প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Wednesday, April 9, 2025

সিদ্ধান্ত [২য় পর্ব] | হিমাদ্রি শেখর দাস

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/২য় সংখ্যা/৫ই বৈশাখ, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
হিমাদ্রি শেখর দাস
 
সিদ্ধান্ত
[২য় পর্ব]
 

"আমি আমার ভালোবাসা হারাতে চাইনি। চিকিৎসক হিসেবে চিকিৎসা শাস্ত্রের কথা ভেবে ভালোবাসার মানুষকে হারিয়েছি। প্রিয়াঙ্কার চোখে জল।"


পূর্বানুবৃত্তি সরকারি হাসপাতালের টেকনিশিয়ান ছেলেকে নিয়ে রোটারি সদনে বিশেষ আলোচনা সভায় গেছে রাতুল। গণিতে এমএসসি করার পর কিছুতেই শিক্ষকতার চাকরি হচ্ছিল না যখন আশাহত রাতুলকে কোর্স করার পরামর্শ দিয়েছিল বান্ধবী প্রিয়াঙ্কা। প্যারামেডিকেল কোর্সে ভর্তি হয়েছিল রাতুল আর প্রিয়াঙ্কা এমডি-তে। বেড়ে ছিল সম্পর্কের গভীরতা। তারপর…


সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রিয়াঙ্কা আসেনি? রাতুলের সঙ্গে কোন যোগাযোগ করেনি। বাড়ি ফিরে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে রাতুল, মাকে জানায়,

-রাতে আমি কিছু খাব না মা। আমার জন্য রান্না কোরো না।
-কেন রে তুই কি কিছু খেয়ে এসেছিস?
জানতে চান মা অসীমাদেবী। মা জানে ছেলে কখনো বাইরে খেয়ে আসে না এমনকি রাতে কিছু না খেয়েও ঘুমায় না। ছেলের কাছে এসে কপালে হাত দিয়ে জানতে চায়,
-তোর কি শরীর খারাপ বাবা? তোকে বারবার বলছি নিজের শরীরটা দেখ কিছুদিন ছুটি নে। তোর তো আবার ইমারজেন্সি ডিউটি ইচ্ছামতো ছুটি নেওয়া যায় না।


-না মা আমার শরীর ঠিক আছে। তুমি চিন্তা কোরো না। আজ খিদে নেই তাই বললাম।
মাকে আশ্বস্ত করে রাহুল।
-ঠিক আছে এখন একটু বিশ্রাম কর। আমি তোর জন্য কম করে রুটি করছি। একটু পরে খাবি
বলেই রাতুলের ঘর থেকে বেরিয়ে যান অসীমাদেবী। হাত-পা না ধুয়ে বিছানায় বসে পড়ে রাতুল, এমন সময় ফোন।
-অভিনন্দন তাহলে বিয়েটা সেরেই ফেললি। একবার বললি না। এটা পার্টি পাওনা রইল
মাইক্রো বায়োলজির সজল। সজল বা খবর পেল কীভাবে?
-তোকে পরে ফোন করব ভাই। আমি একটু ব্যস্ত
-ব্যস্ত তো হবে ডিয়ার ওকে ওকে এনজয় ইওরসেলফ
-বলেই ফোনটা রেখে দেয়।
শরীরটা এলিয়ে দিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে রাতুল। ঘুম ভাঙে মায়ের ডাকে,
-উঠে পড় রাতুল খাবি আয়, তুই এখনো হাসপাতালের জামাকাপড় খুলিসনি?
 
পরে জানা যায় প্রিয়াঙ্কা এই মেডিকেল কলেজ থেকে পদত্যাগ করেছে। রাতুল ভাবে- কেন এরকম করল প্রিয়াঙ্কা? তাকে শাস্তি দিয়ে কী আনন্দ পেলো। সে তো সরাসরি জানিয়ে দিতে পারত।
 
কেটে গেছে বেশ কয়েক বছর রাতুল বিয়ে করেছে, বারো বছরের ছেলে। পরীক্ষার পর জানা গেছে ছেলেও থ্যালাসেমিয়া বাহক।
 
রোটারি সদনে ঢুকেই রাতুল শুনতে পায় বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসে দিল্লি থেকে প্রধান আলোচক হিসেবে এসেছেন  বিখ্যাত হেমাটোলজিস্ট ডাঃ সেনাপতি। তার জীবনে হেমাটোলজিস্টের ভূমিকা কম নয়, সেই ভালোবাসা আজও ভুলতে পারেনি রাতুল। পদবিও একই, এই সেনাপতি প্রিয়াঙ্কা নয় তো? আজ ভেবেই বা কী লাভ? মঞ্চে কোন মহিলা বসে নেই, বসে আছেন তারই চেনা ডাঃ রহমান। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে দর্শক আসনে বসে রাতুল। থ্যালাসেমিয়া সংক্রান্ত সেমিনার বা আলোচনা থাকলে রাতুল যায়। ছেলেকে মঞ্চের দিকে দেখিয়ে রাতুল জানায় ওই যে দেখছ তিনি বসে আছেন উনি আমার ডিপার্টমেন্টের স্যার এই আলোচনা সভায় আসার কথা উনি আমাকে জানিয়েছেন।
 
স্বাগত ভাষণে ডাঃ রহমান আজকের দিনের গুরুত্ব এবং থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান,
-একুশ শতকেও এই রোগ সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের ধারণা খুব কম, থ্যালাসেমিয়া মুক্ত পৃথিবী গড়তে মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
এবার সঞ্চালক মঞ্চে আহ্বান করেন দিল্লি থেকে আগত ডাঃ সেনাপতিকে। রাতুল এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, কে এই প্রিয়াঙ্কা? মঞ্চে এলেন আকাশি-নীল শাড়ি পরিহিতা বাঙালি মহিলা। রাতুল দাঁড়িয়ে পড়ে। এই মহিলা তো তার অনেক দিনের চেনা- তার ভালোবাসা প্রিয়াঙ্কা, তার প্রিয় রঙের শাড়ি। সেই চোখ, সেই হাসি- কোনো পরিবর্তন নেই, শুধু বয়স বেড়েছে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মঞ্চের দিকে, অন্য কোন দিকে খেয়াল নেই। পিছনের দিক থেকে আওয়াজ এল-
-দাদা বসে পড়ুন আমরা পেছনে রয়েছি তো।
-বাবা, দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? পিছনের সিটে লোক বসে রয়েছে।
ছেলের ডাকে সিটে বসে পড়ে রাতুল। সভার সঞ্চালক শুরু করেন,
-আমরা সৌভাগ্যবান, আজ আমাদের মধ্যে পেয়েছি ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিমাটোলজিস্ট ডাঃ প্রিয়াঙ্কা সেনাপতিকে, যিনি এই কলকাতায় পড়াশোনা করে দিল্লিতে কর্মরত।
আলোচনা শুরু হয়, রাতুলের কানে কোনো কথা যায়নি, শুধু বক্তব্যের শেষের কিছু অংশ ছাড়া,
-যখন আমি জানলাম, নিজেই থ্যালাসেমিয়া বাহক, কথা দিয়েও নিজের প্রেমিককে বিয়ে না করে জীবন থেকে সরে গেছি। সে হয়তো আমাকে ভুল বুঝেছে, হয়তো কখনোই ক্ষমা করবে না। আমার জীবনের ভালোবাসা আমার প্রেমিক হয়তো ভেবেছে, তাকে ঠকিয়ে হয়তো আমি অন্য কাউকে বিয়ে করেছি। সুখে সংসার করছি।
সঞ্চালক প্রশ্ন করেন,
-তাহলে নিশ্চয়ই অন্য কোন মানুষকে বিয়ে করেছেন? সত্য ঘটনা আপনি আপনার প্রেমিককে জানাননি কেন?
-না, আমি অন্য কাউকে বিয়ে করিনি। আমার পক্ষে অন্য কাউকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। নিজের ভালোবাসার কথা ভেবে প্রতি মুহূর্তে শাস্তি পাচ্ছি।
আমি জানতাম দুই থ্যালাসেমিয়া বাহক নারী-পুরুষের বিয়ে হলে পৃথিবীতে আসার সম্ভাবনা ছিল থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু। সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে বারবার সাবধান করি, নিজে কীভাবে করতে পারতাম। আমি আমার ভালোবাসা হারাতে চাইনি। চিকিৎসক হিসেবে চিকিৎসা শাস্ত্রের কথা ভেবে ভালোবাসার মানুষকে হারিয়েছি। প্রিয়াঙ্কার চোখে জল। নিজেকে সামলে বলে,
-সমস্ত দুঃখ কষ্টকে বুকের মধ্যে চেপে রেখে নিজেকে শাস্তি দিয়েও পৃথিবীর বুকে একটি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্মের সামান্যতম সম্ভাবনা রোধ করতে পেরে আমি খুশি। বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসে আজ আপনারা শপথ নিন, পৃথিবীকে থ্যালাসেমিয়া মুক্ত করতে জন্মছক যাচাই করার আগে অবশ্যই রক্ত পরীক্ষা করান। দূর করুন পুরনো সংস্কারকে। একুশ শতকে দাঁড়িয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান এইটুকু মানসিকতা পরিবর্তন না আনতে পারলে আমরা এগিয়ে যেতে পারলাম কোথায়?
সঞ্চালকের প্রশ্ন,
-এটা কি বিশ্বাসঘাতকতা নয়?
-আমার নেওয়া সিদ্ধান্তকে সবাই বিশ্বাসঘাতকতা বলবেন এ নিয়ে সন্দেহ নেই, সমাজে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর ভবিষ্যতের পরিস্থিতির কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে চেয়েছি।
 
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)