বাতায়ন/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/১৪তম/মণিজিঞ্জির সান্যাল সংখ্যা/২৩শে শ্রাবণ, ১৪৩২
মণিজিঞ্জির
সান্যাল সংখ্যা | ছোটগল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
বার
ঘরে যাই
"রাতের আকাশে তারাদের তুমি ভেবে অনেক মনের কথা বলি, তুমি শুনতে পাও না, বসন্তের বাতাসের গায়ে তোমার গন্ধ খুঁজে বেড়াই তুমি ধরা দাও না, শুধু পালিয়ে বেড়াও আর আমায় কাঁদাও।"
-চেনা পথে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি অনেক দূর, বার-বার পিছনে ফিরে চাইছে অবাধ্য মনটা, তাকে বেঁধে রেখেছি নীরবের একট খুঁটিতে। এই লাল মাটির হাওয়ায়, পলাশ বনের ফাঁকে, একদিন খুঁজে পেয়েছিলাম ভালবাসাকে। আমার যৌবনের প্রথম প্রেমকে, নীল আকাশের কোলে রুক্ষ মাটির তলায় রংতুলি দিয়ে এঁকেছিলাম।
কত ঋতু
পেরিয়ে গেল, সে কী আর থাকে কবে
মুছে গেছে। তাই কি?
সত্যি মুছে গেছে?
তবে আজ এতদিন পর রাঙামাটির খাঁজে-খাঁজে পলাশ ফুলের
বুকে চিরে, সেই
গন্ধ কেন পেতে চাইছি?
জানিনা—
আমি নিজেই জানিনা— কেন ছিঁড়ে ফেলেছিলাম জীবন-আঙিনা থেকে প্রথম
বসন্তের ফোটা ফুলটিকে। আজও আমার ভালবাসা, আমার প্রেম, অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে আছে, আমি তা জানি। কিন্তু কী করে তাকে বোঝাব শুধুমাত্র নিশ্চিত
ভবিষ্যতের আশায় সেদিন আমি মেরে ফেলিনি ভালবাসাকে। আমি যে একটা অসহায় মেয়ে, উপেক্ষা
করতে পারিনি বাবার শাসন আর মায়ের চোখের জল। তাই
সেদিন শুধু ভালবাসা নয়, আমার সমস্ত অস্তিত্বকে বলি দিয়েছিলাম নির্মমভাবে। তুমি আমায়
বুঝলে না, ভুলে বোঝা এক ভারকে বয়ে নিয়ে চলছ, নিজেও
কষ্ট পাচ্ছ আমিও কষ্ট পাচ্ছি। একবার সামনে এস, আমায় একবার
বলার সুযোগ দাও, কেন
সেদিন তোমার-আমার ভালবাসাটা মরে গিয়েছিল? আমি মেনে
নিচ্ছি বাবার শাসন অগ্রাহ্য করতে পারলেও মায়ের চোখের জলকে
উপেক্ষা করার ক্ষমতা আমার ছিল না তাই সেদিন নিজেকে বলি দিয়েছিলাম।
-কী করে পারলে এষা? এত প্রেম এত ভালবাসাকে মেরে ফেলে শুধুমাত্র সুখের জন্য বড়লোক
স্বামীর হাত ধরে চলে গেলে?
কেমন করে এত নিষ্ঠুর হলে? হয়তো মেয়েরা এমনই হয়, জানিনা, আমি আজও প্রত্যেক বসন্তকালে
আমাদের
ভালবাসার ছবিগুলো নিত্যনতুন ফুলে সাজিয়ে রাখি, তুমি জানতে পার না। রাতের আকাশে
তারাদের তুমি ভেবে অনেক মনের কথা বলি, তুমি শুনতে পাও না, বসন্তের
বাতাসের গায়ে তোমার গন্ধ খুঁজে বেড়াই তুমি ধরা দাও না, শুধু পালিয়ে
বেড়াও আর আমায় কাঁদাও। হ্যাঁ আজ তোমার বড়লোক স্বামী তোমাদের এখানকার বাড়িতে আমায় চা খেতে যেতে বলেছেন, যাব গিয়ে তোমার সুখ দেখে আসব।
-একি!
এই বাড়িতে যে শুধু আমার মনটাকে উপড়ে ফেলেই এষা
সাজিয়েছে, কিন্তু
কেন? কেন
এই পরিহাস? আমাকে
কী দেখাতে চাইলে এষা? আমি কত অক্ষম, শুধু
ইচ্ছেকে আঁকতেই জানি তাকে রূপ দিতে পারি না।
-না সুজয় না,
আমার বিয়ের পর তোমার-আমার ভালবাসার প্রতিটি কথা, আমাদের প্রতিদিনের ইচ্ছে, কল্পনা সব আমার স্বামীকে জানিয়েছিলাম, তিনি বড়
ভালমানুষ, তাঁর
তো কোন অপরাধ নেই, তাই
আমি তাকে ঠকাতে পারিনি। আমি তোমায় ভালবাসি জেনেও, তিনি উজার করে আমায় ভালবেসেছেন, আজ আমায়
এখানে এনেছেন
কেন জান?
-কেন?
-তুমি যদি আমায় এখনও চাও, তোমার কাছে আমায় ফিরিয়ে দেবেন বলে।
-সে কী!
-হ্যাঁ,
তিনি নিজের অধিকার ছেড়ে দেবেন।
নির্বাক
সুজয় প্রশ্ন করল,
-তুমি কী চাও?
-আমি তোমার কাছে ফিরে আসতে চাই।
-তোমার স্বামীর জন্য কষ্ট হবে না?
-হবে। নিশ্চয়ই হবে। তাকে ভাল না বাসতে পারলেও তাঁর
প্রতি আমার শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতাকে অস্বীকার করতে পারি না। আমি তো তাঁকে কিছুই দিতে
পারিনি, আমার
মন-শরীর এখনও তোমার অপেক্ষায় আছে।
-না এষা না। আমি হেরে গেছি, তোমার
স্বামীর ভালবাসার কাছে আমি হেরে গেছি। আমি তো এত উদার নই, এই উদার
ভালবাসাকে তুমি অস্বীকার কর না, এ অন্যায় এ পাপ।
-তাহলে?
-তুমি এই নিঃস্বার্থ ভালবাসার কাছে আত্মসমর্পন কর, আমায় ভুলে
যাও।
সুজয় ছুটে
বেরিয়ে গেল। তখনও সন্ধ্যা হয়নি, পাখিগুলো সব নীড়ে ফিরছে, রাখাল গরুগুলোকে নিয়ে গোঠে ফিরছে, কাজ সেরে
সবাই যে যার ঘরে ফিরছে। এষা তার স্বামীর হাত ধরে বলল,
-চল এবার আমরা আমাদের ঘরে যাই।
স্বামী তার
অশ্রুহীন সুন্দর মুখের দিকে একবার তাকালেন, এষার পিঠে
হাত রেখে বললেন,
-চল ঘরে যাই।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment