বাতায়ন/প্রেমের
Rush-লীলা/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/২৫তম সংখ্যা/০৬ই মাঘ, ১৪৩১
প্রেমের
Rush-লীলা | ছোটগল্প
তন্ময় পাল
প্রতীক্ষা
"উনি আমাদের আশা পূর্ণ করবেন। এখন চলো, আর সময় নষ্ট না করে শ্রীদুর্গা ছবিঘর সিনেমা হলে একটা সিনেমা দেখে নিই। আবার কবে একসঙ্গে সিনেমা দেখব জানি না।"
সুমিত
অনেকক্ষণ চন্দননগর স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে বনলতার জন্য। আজ ও বড্ড লেট করছে, এত দেরি
কোনদিন করে না। ফোন করলেও ফোন ধরছে না। এমনিতেই সুমিত খুব ব্যস্ত। সিডিএস
পরীক্ষায় পাস করে দেরাদুনে আর্মির ট্রেনিংয়ে জয়েন করবে। ট্রেনিংয়ে যাওয়ার জন্য
যাবতীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার আগে প্রেমিকার সঙ্গে একবার তো দেখা করতেই হবে।
আজ রাস
পূর্ণিমা, বনলতার
কলেজ তো ছুটি। তাহলে স্ট্যান্ডে আসতে এত সমস্যা কোথায়? আর আজকের
দিনটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এরপর আবার ওদের মধ্যে কবে দেখা হবে ওরা নিজেরাও জানে না।
বিরক্ত হয়ে একটা সিটে বসে ফোন ঘাঁটতে থাকে সুমিত। প্রায় কুড়ি মিনিট পর আমাদের গল্পের
নায়িকার আবির্ভাব ঘটে।
"সরি, আমার অনেক
লেট হয়ে গেল। আসলে বাড়িতে এত কাজ পড়ে গেছে..."
"মানুষের
দেরি হতেই পারে, অন্তত
ফোনটা ধরতে হয়। তাছাড়া তুমি তো জানো আমি এখন কত ব্যস্ত! এই এতক্ষণ ফালতু বসে
থাকা সত্যি বিরক্তিকর।"
"বলছি তো
আমার ভুল হয়ে গেছে। এই কান ধরছি। কিন্তু এত মিলিটারি মেজাজ কিন্তু শরীরের পক্ষে
ক্ষতিকারক। মাথাটা একটু ঠান্ডা করো।"
"তুমি তো
জানো আমার অল্পেতেই মাথা গরম হয়। আর এখন এমনিতেই আমার মন ভাল নেই। বাবা-মা, বোন, বন্ধুবান্ধব
আর তোমাকে ছেড়ে চলে যেতে সত্যি মন চাইছে না। কিন্তু যেতে তো হবেই।"
"কয়েকদিন
ধরে একটা কথা তোমাকে বলব ভাবি কিন্তু কিছুতেই বলতে সাহস পাচ্ছি না।"
"এত ন্যাকামো, ফর্মালিটি
না করে বলেই ফেলো না।"
"তুমি তো খুব
ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। স্কুল, কলেজ সবেতেই টপার। এই তো সবে চাকরির পরীক্ষা দিতে শুরু
করেছিলে। তুমি চেষ্টা করলে অন্য আরো ভাল চাকরিও পেতে পারতে। যেমন ডব্লিউবিসিএস, সিজিএল, এমনকি
ইউপিএসসির সিভিল সার্ভিস পরীক্ষাতেও তুমি কোয়ালিফাই করার ক্ষমতা রাখো। তাই
আর্মিতে জয়েন কি না করলেই নয়?"
"ছি! তুমি এ
কথা কী করে বলছ! আর আর্মি মিলিটারির চাকরি খারাপ এটা কে বলল?"
"এটা খারাপ
চাকরি এটা আমি বলছি না। এর থেকে মহান, পবিত্র চাকরি আর দুটো নেই। এটা রিস্কের চাকরি। আমার তোমাকে নিয়ে খুব টেনশন, ভয় হয়।
তুমি তো আরো অন্য চাকরি পাওয়ার ক্ষমতা রাখো যেগুলোতে এত রিস্ক
নেই তাই এটা বলছিলাম।"
"সবাই যদি
এরকম বলে তাহলে আমরা ভারতবাসীরা কেউ নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারব? আমার মতো অনেকেই যারা শুধু চাকরি নয় দেশ সেবার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে চায় তারা
আর্মিতে যাবে এটাই স্বাভাবিক। তোমাকে এটা অনেকবার আগে বলেছি। এতই যখন ভয় তবে আমার
সঙ্গে রিলেশনশিপ নিয়ে তোমারে এগোনো উচিত ছিল না?"
সুমিতের কথা
শুনে বনলতার চোখটা ছলছল করে। সুমিত বুঝতে পারে একটু বেশি বলে ফেলেছে। পরিস্থিতি
সামাল দেওয়ার জন্য মৃদুস্বরে বলে
"তুমি ঠিকই
বলেছ আমি অন্য চাকরি পেতেই পারি যেখানে কোনো ঝামেলা, বিপদ কিচ্ছু নেই। কিন্তু আমার তো
ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল দেশের হয়ে লড়াই করব যাতে প্রত্যেকটা মানুষ নিশ্চিন্তে
বসবাস করতে পারে। এই স্বপ্ন আজ পূর্ণ হওয়ার পথে। আর তোমার ভালবাসা সঙ্গে থাকলে
আমি জানি সব বিপদকে সামলে নিয়ে আমি সফল হবই। আর আমি যেখানেই থাকি না কেন আমি জানব
তুমি আমার সঙ্গেই আছ। তুমিই তো আমার সব থেকে বড় প্রেরণা।"
"কিন্তু আমার
বাবা মনে হয় আমাদের এই সম্পর্ক মেনে নেবে না। আমাদের বাড়িতে সবাই স্কুল টিচার, ক্লার্ক, ব্যাংকের
চাকরি এসব ছাড়া কিছু বোঝে না। পুলিশ মিলিটারি চাকরির নাম শুনলেই ভয় পায়।"
"ওনাকে
বোঝানোর দায়িত্ব আমার বাবার। আগে তো আমার ট্রেনিং কমপ্লিট করতে দাও, তারপর
বিয়ের কথা ভাবা যাবে। তাছাড়া তোমার পড়াশোনা এখনো কমপ্লিট হয়নি।"
"যদি তাও
বাবা রাজি না হয়?"
"তোমাকে না
পাওয়াটা দুর্ভাগ্য হিসেবে মেনে নিয়েই চলতে হবে। কিন্তু আমার স্বপ্ন দেশমাতৃকার
চরণে যেন চিরকাল নিজেকে উৎসর্গ করতে পারি। আমার প্রিয় কবি সমরেন্দ্র সেনগুপ্তর
কবিতার দুটো লাইন খুব মনে পড়ছে
'প্রেম ভালো, তার আগে
ভালো দেশপ্রেম।
রমণী শেখার
আগে মানুষ তো চিরকাল জননীকেই প্রথম শিখেছে।'
"তার মানে
আমার সেভাবে কোনো গুরুত্বই তোমার কাছে নেই।"
"আমার পুরো
কথাটা বোঝার চেষ্টা করো। তোমার সঙ্গে বিয়ে না হলে আমি চিরকাল অকৃতদার থেকে যাব, তোমার
জায়গায় কাউকে বসাতে পারব না। কিন্তু আমি জানি আমাদের এই সম্পর্ক পূর্ণতা পাবেই।"
"হ্যাঁ তাই
যেন হয়। আজ রাস পূর্ণিমার পবিত্র দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে এটাই হোক আমাদের
প্রার্থনা। আর উনি যেন সর্বদা তোমার সহায় হোন।"
"শ্রীকৃষ্ণ
সর্বদাই সকলের সহায়। কবিগুরুর ভাষায় এটুকুই প্রার্থনা করতে পারি-
'বিপদে মোরে
রক্ষা করো
এ নহে মোর
প্রার্থনা,
বিপদে আমি
না যেন করি ভয়।'
"হ্যাঁ আর
কোনো অহেতুক চিন্তা আমি করব না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা সামনের বছর রাস
পূর্ণিমায় আবার যেন আমরা স্ট্যান্ডে এখানে মিলিত হতে পারি। ততদিন শুধু তোমার
প্রতীক্ষা করে যাব।"
"উনি আমাদের
আশা পূর্ণ করবেন। এখন চলো,
আর সময় নষ্ট না করে শ্রীদুর্গা ছবিঘর সিনেমা হলে একটা সিনেমা দেখে নিই। আবার
কবে একসঙ্গে সিনেমা দেখব জানি না।"
ওরা হাত ধরে
চন্দননগর স্ট্যান্ড থেকে সোজা ছবিঘরের দিকে এগিয়ে যায়। পড়ন্ত বিকেলের আলোয়
দুজনকেই খুব সুন্দর লাগছিল।
সমাপ্ত

খুব ভালো গল্প।
ReplyDeleteঅসংখ্য ধন্যবাদ
Deleteঅসংখ্য ধন্যবাদ
DeleteKhub sundor
ReplyDeleteঅসংখ্য ধন্যবাদ
Delete