরে নিবিড়ভাবে বসে থাকা পৃথিবীতে স্বর্গ  বলে যদি কিছু থাকে তা বোধ হয় এইখানে, এইখানেই।
 
সমাপ্ত
 

No comments:

Post a Comment

সূর্যাস্ত গঙ্গার বুকে


Popular Top 10 (Last 7 days)