বাতায়ন/ঝড়/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩২
ঝড় | ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
মিছিলের
ঠিক পরের ট্রামটা
[১ম
পর্ব]
"গতকাল রাত বারোটায় ফতেমা শিরিনের বড়োদিনের ঘন্টাটাও একইরকম ভাবে শুনেছে ও। পদ্মপুকুর বস্তির বিফ টিকিয়া পোড়ানো, মসলা মাখা মাংস ঝলসানো একটা গন্ধমাখা জামাকাপড় পরে থাকে আওয়াজটা! ঘন কুয়াশার সরের ভেতর দিয়ে আওয়াজটা যেন ঠিক এক পা এক পা করে হেঁটে চলে আসে ওর দিকে।"
পৌষের নতুন শীতের ভোরের সোঁদা
গন্ধটা, পাড়াটাকে সাদা ধুলোর মতো
জাপটে ধরেছে, যেন নতুন পাখির বাসায় কুমোরে
পোকার মুখের লালা, জমতে জমতে ঢিবির আকার
নিয়েছে ক্রমশ। আশেপাশের বাড়ি থেকে অনিবার্যভাবে যে হ্যাঁচ্চোটার ভেসে আসার কথা ছিল, সেটার ঘুম ভাঙেনি এখনও। রেডিয়োটা থেকে নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে
একটা একটানা বাক্যরাজি বেরিয়ে আসতে চেয়েছে অনেক আগেই, তবু গুড়ের চায়ের গন্ধটা ওকে চুপ করিয়ে দিয়েছে আগুপিছু
বছরতিরিশের জন্য। একটা প্রলম্বিত ধূলিকণার শরীর বেয়ে, উল্টোদিকের বাড়িটায় নয়, মৃদুলার অনভ্যস্ত চোখ চলে যায় ঠিক তার পাশের বাড়িটায়।
নব্বইয়ের দশকের কোন এক
জানুয়ারী মাস, ওখানে শেষবারের মতো মানুষের
মুখ দেখেছিল মৃদুলা। লম্বা লম্বা গরাদ পেরিয়ে মুখটা চেয়েছিল একবার আকাশের দিকে
আরেকবার সরু গলির রাস্তার দিকে। সেই থেকে মৌলালির মোড়ে, সমান্তরাল ট্রাপিজের দড়ির মতো বিছিয়ে থাকা ট্রামলাইনটার ওপর
দিয়ে, একটা পুরোনো লোহার শরীর
ঝাঁকানো ঘন্টি মেরে চলে গিয়েছে ট্রামটা,
কত
শতবার! ট্রামের জানলা দিয়ে উঁকি মেরে গেছে একটা আবছা মুখ, কখনও মৌলালী বাবার দরগার দিকে, কখনও-বা গোড়ার দিকটা সরু হয়ে ঢুকে যাওয়া এসএনব্যানার্জী রোডের দিকে।
দরগা থেকে শত শত সাচ্চা মুসলমানের নামাজ, আয়াত আর দোয়ার পাঁচমিশালি একটা হাওয়া উঠে ছুটে গেছে ট্রামটার পেছন পেছন। ঠিক
সেই সময়ের ফ্রেম থেকেই যেন একটা ছবি ভেসে উঠতে চাইল মৃদুলার চালশে ধরা চোখের
কুঁচকে যাওয়া চামড়ার কোণ থেকে,
আর
কানের কাছে রিনরিনে একটা শব্দ করে ভেসে এলো ভাগ্যহত একটা ট্রামের ঘন্টি। শব্দটা ওর
কানের কাছে এসে ধাক্কা খেয়ে চারপাশের মহাকরুণার মতো নৈঃশব্দ্যের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
গেলো যেন। বড়ো রাস্তার উপর দিয়ে শেষ কবে চলে গিয়েছিল ট্রামটা, মৃদুলা জানে না। আজ এই ভোরের সময় আকাশের ঠিক কোন কোণা থেকে
ভেসে এলো এই আত্মকণ্ঠ? আওয়াজটা ছায়ার মতো মিলিয়ে
যাবার পর আন্দাজ করে সেই দিকে তর্জনী নির্দেশ করে চেয়ে থাকে মৃদুলা।
গতকাল রাত বারোটায় ফতেমা
শিরিনের বড়োদিনের ঘন্টাটাও একইরকম ভাবে শুনেছে ও। পদ্মপুকুর বস্তির বিফ টিকিয়া পোড়ানো, মসলা মাখা মাংস ঝলসানো একটা গন্ধমাখা জামাকাপড় পরে থাকে
আওয়াজটা! ঘন কুয়াশার সরের ভেতর দিয়ে আওয়াজটা যেন ঠিক এক পা এক পা করে হেঁটে চলে
আসে ওর দিকে। খুব ভালোভাবে এগিয়ে আসতে জানে আওয়াজটা, যেন কোন যথার্থবাদী দার্শনিকের ধীর দাগে আঁকা গভীর রেখা বেয়ে ভেসে আসে।
মুহূর্তে মনে হয় খোলা ময়দানের বুকে ফুটন্ত দুধ চায়ের গন্ধে পাগল হয়ে যাওয়া কাকদুটো
বসে ছিল ট্রামটার মাথার ওপর, পর্ণমোচী মানচিত্র
এঁকে দেওয়া ওভারহেড তারে আওয়াজটার কম্পাঙ্কে ট্রামরেলের ধাক্কায় ছিটকে গেল সেখান
থেকে। বাড়িটার দিকে আবার ফিরে তাকাল মৃদুলা। সময়টাই এমন যেন মনের কোণে জমে থাকা সব
সুখ-দুঃখ এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকে বাড়িটার জেদি শরীরখানা
জুড়ে। বেশ কয়েকটা রোদ-জল-বসন্ত পিছিয়ে গিয়ে বাড়িটার গা বেয়ে মাথা তুলেছিল যে
জীবন্ত বটের চারা জাগতিক সব মাধ্যাকর্ষণকে অগ্রাহ্য করে, তার শিকড় এখন দুমড়ে মুচড়ে গিয়ে ফোঁসহীন অজগরের মতো পেঁচিয়ে
ধরেছে বাড়িটাকে। ট্রামটার চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে উঠতে পারেনি বাড়িটা, শুধু বুকের ভিতর জন্ম দিয়েছে কত অর্বাচীন কথকতার! পটারি রোড
থেকে বড়পিসিমার যে মেয়ে এসে ফলটা, মিষ্টিটা দিয়ে যেত ওর
স্বামীর অসুখের সময় সেও ট্রামটাকে চলে যেতে দেখেছিল হয়তো!
ক্রমশ…
No comments:
Post a Comment