প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Wednesday, April 9, 2025

মিছিলের ঠিক পরের ট্রামটা [২য় পর্ব] | শাশ্বত বোস

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/২য় সংখ্যা/৫ই বৈশাখ, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
 
মিছিলের ঠিক পরের ট্রামটা
[২য় পর্ব]

"প্রতি সন্ধেবেলা একটা বিশাল আড্ডা বসতে দেখেছে মৃদুলা। সেই আড্ডায় যোগ দিতেন এমনকি এই বাড়ির মেয়ে বউরাও! ব্রোচ দিয়ে পরা শাড়িহাফ স্লিভ ব্লাউজ এসব দেখে প্রথম দিকে হাঁ হয়ে থাকত ও।"

 
পূর্বানুবৃত্তি নব্বইয়ের দশকের কোন এক জানুয়ারী মাস, ওখানে শেষবারের মতো মানুষের মুখ দেখেছিল মৃদুলা। লম্বা লম্বা গরাদ পেরিয়ে মুখটা চেয়েছিল একবার আকাশের দিকে আরেকবার সরু গলির রাস্তার দিকে। বাড়িটার দিকে আবার ফিরে তাকাল মৃদুলা। সময়টাই এমন যেন মনের কোণে জমে থাকা সব সুখ-দুঃখ এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকে বাড়িটার জেদি শরীরখানা জুড়ে। তারপর…

 

মৃদুলা মফস্‌সলের মেয়ে। ওর বাবা মারা যাবার পর এই বড়োপিসিমাই ওকে নিজের কাছে এনে রেখে, এই বাড়িতে বিয়ে ঠিক করে খবর পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ওর মায়ের কাছে। রীতিমতো সাহেবি কেতাদুরস্তের বাড়ি, কিন্তু লোকগুলো আদ্যন্ত বাঙালি। বিয়ে করে এসে বিশাল দোতলা বাড়িটার দক্ষিণদিকে আলগোছে বেরিয়ে থাকা ছাদটা থেকে জীবনে প্রথম গোলাপায়রা ওড়াতে দেখেছিল মৃদুলা ওর বড়ো ভাসুরমশাইকে। ছাতের ঘরের এক কোণে পায়রাগুলো খাঁচায় রাখা থাকত।

ওদের দেখভালের জন্য আলাদা একটা মুসলমান আবদালি রাখা ছিল। ওর ভাসুরের রঙিন জীবনযাপনের শেষদিন অবধি নিজের স্বামীর মুখে মৃদুলা শুনেছিল, উনি নাকি জাহাজে মাল সাপ্লাই করতেন। কী মাল, কোথা থেকে আসে কোথায় যায়, এসব প্রশ্ন মৃদুলার নরম মনে এসেছিল হয়তো কখনো কিন্তু ও কাউকে জিজ্ঞাসা করেনি। চোখের সামনে ওর ভাসুরঠাকুরকে রংচঙে একটা কেউকেটা মার্কা জীবন থেকে চূড়ান্ত নিঃসঙ্গ অসফল একটা মাটিতে আছড়ে পড়তে দেখেছিল মৃদুলা। বড়ো মায়া হয়েছিল ওর, যখন ব্যবসায় ডুবতে থাকা জাহাজের মাস্তুল হাতড়ে আরেকবার ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন মানুষটা। নিজের ভাইয়ের হাত দিয়ে মৃদুলার বিয়ের গয়নাগুলো চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। সেদিন মনে মনে না চাইলেও মুখে কিছু বলেনি মৃদুলা। বলবার উপায়ও হয়তো ছিল না ওর। ওর স্বামীর একটা মাড়োয়ারি কোম্পানিতে চাকরি। সকাল নটার মধ্যে নাকে-মুখে কিছু গুঁজে দৌড়োনো একটা জীবন কাটিয়ে, যৌথ সংসারের পাতাবিহীন গাছটার মস্ত ডালপালা জুড়ে এই যে একটা প্রকাণ্ড বিস্তার, সে-তো মৃদুলার বড়োভাসুর ওই ‘কাকাই’এর জন্যই! গয়নাগুলো মৃদুলার মায়ের গয়না। ওজনে প্রায় কুড়ি ভরি! ওর মা হয়তো পেয়েছিলেন তাঁর দিদিমার কাছ থেকে। ‘নিনি’র খুব প্রিয় ছিলেন ওর মা। সেটা দেখেছিল মৃদুলা। এই গয়নাগুলোই ছিল ওর মায়ের শেষ সম্বল! এগুলো যে ওর মা ওকে বিয়েতে সব দিয়ে দিয়েছিলেন ওর দুই ভাইকে প্রায় বঞ্চিত করে, সেটা ভালো বুঝতে পেরেছিল ও। তবু মুখ ফুটে ও কোনদিন কিছু বলেনি। আসলে কোনোদিনই খুব গোছানো নয় ও। নিপুণ ঘরকন্যা বলতে যা বোঝায় সেটা কোনোদিনই ও পেরে ওঠেনি। বিয়ের পর ওর ঘর আলমারি গুছিয়ে দিতেন ওর খুড়শাশুড়ি। খুব ছোটোবেলায় ওর স্বামী তাঁর মাকে হারান। জ্ঞান হবার পর থেকে তিনি এই ‘কাকিমা’কেই মা বলে জানতেন। খুব আধুনিকা মহিলা ছিলেন মৃদুলার এই খুড়শাশুড়ি, তেমনি শৌখিন। মৃদুলা আবার বড়ো হয়েছে খুব রক্ষণশীল একটা পরিবারে। এ বাড়িতে আসা ইস্তক প্রায় প্রতি সন্ধেবেলা একটা বিশাল আড্ডা বসতে দেখেছে মৃদুলা। সেই আড্ডায় যোগ দিতেন এমনকি এই বাড়ির মেয়ে বউরাও! ব্রোচ দিয়ে পরা শাড়ি, হাফ স্লিভ ব্লাউজ এসব দেখে প্রথম দিকে হাঁ হয়ে থাকত ও। বগল দেখা যায় এরকম ব্লাউজও আবার হয়! ওর মাকে তো ও সারাজীবন সাধারণ আটপৌরে সাজেই সংসারে দেখে এসেছে। মৃদুলা সন্ধের সেই আড্ডাতে হয়তো একদিন চলে এলেন প্রখ্যাত ‘কামদারঞ্জন মুখোপাধ্যায়’ ওরফে ‘কামু মুখার্জী’। হ্যাঁ সেই সোনার কেল্লার বিখ্যাত ভিলেন মন্দার বোস। নাক দিয়ে টেনে সিগারেট ভ্যানিশ করার খেলাটা দেখাচ্ছেন এ বাড়ির বাচ্চাদের দেখাচ্ছেন, দেখিয়েই চলেছেন। কর্মজীবনের শুরুর দিকে তিনি মৃদুলার সুরমশাইয়ের ব্যবসা দেখভাল করতেন। আড্ডাটা শেষ হয়েছে হয়তো রাতের খাবার দিয়ে। সেখানে হয়তো কেউ হাতে করে কোনদিন পার্ক স্ট্রিট থেকে খাবার নিয়ে এসে যোগ দিল কিংবা বাড়ির ঠাকুরকে বলা হল ঝাল ঝাল করে মুরগির রোস্ট রাঁধতে। কেউ বা অফিস ফেরত এন্টালি মার্কেটের ভিতরের বিখ্যাত ধাবা থেকে নিয়ে এল রুমালি রুটি-তড়কা। ক্রমে রাত বাড়ল, আড্ডা গড়াল মদের আসরে। বাড়ির মেয়ে-বৌয়েরা ততক্ষণে যে যার ঘরে চলে গিয়েছেন। কেউ বা পর্দার আড়াল থেকে শানিত দৃষ্টি দিয়ে রেখেছেন নিজের কর্তার দিকে। রীতিমতো দামি স্কচ হুইস্কির ফোয়ারা! সদ্য কাল বিকেলে খিদিরপুর ডকে ভেরা জাহাজটার পেটের ভেতর সেঁধানো VAT69-এর নেশায় চুর হয়ে হয়তো তখন কামু কাকাইয়ের পায়ের গোড়ায় বসে সমানে বলে চলেছেন, “গুরু হো তো আইসা!” মৃদুলার বুক কেঁপেছে এসব দেখে। ঘরে এসে কুলুঙ্গিতে রাখা মা কালির ছবিটার সামনে মাথা ঠুকেছে সমানে। বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে যে ভাগ্যিস ওর স্বামী ওসব খান না! বিয়ের দিন বড়োপিসেমশাই ওর মাকে বর দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “জামাই পছন্দ হয়েছে বড়ো বৌঠান? আপনার মেয়ের জন্য রাজপুত্রের মতো বর এনে দিয়েছি, এবার আমাকে কী রেঁধে খাওয়াবেন বলুন?” বলেই হোহো করে হেসে উঠেছেন। দেখতে ওর স্বামী রাজপুত্রের মতোই ছিলেন বটে যৌবনকালে! যেন সিনেমার হিরোকেও হার মানায়। বয়সের অনেকটা তফাৎ তবু মৃদুলা যেন কখনও সেটা টের পায়নি। শুধু প্রাণ ভরে ভালোবেসে গেছে। এই আসরেই হয়তো একদিন বাড়ি ফিরে মৃদুলাকে উত্তম সুপ্রিয়ার গল্প শুনিয়েছে কচি। এই ‘কচি’ নামেও কচি আবার মনের বয়সেও কচি। মৃদুলার স্বামীর ঠিক ওপরের ভাই। বাড়ির ছেলে বুড়ো সবার কাছেই সে শুধু ‘কচি’। মৃদুলাকে তিনি স্নেহ করতেন নিজের বোনের থেকেও বেশি। এজিসি বোস রোডের উপর মল্লিকবাজার ক্রসিংয়ে নোনাপুকুর ট্রাম ডিপোর উল্টোদিকে সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির শোরুম ছিল, ‘অটো সেন্টার’, পার্টনারশিপের ব্যবসা। চার মালিকের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই ‘কচি’, রবীন ঘোষ। ষাটের দশকের শেষ থেকে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি অবধি কলকাতার হেন নামি লোক নেই যে এঁকে চিনতেন না। তা সে রঞ্জি খেলা ক্রিকেটারই হোক, নামি লেখক কিংবা বিলেত ফেরত ডাক্তার, বিদায়ী মন্ত্রী হন বা উঠতি নায়ক নায়িকা থেকে মহানায়ক, প্রায় সবাইকেই গাড়ি বেচেছেন এই কচি। এদের সবার হাঁড়ির খবর গড়গড় করে বলে চলতেন তিনি মৃদুলাকে আর মৃদুলাও সেসব গালগল্প গোগ্রাসে গিলত। মনের ভেতর দোল খেতে থাকা সাদা কালো পর্দা সরিয়ে, আসা যাওয়ার পথের মাঝে যত্ন করে হাতড়ালে মৃদুলা দেখতে পায় শীত আসা শীত যাওয়ার ব্যবধানে বয়ে চলা গল্পগুলো অনন্ত চালচিত্রের ছবি হয়ে এক আকাশ রামধনুর মতো জেগে আছে আজও।
 
ক্রমশ…
 

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)